ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের মেধাবী শিক্ষার্থী অনন্য গাঙ্গুলীর মরদেহ শনিবার (৩১ জানুয়ারি) রাতে তার নিজ বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘ ইউনিটে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে প্রথম স্থান অর্জন করা এই শিক্ষার্থী ইংরেজি বিভাগে পড়ছিলেন।
পিএসসি, জেএসসি ও এসএসসি—তিন পরীক্ষাতেই বৃত্তি অর্জন করা অনন্য গাঙ্গুলীর শিক্ষাজীবন ছিল উত্থান-পতনের গল্পে ভরা। মাধ্যমিকের পর মানসিক অসুস্থতার কারণে তিনি পড়াশোনা থেকে পাঁচ বছর দূরে থাকেন। পরে ২০২১ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে পুনরায় নিজের মেধার পরিচয় দেন। ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় ঘ ইউনিটে ১০৩.৯৫ নম্বর পেয়ে প্রথম হন।
পরিবার জানিয়েছেন, অনন্য দীর্ঘদিন মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তার বাবা প্রদ্যুৎ কুমার গাঙ্গুলী ও মা রাধারানী ভট্টাচার্য্য বলেন, দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণার কারণে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। ছোট বোন লিথি মনি গাঙ্গুলীও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
অনন্য এর আগে গণমাধ্যমে জানিয়েছিলেন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় আমার গ্যাস্ট্রিক আলসারের কিছু জটিলতা দেখা দেয়। সে সময় বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলও বেশ খারাপ হয়েছিল।
এসএসসির পর এই মানসিক আরও প্রকট হতে শুরু করে। অনন্য বলেন, তখন মেজর ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার, ওসিডি ও অ্যাংজাইটিতে ভুগছিলাম আমি। প্রথমে যশোর, এরপর ঢাকায় চিকিৎসা হল। উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের তামিলনাড়ুর ভেলোরের একটি হাসপাতালেও নেওয়া হল। এসব চিকিৎসা নিয়ে মানসিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও তখনও নিজেকে আমি পুরোটা ফিরে পাইনি।
এ অবস্থায় ভারতে চিকিৎসা নেওয়ার পর দেশে নিয়মিত কাউন্সেলিং চলতে থাকে অনন্যের। কিছুটা সুস্থ বোধ করলে ২০২১ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। মাত্র কয়েক মাস আগে পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন। করোনাকালে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে এইচএসসি পরীক্ষা হওয়ায় সহজেই জিপিএ-৫ ছিনিয়ে আনেন তিনি। তার ভাষ্যে গল্পটা এরকম— রেজিস্ট্রেশনের নিয়ম অনুযায়ী সে বছরই ছিল আমার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার শেষ সুযোগ। নইলে রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়ে যেত। এইচএসসির পর প্রথম ভর্তি পরীক্ষা ছিল বিইউপিতে (বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস)। প্রস্তুতি ছাড়াই সেখানে পরীক্ষা দিলাম। চান্সও পেয়ে গেলাম। তখন উপলব্ধি হলো, না পড়ে যদি বিইউপিতে চান্স পাই, তাহলে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও তো পেতে পারি। তখন থেকেই ঘ ইউনিট–কেন্দ্রিক পড়াশোনা শুরু করি। একটি কোচিং সেন্টারের অনলাইন ব্যাচে ভর্তি হই। অনলাইন হওয়ার সুবাদে বাসায় থেকেই ক্লাস করতাম। নিয়মিত পড়তাম তখন। দিনের বেশির ভাগ সময়ই বইয়ের পেছনে লেগে থাকতাম। কোচিং সেন্টারের লেকচারগুলো থেকে নোট নিয়ে রাখতাম। বাংলা ও ইংরেজিতে আগে থেকে দক্ষতা ছিল বলে ব্যাপারটা আমার জন্য বেশ সহজ হয়ে গেল।
অনন্যের বাবা প্রদ্যুৎ কুমার গাঙ্গুলী কোটচাঁদপুর পৌর মহিলা ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। তার মা রাধারানী ভট্টাচার্য্য স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। তার ছোট বোন লিথি মনি গাঙ্গুলীও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত।
মৃত্যুর কারণ হিসেবে অনন্যের পরিবার বলছে, দীর্ঘদিনের সেই মানসিক যন্ত্রণা থেকেই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।
কোটচাঁদপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

