বুধবার,

১৯ মে ২০২১

সব বেড়াজাল ভেঙে আবার হেসে উঠুক বিশ্ব

প্রকাশিত: ১৮:২১, ২ জানুয়ারি ২০২১

আপডেট: ০৩:৪৬, ১৭ জানুয়ারি ২০২১

সব বেড়াজাল ভেঙে আবার হেসে উঠুক বিশ্ব

অবশেষে বিদায় নিয়েছে ২০২০। নতুন স্বপ্ন ও আশা নিয়ে এলো একটি নতুন বছর-২০২১ খ্রিষ্টাব্দ। মহাকালের অমোঘ নিয়মে ইতিহাসের পাতা থেকে বিদায় নিল বিশ্বজুড়ে ইতিহাস সৃষ্টিকারী বছর ২০২০। আনন্দ-বেদনা, সাফল্য-ব্যর্থতা, আশা-নিরাশা, প্রাপ্তি-প্রবঞ্চনার হিসেব-নিকাশ পেছনে ফেলে নতুন বছরকে স্বাগত জানাই আগামী দিনের নতুন স্বপ্নে সোনালি প্রত্যাশার পাখা মেলে।

২০২০ সাল রীতিমত ঘটনাবহুল একটি বছর। যে বছর জুড়ে ছিল প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মহামারির খবর, যা সারা পৃথিবী তছনছ করে দিয়েছে, বহু মানুষের জন্য বিপুল যন্ত্রণার কারণ হয়েছে। ২০১৯ সাল পেরিয়ে যখন গোটা বিশ্ব আতসবাজির আলোতে নতুন ২০২০ কে স্বাগত জানাচ্ছিল, তখনও তো একটু আঁচও পাওয়া যায়নি যে, আগামী ২০২০ বছর এভাবে আতঙ্ক ভরা! জীবন-মরণের লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে শুধুমাত্র বেঁচে থাকাটাই যে জরুরি হয়ে উঠবে সেটাই যেন প্রায় গোটা বছর ধরে উপলদ্ধি করল বিশ্বের মানুষ৷ হারালো অনেক কিছু৷

চীন থেকে আসা করোনাভাইরাসের জেরে গোটা বিশ্বজুড়ে মৃত্যু মিছিল৷ সীমানার পর সীমানা স্তব্ধ। আকাশে উড়ান থামাল উড়োজাহাজ৷ থেমে গেল রেল গাড়ি৷ নিষিদ্ধ হলো রাস্তায় বের হওয়া৷ খাঁ খাঁ রাজপথ থেকে পাড়ার গলি৷ দৈনন্দিন জীবনের ন্যূনতম জিনিস পাওয়ার জন্য মানুষ হন্যে হয়ে উঠল৷ ঘরে বসেই চলল অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান৷ বিনোদন ভুলে মানুষ ঘরেই খুঁজেই পেল স্বস্তির জায়গা৷ হাতে উঠল স্যানিটাইজারের বোতল আর মুখে মাস্ক! লকডাউন, কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন! এই তিন শব্দে অভ্যস্ত হয়ে গেল বিশ্বের মানুষ৷

ফোনে ফোনেই চলল ওপারের, দূর-দূরান্তের সম্পর্ক৷ কেউ চাকরি হারাল। কেউ কেউ প্রিয়জন৷এমনকী, শেষ চোখের দেখাটুকুও থেকে বিরত থাকল অনেকে৷ হাসপাতালের কাচের ঘরে যখন করোনা আক্রান্ত হয়ে প্রিয় মানুষটি বিদায় নিচ্ছে, তখন আমরা অসহায়! পিপিই-কিট পরে দূর থেকে চোখের জলেই ফেয়ারওয়েল! হাসপাতালে উপছে পরা ভিড়। কেউ চিকিৎসা পাচ্ছেন, কেউ কেউ বিনা চিকিৎসাতেই পৃথিবীকে বিদায় জানাচ্ছেন৷ এভাবেই শেষ হলো বিশের এই বিষ বছর৷ করোনা থেকে মুক্ত হতে ভ্যাকসিনের অপেক্ষায় মানুষ, তারই মাঝে রূপ বদলে নতুন করোনা হাজির৷ আতঙ্কের বারুদে ফের যেন আগুন! অনিশ্চয়তা নিয়েই নতুন বছরে গোটা বিশ্ব পা রাখল৷

যখন কোনো মহামারি আসে, তখন তা ক্ষতি করার পাশাপাশি অনেক শিক্ষাও দিয়ে যায়। এ কথা বলছি কারণ, সব মহামারিরই শেষ আছে। সেটি হতে পারে টিকা আবিষ্কারের মাধ্যমে কিংবা জীবাণুর জীবন চক্র শেষ হওয়ার কারণে। তবে তার শিক্ষাটি থেকে যায়। করোনা পুরো বিশ্বকে দেখাল, কী অসহায় এখনো আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা।

পুঁজিনির্ভর অর্থনীতিতে মুনাফাই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হলেও জীবন সেখানে বিপন্ন। পৃথিবীর ১০ ভাগ মানুষের হাতে ৯০ ভাগ সম্পদ থাকলেও চূড়ার মানুষেরা নিরাপদ নয়। অভূতপূর্ব উন্নয়নের জাঁতাকলে পিষ্ট আমাদের পরিবেশ। মাত্র তিন মাসের আক্রমণমুক্ত প্রতিবেশে প্রকৃতি স্বরূপে ফিরে আসার বার্তা দিয়েছে। এর ফলে মানুষও রক্ষা পেয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক রোগ থেকে। জলজ ও স্থলভাগের জীবনে এসেছে বৈচিত্র্য। মানুষকে প্রকৃতির অপরিহার্য অংশ বিবেচনা করে রক্ষা করতে হবে পরিবেশকে। অন্যথায় মানুষ ও প্রকৃতি দুটোর অস্তিত্বই যে বিপন্ন হয়ে পড়ে, তা কারও অজানা নয়।

করোনাকালের পরিবেশ থেকে প্রাপ্ত এ অভিজ্ঞতা ভুলে গেলে চলবে না। সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা করোনাকাল শেখাল, তা হচ্ছে বৈষম্যের অবসান। কাউকে পেছনে ফেলে, বঞ্চিত রেখে এগিয়ে যাওয়াটা আর যা-ই হোক, উন্নয়ন নয়। উন্নত হতে হলে সবাইকে নিয়ে এগোতে হবে। কিছু মানুষ অঢেল সম্পদের মালিক হলে সমাজে-রাষ্ট্রে-জীবনে যে বিপর্যয় নেমে আসে, তার অনেক উদাহরণ দেখা গেল এ করোনাকালে।

আপনি হয়তো বিপুল বিত্তের মালিক, কিন্তু যদি আপনার গৃহকর্মী, ড্রাইভার, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নাপিত কিংবা মালি যদি আপনার মতো স্বাস্থ্যসচেতন না হন অথবা তাঁদের যদি সচেতন থাকার মতো আর্থিক সামর্থ্য না থাকে, তবে আপনি যে অসহায় সেটি আজ প্রমাণিত। তাই উন্নতি মানে আজ আর নিজের উন্নতি নয়; সবাইকে নিয়ে সামর্থ্যবান থাকার নাম উন্নতি। উন্নয়ন শুধু অর্থনীতির একটি সূচক নয়, বরং সবার মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জীবনের সার্বিক নিশ্চয়তার নাম উন্নয়ন।

করোনার করাল গ্রাসে বেকার হয়ে পড়ছেন অনেকেই। সীমিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেকারত্বের হার বাড়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিগত তিন মাসে অনলাইনভিত্তিক পেশাগুলোর চাহিদা বেড়েছে এবং এ সেবাদাতা কোম্পানিগুলো বিপুল আয় করেছে। তাই নতুন বেকার জনগোষ্ঠীকে নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করা গেলে এ বিপর্যয় সামলানো যাবে। এ জন্য ব্যাপকভাবে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নেওয়া দরকার, যাতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের হার বাড়ানো যায়।

২০২০ খ্রিষ্টাব্দ বাঙালি জাতির জীবনে ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কেননা, ১০০ বছর পূর্বে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করা এক ছোট্ট খোকা কালক্রমে হয়ে উঠেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যাঁর সারা জীবনের আত্মত্যাগ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে এবং ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। জাতির পিতার জন্ম-শতবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় উদ্যাপনের লক্ষ্যে ২০২০-২১ সময়কে ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করেছে সরকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘মুজিববর্ষে আমরা অঙ্গীকার করেছি কেউ গৃহহীন থাকবে না। শহরের সকল সুযোগ-সুবিধা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও পৌঁছে দেব। ২০৩০ সালের মধ্যে “টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট” অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি। ২৬ মার্চ ২০২১ আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করব।’

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনার সাথে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে আমাদের সবকিছু এখন নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেশের সব পেশা, বৃত্তি, সম্প্রদায় ও পিছিয়ে রাখা জনগোষ্ঠীকে মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পারিবেশিক সব সূচকে নতুন করে উন্নয়ন চিন্তার কাঠামো বদলে দিতে পারে নতুন জীবনের নতুন বিশ্বকে।

নতুন বছর হোক সুস্থ সূর্যোদয়ের বছর৷ সব বেড়াজাল ভেঙে যেন ফের হেসে উঠুক বিশ্ব! না ভাচুর্য়াল নয়, বরং ফের প্রিয়জনের হাতে হাত, কাঁধে কাঁধ দিয়ে সুখের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বছর হোক ২০২১। হোক সু-খবরের সূর্যোদয়৷

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ : শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট এবং সম্পাদক, স্টেট টাইমস বাংলাদেশ

আরও পড়ুন : 

গণমাধ্যম হতে পারে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার

সম্পর্কিত বিষয়: