হোয়াইট হাউসের ভেতরে চলা জটিল মতভেদই ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য বক্তব্যে পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। সংঘাত যখন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে, তখন তাঁর উপদেষ্টাদের মধ্যে বিতর্ক চলছে—কখন এবং কীভাবে এই অভিযানে “বিজয়” ঘোষণা করা হবে।
প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সূত্রের মতে, প্রশাসনের একাংশ আশঙ্কা করছে যে, তেলের দাম ও পেট্রোলের মূল্য দ্রুত বেড়ে গেলে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। অন্যদিকে কিছু প্রভাবশালী নেতা মনে করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
এই ভিন্নমতের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায়। গত বছর ক্ষমতায় ফিরে প্রেসিডেন্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি “অপ্রয়োজনীয়” সামরিক জড়াজড়ি এড়িয়ে চলবেন। কিন্তু প্রায় দুই সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া ইরান অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়ায় বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যেও বিঘ্ন ঘটেছে।
প্রেসিডেন্টের চারপাশে প্রভাব বিস্তারের এই প্রতিযোগিতা তাঁর প্রশাসনের পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলেও এবার বিষয়টি যুদ্ধ ও শান্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময় তিনি যে বড় লক্ষ্য সামনে এনেছিলেন, সাম্প্রতিক দিনে তা থেকে কিছুটা সরে এসে অভিযানের পরিসরকে “সীমিত” হিসেবে তুলে ধরছেন এবং দাবি করছেন অধিকাংশ সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে।
তবে এই বার্তা স্পষ্ট নয় বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। জ্বালানি বাজারও এর প্রতিক্রিয়ায় অনিশ্চয়তার মধ্যে দুলছে। একদিকে তিনি জনসভায় বলেছেন “আমরা যুদ্ধ জিতেছি”, আবার একই বক্তৃতায় বলেছেন কাজ এখনও শেষ হয়নি।
অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে বলেছেন, তেলের দামের ধাক্কা ও পেট্রোলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে যুদ্ধের প্রতি সমর্থন দ্রুত কমে যেতে পারে। রাজনৈতিক উপদেষ্টারাও একই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। তারা প্রেসিডেন্টকে বিজয়ের সংজ্ঞা সীমিত রাখা এবং অভিযানের সমাপ্তি ঘনিয়ে এসেছে এমন ইঙ্গিত দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
অন্যদিকে রিপাবলিকান দলের কিছু প্রভাবশালী নেতা কঠোর অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন। তাদের মতে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে এবং মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলার জবাব দিতে আরও শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
এ ছাড়া প্রেসিডেন্টের নিজস্ব সমর্থক গোষ্ঠীর একটি অংশ দীর্ঘস্থায়ী মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার বিপক্ষে সতর্ক করছে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে সীমিত লক্ষ্যেই অভিযান শেষ করা উচিত।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে অবশ্য এসব আলোচনার অনেক কিছুই অস্বীকার করা হয়েছে। প্রেস সেক্রেটারি বলেন, প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন মতামত শোনেন ঠিকই, কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত তিনিই নেন এবং তাঁর অবস্থানও তিনিই নির্ধারণ করেন।
সাম্প্রতিক সময় প্রেসিডেন্ট বারবার এই অভিযানকে “স্বল্পমেয়াদি” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সূত্র বলছে, রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকের আগে তাঁকে এমন বার্তাই তুলে ধরতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, যাতে বোঝানো যায় যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে যেতে চায় না।
যুদ্ধ শুরুর সময় প্রশাসনের লক্ষ্যও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে—কখনো বলা হয়েছে সম্ভাব্য ইরানি হামলা ঠেকানো, কখনো পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, আবার কখনো সরকার পরিবর্তনের কথাও উঠে এসেছে।
এদিকে ইরানের হামলা অব্যাহত থাকায় এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে ওঠায় সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, কিন্তু বর্তমানে সেখানে চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। যদি এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, তাহলে যুদ্ধ শেষ করার জন্য প্রেসিডেন্টের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয়ী দাবি করতে পারে—কারণ ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা টিকে গেছে বলে দেখাতে চাইবে, আর যুক্তরাষ্ট্র দাবি করবে যে তাদের সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, ইরান শক্তিশালী ও সুসংগঠিত একটি প্রতিপক্ষ। তার নিরাপত্তা কাঠামো এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা গভীরভাবে প্রোথিত, ফলে দ্রুত ফল পাওয়া সহজ নয়। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের কিছু সদস্যের মতে, ইরান অতি দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে যাচ্ছে—এমন দাবিও অতিরঞ্জিত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধের সামরিক ফলাফল যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত হিসাব—যা এখন হোয়াইট হাউসের ভেতরেই তীব্র আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

