ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান ধীরে ধীরে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে আরও বড় যুদ্ধের দিকে যেতে পারে পরিস্থিতি। সংঘাত আরও বিস্তৃত, ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠবে- এমন আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। তাদের ভাষ্য, যুদ্ধটি একটি সম্ভাব্য ‘এস্কেলেশন ট্র্যাপ’ বা ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার ফাঁদে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা সামরিক দিক থেকে বড় ধরনের সাফল্য এনে দেয়। প্রথম দফার হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনিসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা নিহত হন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়। কিন্তু এসব হামলার পরও ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো টিকে আছে এবং দেশটির উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের একটি বড় সমস্যা হলো কৌশলগত লক্ষ্য ও সামরিক সাফল্যের মধ্যে পার্থক্য। কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা সফল হলেও তা সব সময় রাজনৈতিক বা কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত করে না। ফলে সামরিক সাফল্যের পরও যদি কাঙ্ক্ষিত ফল না আসে, তখন হামলার মাত্রা আরও বাড়ানোর প্রবণতা তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসবিদ রবার্ট পেপে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ ধীরে ধীরে একটি ‘এস্কেলেশন ট্র্যাপ’-এ ঢুকে পড়ে। তার মতে, প্রথম ধাপে হামলা কৌশলগতভাবে সফল মনে হলেও তা যদি প্রত্যাশিত ফল না আনে, তাহলে দ্বিতীয় ধাপে আক্রমণ আরও জোরদার করা হয়। তাতেও কাঙ্ক্ষিত ফল না এলে তৃতীয় ধাপে আরও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে ইরানও পাল্টা কৌশল হিসেবে সংঘাতের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, তেহরান সরাসরি সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারলেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রভাব বাড়িয়ে চাপ তৈরি করার চেষ্টা করছে।
এই কৌশলের অংশ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলো এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্বে মোট তেল সরবরাহের বড় একটি অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই পদক্ষেপের লক্ষ্য শুধু সামরিক প্রতিশোধ নয়; বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা। এতে ওই অঞ্চলের জনমতেও চাপ তৈরি হতে পারে।
এদিকে ইসরায়েলও সংঘাতের পরিধি বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, রকেট হামলা বন্ধ না হলে লেবাননের কিছু এলাকা দখল করার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এই সংঘাত কোন দিকে যাবে তা অনেকাংশে নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ওপর। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কেউ কেউ মনে করছেন, সংঘাত বাড়ার সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি হঠাৎ কোনো সমঝোতার পথও খুলে যেতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো যুদ্ধ ধীরে ধীরে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে কোনো পক্ষই সহজে পিছু হটতে পারবে না। সেই পরিস্থিতিতে সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

