ইউরোপজুড়ে এখন চলছে ইতিহাসের অন্যতম তীব্র ও রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ। তীব্র গরমে পুড়ছে মহাদেশটির কোটি কোটি মানুষ। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ফ্রান্সে। দেশটির আবহাওয়ার চেনা সব রেকর্ড ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে এবারের গ্রীষ্মে।
শনিবার (২৭ জুন) ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের ইতিহাসে অন্যতম উষ্ণতম দিনগুলো পার হচ্ছে এখন। রাজধানী প্যারিসে কেবল এই এক সপ্তাহেই তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠেছে বেশ কয়েকবার। অথচ ১৮৭২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৪৭ বছরেও প্যারিসে এতবার তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ঘর ছাড়ায়নি।
ইউরোপজুড়ে চলা এই নজিরবিহীন গরমের মধ্যে সাধারণ মানুষ ও পশুপাখিরা কীভাবে টিকে থাকার লড়াই করছে, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে অসংখ্য ভিডিও।
ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্যারিসের এক বাসিন্দা তার ফ্ল্যাটের জন্য একটি এসি কিনেছেন। প্যারিস মানেই সিঁড়ি মন্তব্য করে তিনি দেখান কীভাবে একা হাতে ভারী এসি ইউনিটটি পাঁচ তলা পর্যন্ত টেনে তুলছেন। সিঁড়ির কার্পেটে তার শরীর থেকে ঝরে পড়া ঘামের স্পষ্ট দাগ ক্যামেরায় ধরা পড়ে।
প্রাগ থেকে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, দমকল বাহিনীর একটি গাড়ি ব্যস্ত বাজারের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় চারপাশে পানি স্প্রে করছে। এই প্রচণ্ড গরমে একটুখানি শীতলতার ছোঁয়া পেয়ে সেখানে থাকা ক্রেতা-দর্শনার্থীরা হাততালি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করছেন।
অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কুকুর গরম থেকে বাঁচতে বারবার একটি ফোয়ারার পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। মালিক তাকে টেনে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও অবাধ্য কুকুরটি বারবার পানির দিকেই ছুটে যায়। শেষ পর্যন্ত তাকে বেল্ট দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়।
তবে এই চরম আবহাওয়ার কারণে বেশ কিছু গুরুতর দুর্ঘটনাও ঘটছে। ফ্রান্সে এসিবিহীন একটি বাস চালানোর সময় তীব্র গরমে চালক জ্ঞান হারিয়ে ফেললে বাসটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এমন একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে।
এমন সংকটের মধ্যেও অনেকে রসিকতার আশ্রয় নিচ্ছেন। এক ফরাসি নাগরিককে দেখা যায় কোনো চুলা বা আগুন ছাড়াই কেবল কড়া রোদের তাপে খোলা আকাশের নিচে ডিম ও বেকন ভাজার চেষ্টা করছেন।
এদিকে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতলীকরণ যন্ত্র কেনার হিড়িক পড়েছে চারদিকে। ভিডিওতে দেখা গেছে, দোকান খোলার আগেই ইলেকট্রনিক্স শোরুমগুলোর সামনে উপচে পড়া ভিড়। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে এসি ও ফ্যান কেনার জন্য। অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে সব স্টক।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই তাপপ্রবাহ কোনো আকস্মিক বা সাধারণ আবহাওয়াগত ঘটনা নয়। চরম আবহাওয়ার কারণ নিয়ে গবেষণা করা সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’ (ডব্লিউডব্লিউএ)-এর একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, ইউরোপজুড়ে চলমান এই তীব্র গরমের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন নিশ্চিতভাবে দায়ী। সংস্থাটির মতে, এটি ইউরোপের ইতিহাসে রেকর্ড করা সবচেয়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ।
গত পাঁচ বছরে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো এমন বড় ধরনের তাপপ্রবাহের মুখে পড়ল ইউরোপ। এর আগে ২০২২ ও ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে একই ধরনের তীব্র গরমের কবলে পড়েছিল মহাদেশটি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ওই দুই বছরে অতিরিক্ত গরমের কারণে ইউরোপে ১ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্ব উষ্ণায়নের সেই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়কেই আবার নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

