সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন নিরাপত্তা জোটের সূচনা করেছে। ইরানের হুমকি মোকাবেলা, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রভাবের পাল্টা ভারসাম্য তৈরির লক্ষ্যেই তিন শক্তিশালী মুসলিম দেশের এই জোট বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসলামের পবিত্রতম শহর মক্কায় চুক্তিটি সই হয়েছে। এতে ন্যাটোর আদলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা রয়েছে—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বাস্তবে এই ধারা প্রয়োগের সম্ভাবনা কম। কারণ চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অবসানে পাকিস্তান ও তুরস্ক মধ্যস্থতার ভূমিকায় রয়েছে।
কেন এই জোট?
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ প্রায় ছয় মাস ধরে চললেও এখন পর্যন্ত ইরানকে চূড়ান্তভাবে দুর্বল করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে ইরান হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের নৌপথে চলাচল বাধাগ্রস্ত করছে এবং তাদের মিত্র হুতিরা লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।
এ অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য সামরিক ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও ইরান ও তার মিত্রদের ছোড়া সব ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো সম্ভব হয়নি। ফলে কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বনির্ভর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে আঞ্চলিক দেশগুলোকে।
সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলি শিহাবির মতে, এ জোট প্রমাণ করছে যে মার্কিন প্রতিরোধক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে এবং ইরানের হুমকি মোকাবেলায় আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা বাড়াতে হবে।
তিন দেশের স্বার্থ কী?
লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের সংবাদ মাধ্যম গলফ নিউজকে বলেন, তিন দেশ একে অপরের জন্য বেশ পরিপূরক। তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরবের বিপুল অর্থ থাকলেও নিজস্ব সামরিক শিল্পের সক্ষমতা তুলনামূলক সীমিত।
তার মতে, তুরস্কের রয়েছে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা, তবে দেশটির প্রয়োজন বাজার ও বিনিয়োগ। আর পাকিস্তানের রয়েছে জনবল, সামরিক অভিজ্ঞতা ও পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা; দেশটির প্রয়োজন অর্থায়ন ও শিল্প খাতে সুযোগ।
এই সমন্বয় তিন দেশের সামরিক সক্ষমতাকে তাত্ত্বিকভাবে অনেক শক্তিশালী করতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো তাদের নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় অংশীদার।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে তুরস্ক-পাকিস্তান?
ইরান সৌদি আরবে আবার হামলা চালালেও তুরস্ক বা পাকিস্তান সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দুই দেশই নিজেদের আঞ্চলিক ‘স্থিতিশীলতাকারী’ হিসেবে তুলে ধরতে চায় এবং যুদ্ধের পরিবর্তে রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে।
গলফ নিউজ বলছে, তবে চুক্তিটি ইরান ও ইসরায়েল—উভয়ের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা পাঠাচ্ছে। ফলে সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য শুধু ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করতে চাইছে না।
নতুন আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য?
নতুন জোটটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকেন্দ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ার চেষ্টা করছে।
কিন্তু তুরস্ক ও পাকিস্তান ইসরায়েলের কঠোর সমালোচক। সৌদি আরবও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট পথ ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে রাজি নয়। ফলে নতুন প্রতিরক্ষা জোটটি ইরানের প্রভাবের পাশাপাশি ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্যের বিরুদ্ধেও একটি ভারসাম্য তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

