ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ফোন করলে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সেই ফোন ধরবেন বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর প্রস্তুতির মধ্যেই এ কথা জানাল মস্কো।
রবিবার ক্রেমলিনের সহযোগী ইউরি উশাকভ বলেন, ‘আমার মনে হয়, পুতিন অবশ্যই ফোন ধরবেন। তিনি কখনোই আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানাননি।’ চলতি মাসের শেষ দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তি আলোচনা আবারও শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগেই উশাকভ এ মন্তব্য করলেন।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে পুতিন ও জেলেনস্কির মধ্যে সরাসরি কিংবা ফোনে কোনো কথা হয়নি। এর আগে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত ‘নরম্যান্ডি ফরম্যাট’ আলোচনায় দুই নেতা সর্বশেষ সরাসরি সাক্ষাৎ করেছিলেন।
দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে সরাসরি বৈঠকের দাবি জানিয়ে আসছে কিয়েভ। এ নিয়ে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে কয়েকবার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
গত জুলাইয়ে জেলেনস্কি পুতিনকে একটি খোলা চিঠি লিখে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে সরাসরি আলোচনায় বসার আহ্বান জানান।
তবে শুক্রবার ‘দ্য কিয়েভ ইনডিপেনডেন্ট’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সরাসরি বৈঠকে বসার পরিবর্তে ফোনে কথা বলার প্রস্তাব দিয়ে পুতিনের পক্ষ থেকে বৈঠকটি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। ইউক্রেনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘তারা আগেও ফোনে কথা বলার মাধ্যমে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করেছে।’
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ শুক্রবার বলেছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সবার সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত। জেলেনস্কির সঙ্গে পুতিন ফোনে কথা বলবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে পেসকভ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কেউ ফোন করেনি।’
এর আগে পুতিন জেলেনস্কির সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন। তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে ‘অবৈধ নেতা’ বলে অভিহিত করেন। পুতিনের দাবি, আগে থেকে অনুমোদিত কোনো চুক্তি চূড়ান্ত করার বিষয় থাকলেই কেবল তিনি জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারেন। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ আরো বলেন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেন, এই তিন পক্ষের অংশগ্রহণে শান্তি আলোচনার প্রথম কয়েকটি পর্ব অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত।
আলোচনায় ইউরোপের কোনো দেশের অংশগ্রহণ প্রয়োজন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের কার্যকর যোগাযোগ রয়েছে। তাই আলোচনার অন্তত প্রথম কয়েকটি পর্ব তিন পক্ষের অংশগ্রহণে হওয়াই যৌক্তিক।’
এর আগে কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ জানিয়েছিল, ন্যাটোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে এমন ছাড় আদায়ের লক্ষ্যে রাশিয়া চলতি মাসে আবুধাবিতে অনুষ্ঠেয় ত্রিপক্ষীয় আলোচনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে। তবে ক্রেমলিনের সহযোগী ইউরি উশাকভ বলেছেন, রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মধ্যে চলমান আলোচনায় ইউরোপকেও যুক্ত করা উচিত। কারণ, কোনো শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ইউরোপের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তবে কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ জানিয়েছে, আলোচনায় ইউরোপীয় দেশগুলোকে যুক্ত করার বিষয়ে রাশিয়ার নিজস্ব কৌশল রয়েছে। দেশটি পরবর্তী দফার আলোচনাকে কাজে লাগিয়ে ন্যাটোর সম্প্রসারণের বিষয়ে ছাড় আদায়ের চেষ্টা করতে পারে। ন্যাটোর সম্প্রসারণকেই পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধের অন্যতম ‘মূল কারণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
পেন্টাগন ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে রাশিয়ার হুমকি নিয়ে প্রকাশ্যে দেওয়া সতর্কবার্তার ভাষা কিছুটা নরম করার আহ্বান জানিয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়াকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য কিছুটা কমিয়ে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে মস্কোর সঙ্গে উত্তেজনা না বাড়ে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ন্যাটোর নেতাদের সতর্ক করা হয়েছে যে, রাশিয়ার নিন্দা জানিয়ে প্রকাশ্যে দেওয়া কঠোর বিবৃতি নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পেন্টাগনের নীতিবিষয়ক প্রধান এলব্রিজ কোলবিসহ যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কর্মকর্তা দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব বার্তা দিয়েছেন। তবে ইউরোপের অন্য দেশগুলোর সরকারও একই ধরনের বার্তা পেয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
জানা গেছে, ইউরোপীয় নেতাদের কিছু বক্তব্যকে অপ্রয়োজনীয় কঠোর মন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন পেন্টাগনের নীতিবিষয়ক প্রধান এলব্রিজ কোলবি। উদাহরণ হিসেবে তিনি রুশ নেতাকে ‘ইঁদুরের মতো কোণঠাসা’ করার মন্তব্যের কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, এ ধরনের বক্তব্য উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
এস্তোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টেন মিশাল গত সেপ্টেম্বরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ‘ইঁদুরের মতো কোণঠাসা’ করার মন্তব্য করেছিলেন। ইউক্রেনে যুদ্ধের পরিস্থিতির কারণে পুতিন ক্রমেই মরিয়া হয়ে উঠছেন—এমন ধারণা বোঝাতে তিনি এই শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেন। অন্য একটি বৈঠকে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা এস্তোনিয়ার প্রতিনিধিদলকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সংযত থাকার আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে ইউরোপের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা আপনাদের সহায়তা করছি। আমেরিকানরাও পাশে আছে। শুধু খুব বেশি কথা বলবেন না, অযথা হইচই করবেন না।’ তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে পেন্টাগন।
এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, ‘মিত্রদেশগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে হওয়া আলোচনা একান্তই গোপনীয়। তাই এ বিষয়ে আমরা কোনো মন্তব্য করব না।’
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

