নোয়াখালী সদর উপজেলায় একটি বেসরকারি চক্ষু হাসপাতালে ‘ভুল চিকিৎসায়’ ১৩ বছরের এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর হাসপাতালটি পরিদর্শনে গিয়ে কাউকে না পেয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন সিভিল সার্জন। তবে শিশুটির স্বজনদের সঙ্গে ২৫০ শয্যা নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে যাওয়ায় হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও শিশুটির চোখে চিকিৎসা দেওয়া আবুল হোসেনকে আটক করেছে পুলিশ।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে নোয়াখালী পৌরসভার দত্তেরহাট এলাকার ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন সুধারাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম।
মারা যাওয়া মো. মোসলেম লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চরবসু গ্রামের মাহফুজুর রহমানের ছেলে। এলাকাটি নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের সীমান্তবর্তী।
শিশুটির স্বজনরা জানান, শনিবার বিকেলে সমবয়সীদের সঙ্গে খেলার সময় এক শিশু মোসলেমের চোখে আঘাত করে। এতে তার চোখে রক্ত জমে ফুলে যায়। পরে তার মা-বাবা তাকে স্থানীয় চেউয়াখালী বাজারে এক পল্লী চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। জখম গুরুতর হওয়ায় ওই চিকিৎসক শিশুটিকে চক্ষু হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
স্বজনদের অভিযোগ, এরপর মোসলেমকে দত্তেরহাটের ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে নেওয়া হলে ‘বড় ডাক্তার’ আসার কথা বলে তাদের প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষা করানো হয়। পরে আবুল হোসেন এসে শিশুটিকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান। সেখানে তার চোখে তিনটি ইনজেকশন দেওয়া হয়। এর পরপরই মোসলেমের মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে থাকে এবং সে অচেতন হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় আবুল হোসেন শিশুটিকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ স্বজনদের।
তবে তারা তাকে সঙ্গে নিয়েই ২৫০ শয্যা নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।
জেনারেল হাসপাতালের ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সন্ধ্যা পৌনে ৮টার দিকে ১৩ বছরের একটি শিশুকে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়। সে কী কারণে মারা গেছে জানা নেই।’
পুলিশ হেফাজতে থাকা আবুল হোসেনের দাবি, তিনি ডিপ্লোমাধারী সিনিয়র অপটোমেট্রিস্ট। তিনি বলেন, শিশুটির চোখের ওপর ও নিচের পাতা বেশ ফুলে ছিল। ভেতরের কর্নিয়া পরীক্ষা করার জন্য আপার লিড ও লোয়ার লিডে ‘জেসোকেইন’ ইনজেকশন দেওয়া হয়। এটি চোখ অবশ করার জন্য ব্যবহার করা হয়।
আবুল হোসেন বলেন, ‘তবে এটা দেওয়ার আগে শিশুটি বমি করে। এর পরই শিশুটির খিঁচুনি আসে। খিঁচুনি এলে আমরা তাকে সদরের দিকে নিয়ে আসি।’
তবে অপটোমেট্রিস্টদের সার্জারি করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন নোয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, অপটোমেট্রিস্টরা চোখ পরীক্ষা ও সাধারণ চশমার প্রেসক্রিপশন দিতে পারেন, কিন্তু সার্জারি করতে পারেন না।
ঘটনার পর ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি জানিয়ে সিভিল সার্জন বলেন, নিহত শিশুর স্বজনদের অভিযোগের ভিত্তিতে হাসপাতালটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতালটির বিরুদ্ধে আগেও অনিয়মের অভিযোগ ছিল বলে জানিয়েছেন সদর উপজেলার সদ্যবিদায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নাইমা নুসরাত জাবীন। তিনি বলেন, নানা অনিয়ম পাওয়ায় ২০২৪ সালের ৮ জুন অভিযান চালিয়ে হাসপাতালটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
সুধারাম মডেল থানার ওসি নজরুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে হাসপাতালে পুলিশ পাঠানো হয়। অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। শিশুটির মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

