সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকায় বাংলাদেশের মতো নিচু বদ্বীপ দেশে লাখো মানুষের ঘরবাড়ি হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে দেশের উপকূলীয় ও নিচু এলাকায় স্থায়ী বন্যাসহ ভূমি দেবে যেতে পারে। এতে বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে রাজধানী ঢাকায়ও।
জাতিসংঘ মহাসচিবের ‘চ্যালেঞ্জেস রিলেটেড টু সি লেভেল রাইজ অ্যান্ড ওয়েস অ্যান্ড অ্যাপ্রোচেস টু অ্যাড্রেস ইট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছে। গত সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ইতোমধ্যে নগর অবকাঠামো, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, বিদ্যুৎব্যবস্থা, ভবন ও ভূগর্ভস্থ পানিসম্পদের ওপর চাপ তৈরি করছে। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের অধিকার, উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।
প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার নিচু বদ্বীপ অঞ্চলের শহরগুলোকে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঢাকার পাশাপাশি ভারতের কলকাতা ও মুম্বাইয়ের মতো শহরগুলোতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়তে পারে। এক কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ বাসস্থান হারানোর তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এ সতর্কবার্তার গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ, দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিচু ও বদ্বীপভূমি। সমুদ্রের পানি উপকূলীয় এলাকায় ঢুকে পড়ার পাশাপাশি নদী ও জোয়ারের পানির উচ্চতা বাড়লে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ে। কোথাও কোথাও ভূমি দেবে যাওয়ার কারণে একই মাত্রার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতেও ঝুঁকি আরও তীব্র হতে পারে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে গড়ে ৪ দশমিক ৭ মিলিমিটার করে বেড়েছে। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৯ মিলিমিটারে পৌঁছায়। সামুদ্রিক উষ্ণতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়াকে এই নতুন রেকর্ডের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি ২০২৫ সালেও বৈশ্বিক গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০২৪ সালের রেকর্ডের কাছাকাছি।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষের জীবনযাত্রায়। সাগরের নোনাপানি নদী, খাল ও ভূগর্ভস্থ স্তরে পৌঁছে গেলে সুপেয় পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে মাটিতে লবণাক্ততা বাড়ায় কৃষি ও সেচব্যবস্থাও চাপে পড়ে। এতে কৃষি উৎপাদন কমার পাশাপাশি জীবিকার ওপরও প্রভাব পড়ে এবং বসতভিটা ছেড়ে মানুষের অন্যত্র যেতে বাধ্য হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
জাতিসংঘ বলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে উপকূলীয় বন্যা, মিষ্টি পানির লবণাক্তকরণ, নদীভাঙন ও বাস্তুতন্ত্রের অবনতি আরও তীব্র হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যের ওপরও। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, পানিবাহিত রোগের বিস্তার, আঘাত ও মৃত্যুর ঝুঁকি এবং মানুষের মানসিক চাপ বাড়তে পারে।
উচ্চ আয়ের উপকূলীয় শহরগুলোর ক্ষেত্রে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ঝুঁকিতে থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর জন্য বড় উদ্বেগ মানুষের বাস্তুচ্যুতি। বাংলাদেশের মতো দেশে তাই জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন, উপকূলীয় সুরক্ষা, সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের পরিকল্পিত পুনর্বাসন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে কেবল উপকূলীয় এলাকার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। গ্রাম ও উপকূল থেকে জীবিকা হারিয়ে মানুষের শহরমুখী প্রবাহ বাড়লে ঢাকা ও অন্যান্য নগরের ওপর আবাসন, পানি, পয়োনিষ্কাশন, পরিবহন ও কর্মসংস্থানের চাপ আরও বাড়তে পারে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

