ক্ষমতায় গেলে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী উভয় দলই ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠন করবে। দল দুটির নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, এই কমিশনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর সত্যতা উদ্ঘাটন করবে তারা।
দলগুলোর সূত্র বলছে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুশোচনা প্রকাশের বিনিময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দেওয়া হবে। দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মী সমর্থকদের যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ নেই তাদের ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ দিয়ে অতীতের ক্ষত নিষ্পত্তি করা হবে। তবে আওয়ামী লীগের যেসব নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তারা এই সুযোগ পাবেন না।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে একই রকম উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনমালে যারা নিপীড়নে যুক্ত ছিলেন, তাদের বড় অংশকে ক্ষমা প্রার্থনার বিনিময়ে সমাজে পুনর্বাসন করা হয়। এর মাধ্যমে বর্ণবাদী শাসনের ক্ষত থেকে বেরিয়ে আসে নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ আফ্রিকা। বহু ভাষা ও বর্ণের নাগরিকের সমন্বয়ে ‘রেইনবো নেশন’ গঠন করে তারা। এই প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করেছিল তা দেখতে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
গত ২০ মে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জানিয়েছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার আদলে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন করা হবে। তিনি বলেছিলেন, অনন্তকাল হানাহানি করে জাতির মুক্তি আসবে না। গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধী সংখ্যায় বেশি নয়। তাদের যথেষ্ট শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তারা যে মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন, তা প্রতিষ্ঠায় ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার তা করে যাবে।
বিএনপি জামায়াতের পরিকল্পনা কী
তবে সরকার ৯ মাসেও ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন করেনি। গত ফেব্রুয়ারিতে আইন উপদেষ্টা সমকালকে জানিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ আমলে যারা গণহত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমে জড়িত ছিল না তাদের রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়ায় আনার বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগী ও জাতিসংঘের পরামর্শ রয়েছে।
তৎকালীন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও প্রকাশ্যে একই অভিমত জানিয়েছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃত্ব আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা এবং দলটির নিরপরাধ কর্মীদের রিকনসিলিয়েশনের মাধ্যমে ক্ষমা করার পক্ষে ছিল।
এর বিরোধিতা করেছিল বিএনপি। দলটির ভাষ্য ছিল, এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের এনসিপিতে নেওয়া হতে পারে। জামায়াত বিরোধিতা না করলেও, তারাও গত বছর রিকনসিলিয়েশনে রাজি ছিল না।
কিন্তু ভোটের আগে দুটি দলই ইশতেহারে ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অবশ্য ২০২৩ সালে ঘোষিত বিএনপির ৩১ দফায় দক্ষিণ আফ্রিকার আদলে ‘রেইনবো নেশন’ গড়তে ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি ছিল।
গতকাল শুক্রবার ঘোষিত বিএনপির ইশতেহারে প্রথম অধ্যায়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার অংশে ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী সময়ে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর সত্য উদ্ঘাটন করা হবে। যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের অর্থবহ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হবে এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধীদের জবাবদিহি ও শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হবে।’
গত মঙ্গলবার ঘোষিত জামায়াতের ইশতেহারের প্রথম ভাগে আইন ও বিচার-সংক্রান্ত পরিকল্পনায় ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’-এর কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, ‘আমরা ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও পুনর্বাসনমূলক একটি ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন গঠনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হবে, যেখানে জাতিসংঘের কারিগরি সহায়তা থাকবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে গত ১৫ বছরে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর সত্য উদ্ঘাটন এবং জাতির জন্য একটি নতুন অধ্যায় সূচনা করা হবে।’
ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশনের প্রতিশ্রুতি মাধ্যমে বিএনপি কী বোঝাচ্ছে, তা ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে স্পষ্ট করা হয়নি। তবে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ গত বছর সমকালকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বিএনপি সরকার গঠনে সক্ষম হলে এই কমিশনের পরিধি নির্ধারিত হবে। কারা রিকনসিলিয়েশনের যোগ্য হবেন, তা আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে।
এই কমিশনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা সুযোগ পাবেন না কিনা– জানতে চাইলে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য আবদুল হালিম বলেন, ফ্যাসিবাদের সময়ের ভুক্তভোগীদের জন্য এই কমিশন করা হবে।
ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক এবং অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য ড. কুদরাত-ই-খোদা সমকালকে বলেছেন, ভুক্তভোগীদের প্রতিকার দেওয়া ও ভবিষ্যতের অপরাধ এড়ানোর জন্য এই ধরনের কমিশন একটি কার্যকরী ব্যবস্থা। যারা জঘন্য অপরাধ করেছে, তাদের বিচার হতে হবে। যারা ছোটখাটো অপরাধ করেছে, তা অনুশোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সমাজের জন্য উপশম। তিনি বলেন, দুটি দলের ইশতেহারেই ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি থাকা খুবই ইতিবাচক। কিন্তু নিশ্চিত করতে হবে ক্ষমতায় গেলে তারা এর বাস্তবায়ন করবে।
অতীত নজির, বর্তমান অবস্থা
এক-এগারোর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ট্রুথ কমিশন গঠন করা হয়েছিল। যেখানে দুর্নীতি কথা স্বীকার করে ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ ছিল। ৪৩২ জন সরকারি কর্মচারী ও ব্যবসায়ী দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে ক্ষমা পেয়েছিলেন। যদিও পরে উচ্চ আদালত এই কমিশনকে অবৈধ ঘোষণা করেন।
তবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দলগুলোর অবস্থান হলো শেখ হাসিনার শাসনামলের ক্ষত উপশম এবং যারা আওয়ামী লীগ করার কারণে ৫ আগস্টের পর সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন; তাদের পুনর্বাসন প্রয়োজন। দলগুলোর নেতারা জানান, দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ সমর্থকরা এই অবস্থায় থাকলে তাদের মধ্যে তীব্র বঞ্চনা বোধ থেকে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। অনেকে হতাশা থেকে সহিংসতায় জড়াতে পারেন। দেশের বাইরে থেকেও তারা সমর্থন পেতে পারেন, যা শুধু সরকারের জন্য হুমকি নয়, জাতীয় নিরাপত্তাও বিঘ্নিত করবে। তাই তাদেরও রাজনীতির মূলধারায় আনা প্রয়োজন। তবে এর জন্য অনুশোচনা জানাতে হবে। আওয়ামী লীগ এখনও জুলাই গণহত্যার জন্য ক্ষমা চায়নি।
শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে ২ হাজার ২৬২টি বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ রয়েছে। গুম-সংক্রান্ত কমিশনে ১ হাজার ৬০০-এর বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। দেশে অন্তত ২২টি গোপন বন্দিশালার খোঁজ পেয়েছে বলে কমিশন জানিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের তথ্যানুসন্ধান বলছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ শিশু। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে নিরাপত্তা বাহিনী শিশুদের ‘টার্গেট কিলিং’ করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনের অবসানের পর জাতীয় ঐক্যের জন্য নোবেলজয়ী ডেসমন্ড টুটুর নেতৃত্বে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠিত হয়েছিল। ১৯৬০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্ত করে প্রায় সাত হাজার রাজনৈতিক হত্যার তথ্য পায় তারা। ১৯ হাজার ৫০টির বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আসে কমিশনে। অপরাধের পূর্ণাঙ্গ সত্য এবং অনুশোচনা প্রকাশ করায় ৮৪৯ জনকে ক্ষমা করে কমিশন।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

