বুধবার,

১৯ মে ২০২১

‘নাপিত’কে চিকিৎসকের বিয়ে, ‘স্যার সিনড্রোম’ ও জমিদারী খায়েশ

প্রকাশিত: ১৭:৫৪, ২৮ ডিসেম্বর ২০২০

আপডেট: ১০:১৮, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১

‘নাপিত’কে চিকিৎসকের বিয়ে, ‘স্যার সিনড্রোম’ ও জমিদারী খায়েশ

দক্ষিণ এশিয়ার ‘স্যার সিনড্রোম’ নিয়ে আমার আগের কিছু লেখা রয়েছে। সেসব লেখায় সিনড্রোমের সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ করা হয়েছে। আজ আবার সেই কথা তুলতে হলো, পেশায় একজন ‘নাপিত’ ও চিকিৎসকের বিয়ে বিষয়ে। একজন নারী চিকিৎসক ভালোবেসে একজন পেশাজীবীকে বিয়ে করেছেন, আর সেই পেশা হলো নাপিতের, সেই বিয়ে নিয়ে রীতিমত তুলকালাম।

‘জীবী’ শব্দটার অর্থ হলো জীবিকা নির্বাহ। মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য যেকোনো পেশা বেছে নিতে পারেন। পরিবেশ পরিস্থিতি তাকে পেশা বেছে নিতে বাধ্য করে। বিশেষ করে দরিদ্র-উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যেখানে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করতে তৈরি হয়ে উঠতে পারেনি। উন্নত বিশ্বে যেমন সন্তান জন্ম হওয়ার পর তার পড়াশোনা থেকে মানুষ হওয়ার সমস্ত দায়িত্ব রাষ্ট্র নিয়ে নেয়, তেমনটা হয়ে উঠতে পারেনি তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো। হয়ে উঠতে পারেনি আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোও।

তবে মুশকিল হলো দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর একটা শ্রেণি ‘স্যার’ ডাকটি শোনার জন্য সবসময় উন্মুখ থাকেন। আসে সেটাই হলো, ‘স্যার সিনড্রোম’। কেন এই উন্মুখতা তা ব্যাখ্যা করতে গেলে আবার আলোচিত শিক্ষাবিদ ‘পাওলো ফ্রেইরি’ এসে যান। পাওলো ফ্রেইরি জোর দিয়েছিলেন মানুষের মানসিক মুক্তির ওপর। তিনি বলেছিলেন, দাসের নিজের মনের দাসত্ব থেকে যদি মুক্তি না ঘটে, তবে তার প্রভু হয়েও লাভ নেই। কারণ সে প্রভু হলে তার প্রভুত্বে আরও বেশি অত্যাচার থাকবে। তার অধীন দাসেরা আরও বেশি অত্যাচারিত হবে।

মানসিক মুক্তিটা বড় প্রয়োজন। মানসিক মুক্তি ঘটেনি বলেই নারী চিকিৎসক হয়ে একজন পেশাজীবী ‘নাপিত’কে বিয়ে করায় আপত্তি পরিবারের। ধর্ম হিসেবে ইসলাম আশরাফ আর আতরাফের শ্রেণি বিভাজন অতিক্রম করতে পেরেছিল বলেই এই ভূখণ্ডে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। ব্রাহ্মণ্যবাদের অত্যাচারে, বর্ণাশ্রমের যাতাকলে পিষ্ট যখন এ দেশের দলিত আর বৌদ্ধরা, তখনই ইসলামের আগমন এখানে। বিভাজনহীন এই ধর্মের প্রতি তাই মানুষ ঝুঁকে পড়েছিল নির্দ্বিধায়। তবে তাদের মধ্যে সবাই যে মনের দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, তা নয়।

জাতপাতের ভাবনা তাদের অবচেতনে কোথাও না কোথাও লুকিয়ে ছিল। জেনেটিক ভাবেই তা বংশ পরম্পরায় বাহিত হয়েছে। না হলে মানবিক চিন্তায় তো নারী চিকিৎসকের পরিবারের এই বিয়েতে আপত্তি থাকার কথা নয়। তারপর যখন সেই চিকিৎসক নিজেই স্বাবলম্বী।

এখন ‘স্যার সিনড্রোম’ এর সাথে এ ঘটনার যোগাযোগ কোথায় তা বলি। তার আগে বলে নিই সামন্তবাদের কথা। এক সময় জমিদার বাড়ির সম্মুখ দিয়ে জুতা ও ছাতি বগলদাবা করে মাথা নিচু করে যেতে হতো। এর বিপরীত হলে তাকে ঔদ্ধত্য, সোজা কথায় বেয়াদবি হিসেবে বিবেচনা করতেন জমিদাররা। সেই ‘বেয়াদব’ রায়ত-প্রজাদের ওপর চলত জুলুম-অত্যাচার।

আমাদের দেশের অনেকের মনের মধ্যেও সেই জমিদার বা জমিদার হওয়া খায়েশ লুকিয়ে রয়েছে। অর্থাৎ তারা মনের দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে পারেননি। তাদের ভেতরও রয়েছে জমিদারদের মতো দেখে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা। দেখুন তো, সেই আকাঙ্ক্ষার সাথে ‘নাপিত’ আর চিকিৎসকের বিয়ে না মেনে নেওয়ার কোনো দম্ভোক্তি মিলে যায় কি না? আইনের সাথে কাজ করা একটি শৃঙ্খলাবাহিনীর কর্মকর্তার ‘চিকিৎসক নাপিতকে বিয়ে করে অন্যায় করেছেন, তিনি যা ইচ্ছা তা করতে পারেন না’ সেই আকাঙ্ক্ষার কথাই বলে কি না? বলে তো?  

এই হলো দক্ষিণ এশিয়ার ‘স্যার সিনড্রোম’, যা আমাদের সামন্তবাদের কথাই মনে করিয়ে দেয়। কদিন আগে জার্মানির একজন রাজনীতিবিদের সাথে কথা বলছিলাম। আগামীতে যার পার্লামেন্টে গিয়ে মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি রাজ্যসভা তথা জার্মানির ডিস্ট্রিক পার্লামেন্টে নির্বাচিত। তিনি বললেন, জার্মানে সবাই সবার নাম ধরে সম্বোধন করেন। ‘স্যার’ বিষয়টি সেখানে নেই। হিটলারের দেশটি ঔদ্ধত্যের পরিণাম ভোগ করেই মানবিকতার সত্যটি উপলব্ধি করতে পেরেছে। যে সত্যটির কথা ধর্ম হিসেবে ইসলাম বলেছে। বলেছে বর্ণাশ্রমের বিরুদ্ধে।

এই উপমহাদেশে জাতপাতের নামে যে বিভাজন ‘অ্যারিয়ান’ ব্রাহ্মণ্যবাদ চাপিয়ে দিয়েছে ভারত তার মাশুল আজও দিয়ে যাচ্ছে। সেখানে আজও দলিতরা অত্যাচারিত হচ্ছে। তাদের হত্যা করা হচ্ছে। দলিত মেয়েরা হচ্ছেন ধর্ষিতা। বৃটিশরাও সেই ধারা বহন করেছিল এবং ছেড়ে যাওয়ার সময় অন্য খারাপ বিষয়ের সাথে সেই ব্রাহ্মণ্যবাদের আরেক রূপ ‘স্যার সিনড্রোম’ এ ভূখণ্ডে ছেড়ে গেছে। 

এতক্ষণের আলাপ ছিল সামাজিক দর্শনের। এখন আসি আইনের কথায়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কাকে বিয়ে করবেন-না করবেন, সেটা তার নিজস্ব ব্যাপার। তার চিন্তা আর ইচ্ছার ব্যাপার। এটা একটা প্রতিষ্ঠিত বিষয়। এখানে আর কোনো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নেই। এমন বিয়েতে বাধার ব্যাপার দেশে তো বটেই বিশ্বের কোথাও নেই। পেশা বা ধর্ম কিংবা সম্প্রদায় অনুযায়ী বিয়ে হওয়ার আইন আমাদের দেশে হয়নি, হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। ‘লাভ জিহাদ’ ধরনের আইন আপাতত আমাদের দেশে হওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী যখন জানায়, তাকে অপহরণ করা হয়নি, সে স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছে, তখন তার স্বামীকে গ্রেপ্তারটাও সমুচিন কি না সে প্রশ্ন ওঠাটা অস্বাভাবিক নয়। সঙ্গতই সেই প্রশ্নটা দেশের গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, আসছে।

আমরা কথায় কথায় সাম্প্রদায়িকতার কথা বলি। এই যে, ‘নাপিত’ বলে একটা সম্প্রদায়কে হেয় করা-এটা কি সাম্প্রদায়িকতা নয়? যারা সুযোগ পেলেই ধর্মকে বিভেদের বিষয়ে টেনে আনেন, তারা এই বিভাজনের সময় কোথায়? যারা নারীবাদ, নারীর অধিকার নিয়ে গলা ফাটান, একজন নারী, যিনি নিজে একজন উচ্চশিক্ষিত চিকিৎসকও, তার এমন অধিকার হরণের, অসম্মানের চেষ্টায় তারা চুপ কেন? জানি, এর কোনো জবাব নেই। তবে অনুচ্চারিত সেই জবাব হতে পারে, তারা নিজেরা মনের দাসত্ব থেকে মুক্তি পাননি, অথবা তারা ‘জমিদার’ হওয়ার খায়েশ পোষণ করেন। তাও যদি না হয়, তবে তাদের অসাম্প্রদায়িকতা আর নারীবাদের কথামালা আরোপিত। না হলে এতবড় সাম্প্রদায়িকতা, অন্যায়ের ব্যাপারে তারা মুখ খুলতেন। এমন কিছু কিছু নিশ্চুপতার ঘটনাই মূলত ‘আরোপ’ আর ‘স্বরূপ’ এর পার্থক্যটা করে দেয়।

পুনশ্চ : শেষে আত্মসমালোচনাটা করে নিই। যে গণমাধ্যম বা তার কর্মী ‘নাপিত’ শব্দটিকে হেয় অর্থে খবরের শিরোনামে যুক্ত করেছেন, সেটাও এক ধরনের ‘রেসিজম’। গণমাধ্যমের কাজ মানুষকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তার অধিকারের পক্ষে কথা বলা। তাকে অজান্তেও ছোট করা নয়। কোনো পেশাকে অসম্মানিত করা নয়।

কাকন রেজা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

সম্পর্কিত বিষয়: