বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার আগেই পুত্রবধূকে নিয়ে মোংলা উপজেলার শেলাবুনিয়ায় নিজ বাড়িতে পৌঁছানোর কথা ছিল বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্বজনদের। আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীরা অপেক্ষা করছিলেন নবদম্পতিকে বরণের জন্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য। সড়ক দুর্ঘটনা এক মূহুর্তে কেড়ে নিয়েছে তাদের হাসি-আনন্দ।
বৃহস্পতিবার বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় নৌবাহিনীর স্টাফ বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় নববধূকে বহনকারী মাইক্রোবাসটির। রাত ১০টা পর্যন্ত মাইক্রোবাস চালকসহ দুই পরিবারের ১৪ জন নিহত হয়েছেন। গভীর রাতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মোংলায় ৯টি, কয়রায় ৩টি, দাকোপে ১টি এবং রামপালে নেওয়া হয়েছে মাইক্রোবাস চালকের মরদেহ। এখন শেষ বিদায়ের অপেক্ষায় স্বজনরা।
মোংলার আব্দুর রাজ্জাকের ৫ ছেলে ও এক মেয়ে। দুর্ঘটনায় নিহত ২ ছেলে, মেয়ে, এক পুত্রবধূ ও চার নাতির নিথর দেহ এখন বাড়িতে। আহাজারি করছেন, জীবিত ৩ ছেলে ও তাদের মা এবং স্বজনরা।
স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে হারানো জনি বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। স্ত্রীর সন্তান ভাই-বোন সবই হারালাম। আমি একা হয়ে গেলাম।’
রাজ্জাকের প্রতিবেশী মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মরদেহের গোসল হয়ে গেছে। জুমার পরে দাফন হবে।
বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামের জানাজায় অংশগ্রহণের কথা রয়েছে।
কাটাখালি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাফর আহমেদ বলেন, পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিহতদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নিহত বর-বউসহ ১০ জনের মরদেহ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া রামপাল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকা চারজনের মরদেহ সেখান থেকে হস্তান্তর করা হয়েছে। শুক্রবার গভীর রাতে খুমেক হাসপাতালের মর্গের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স। স্বজনদের আহাজারি আর শোকের মাতমে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই শুধুমাত্র সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে প্রশাসনও এতে সম্মতি দেয়। এর আগে দুর্ঘটনাস্থল রামপাল থেকে আরও চারটি মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মরদেহ হস্তান্তরের সময় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে নৌবাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত থেকে পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ও স্বজনদের সহযোগিতা করেন।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাইব্রিজ এলাকায় বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাস ও নৌবাহিনীর একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে প্রাণ হারান দুই পরিবারের ১২ জন এবং মাইক্রোবাসের চালক। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, দুপুরে খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা এলাকার মিতুর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় সাব্বির। পরে নববধূকে নিয়ে মোংলার নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয় পুরো পরিবার। মোংলা উপজেলার বেলায় ব্রিজ এলাকায় পৌঁছলে দুর্ঘটনাটি ঘটে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে দুর্ঘটনার পরপরই একের পর এক লাশ ঢোকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। নবদম্পতিসহ একে একে নয়টি লাশ নেওয়া হয় মর্গে। এছাড়া রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছিল চারজনের মরদেহ।
কাটাখালী হাইওয়ে থানার উপপুলিশ পরিদর্শক এসআই মো. হাসান জানান, নিহতদের সবাই মাইক্রোবাসের যাত্রী ছিলেন। মাইক্রোবাসে বর পরিবারের ১১, কনে পরিবারের ৩ জন ও ড্রাইভারসহ ১৫ জন যাত্রী ছিল। আর মৃতদের মধ্যে মোংলা পোর্ট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকসহ বর পরিবারের ৯ জন, কনে পরিবারের ৪ জন ও ড্রাইভারসহ ১৪ জন নিহত হন।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

