কিছুদিন ধরে অফিস, বাসা, আড্ডা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেকেই অভিযোগ করছেন, "মাথাটা ফেটে যাচ্ছে", "চোখের পেছনে কী যে ব্যথা", "ঘাড়টা এমন ধরে গেছে যে ঘোরানোই যাচ্ছে না।" অনেকেই ভাবছেন, এটা কি শুধু ঠান্ডা লাগা? নাকি নতুন কোনো ভাইরাস?
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দেবাশিশ রঞ্জন গত তিন দিন ধরেই এমন সমস্যায় ভুগছেন।
"টানা তিন দিন ধরে ভয়ংকর মাথাব্যথা। চোখের চারপাশে চাপ আর ঘাড়ে টান। কোন কাজ করতে পারছি না। মাথার ভেতর কেমন একটা অস্থিরতা কাজ করে," বলছিলেন তিনি।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, দেবাশিশ জানিয়েছেন তার রক্তচাপ স্বাভাবিক আছে, ঘুমও ঠিকঠাক হচ্ছে, তবু ব্যথা কমছে না। "এরপর দেখলাম, আমার স্ত্রীরও একই উপসর্গ শুরু হয়েছে। তখনই মনে হলো, বিষয়টা হয়তো ভাইরাসজনিত।"
দেবাশিশ একা নন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসকদের চেম্বারে প্রতিদিনই এমন উপসর্গ নিয়ে ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ।
নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ ডা. জোনায়েদ রহিম বলছেন, গত কিছুদিন ধরেই তিনি মাথা, ঘাড় আর চোখ ব্যথার সমস্যা নিয়ে রোগী পাচ্ছেন বেশি।
"বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা ভাইরাসজনিত সংক্রমণের উপসর্গ। তবে এবারের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, অনেক রোগী খুব বেশি জ্বর নিয়ে আসছেন, যেটা কোভিডের শুরুর দিকটায় ছিলো। সেইসাথে রোগীরা মাথা, ঘাড় আর চোখ ব্যথার কথাও বলছেন," বলছিলেন মি. রহিম।
এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা রোগীর অবস্থা বুঝে যেমন জ্বর হলে প্যারাসিটামল, অ্যালার্জির সমস্যা থাকলে অ্যান্টিহিস্টামিন এবং জ্বর ৪/৫ দিনের বেশি হলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসস্ক্রাইব করছেন।
তবে ডা. জোনায়েদ জোর দিয়ে বলছেন, "ওষুধ অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খেতে হবে।"
নতুন কোনো ভাইরাস?
জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর-এর সংযুক্ত চিকিৎসক ডা. মোনালিসা বলছেন, মাথা, চোখ আর ঘাড় ব্যথা ভাইরাল জ্বরের পরিচিত উপসর্গ।
"এটা একেবারে নতুন কিছু নয়," বলছিলেন তিনি।
এই সময়টায় বাতাসে আরএসভি বা রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ে। এই ভাইরাস সরাসরি শ্বাসতন্ত্রে আঘাত করে। উপসর্গ হিসেবে দেখা দেয় মাথাব্যথা, ঘাড়ে ব্যথা, চোখে ব্যথা, গলা ব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া আর জ্বর।
ইনফ্লুয়েঞ্জা, রাইনোভাইরাস বা অ্যাডিনোভাইরাস সবই আরএসভি এর বিভিন্ন ধরন। ইনফ্লুয়েঞ্জা সাধারণত মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেশি দেখা যায়। অন্য ভাইরাসগুলো নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সক্রিয় থাকে।
তবে এখন হঠাৎ করে এই উপসর্গগুলো বেড়ে যাওয়ার পেছনে ভাইরাসের কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলার আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা দরকার বলে মনে করেন ডা. মোনালিসা।
"ভাইরাস সংক্রমণে একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম উপসর্গ দেখা দেয়। কারও শুধু জ্বর হয়, কারও মাথা বা ঘাড় ব্যথা। এগুলো সাধারণ উপসর্গের মধ্যেই পড়ে, কিন্তু ভাইরাসে কোন পরিবর্তন এসেছে কিনা সেটা পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়া বলা যাবে না," বলেন তিনি।
একেক জনের একেক কারণ
জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর-এর সংযুক্ত চিকিৎসক ডা. মোনালিসা বলছেন, মাথা, চোখ আর ঘাড় ব্যথা ভাইরাল জ্বরের পরিচিত উপসর্গ।
"এটা একেবারে নতুন কিছু নয়," বলছিলেন তিনি।
এই সময়টায় বাতাসে আরএসভি বা রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ে। এই ভাইরাস সরাসরি শ্বাসতন্ত্রে আঘাত করে। উপসর্গ হিসেবে দেখা দেয় মাথাব্যথা, ঘাড়ে ব্যথা, চোখে ব্যথা, গলা ব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া আর জ্বর।
ইনফ্লুয়েঞ্জা, রাইনোভাইরাস বা অ্যাডিনোভাইরাস সবই আরএসভি এর বিভিন্ন ধরন। ইনফ্লুয়েঞ্জা সাধারণত মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেশি দেখা যায়। অন্য ভাইরাসগুলো নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সক্রিয় থাকে।
তবে এখন হঠাৎ করে এই উপসর্গগুলো বেড়ে যাওয়ার পেছনে ভাইরাসের কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলার আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা দরকার বলে মনে করেন ডা. মোনালিসা।
"ভাইরাস সংক্রমণে একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম উপসর্গ দেখা দেয়। কারও শুধু জ্বর হয়, কারও মাথা বা ঘাড় ব্যথা। এগুলো সাধারণ উপসর্গের মধ্যেই পড়ে, কিন্তু ভাইরাসে কোন পরিবর্তন এসেছে কিনা সেটা পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়া বলা যাবে না," বলেন তিনি।
ঋতু বদলের ফাঁদ
শীত ও বসন্তের সন্ধিক্ষণে ঋতু পরিবর্তনের এই সময়টা বরাবরই একটু গোলমেলে। দিনে রোদের গরম, আবার রাত বা ভোরে ঠান্ডা বাতাস।
বৃষ্টি না হওয়ায় বাতাসে ধুলোবালি, পরাগরেণু আর জীবাণুর বেড়ে যাওয়ার কারণে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দ্রুত আবহাওয়ার পরিবর্তন ও শুষ্কতা ভাইরাসজনিত সংক্রমণের আদর্শ পরিবেশ। এই মৌসুমে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা কমে যেতে যাওয়ায় ভাইরাস সহজেই কাবু করতে পারে।
আবার রোদের তীব্রতা কম থাকায় শরীরের অনেক ক্ষেত্রে ভিটামিন 'ডি' এর পরিমাণ হ্রাস পায়, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে এবং গায়ে ব্যথা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইএনটি কেয়ার সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, হঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তন, বাতাসের চাপ কমে যাওয়া আর শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে নাক ও শ্বাসতন্ত্রের সংবেদনশীলতা বেড়ে গিয়ে ঠান্ডা লাগা ও সাইনাসের প্রদাহ বেড়ে যায়। এর ফল হিসেবেই দেখা দেয় মাথাব্যথা, চোখ ব্যথা আর ঘাড় ব্যথা।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ঠান্ডা আবহাওয়ায় মাথার ভেতরের রক্তনালিগুলো হঠাৎ সঙ্কুচিত হয়। আবার গরমে সেগুলো প্রসারিত হয়।
এই বারবার সঙ্কোচন আর প্রসারণ মাথার ভেতরে চাপ তৈরি করে। সঙ্গে পেশির টান বাড়ে। ফলাফল কপাল, কানের পাশ বা চোখের ওপরে টনটনে ব্যথা।
নাক বন্ধ হয়ে গেলে সমস্যাটা আরও বাড়ে। ঠান্ডা লেগে সাইনাসের নালিগুলো বন্ধ হয়ে গেলে কপাল আর চোখের চারপাশে চাপ তৈরি হয়। এটাকেই বলা হয় 'সাইনাস হেডেক'।
যাদের আগে থেকেই মাইগ্রেন বা ক্রনিক মাথাব্যথার ইতিহাস আছে, তাদের জন্য এই সময়টা আরও কষ্টকর।
শরীরের ভেতরের গল্প
এই মৌসুমের শুষ্ক বাতাসে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে। তাছাড়া শীতে তৃষ্ণা কম লাগে, ফলে পানি খাওয়াও কমে যায়। চিকিৎসকদের মতে, ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা মাথাব্যথার অন্যতম কারণ।
এদিকে ঠান্ডার প্রভাবে ঘাড় আর কাঁধের পেশি শক্ত হয়ে যায়। সেই শক্ত পেশি থেকেই ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে মাথার দিকে। অনেক সময় ব্যথা শুরু হওয়ার পরেই মানুষ টের পায়, ঘাড় আর কাঁধ কতটা শক্ত হয়ে আছে।
শুধু পেশি নয়, ভাইরাস সংক্রমণ সরাসরি ঘাড়ের মাংসপেশিকে টাইট করে দিতে পারে। ঘাড়ে থাকা লিম্ফ নোড বা গ্রন্থিগুলো শীতে ফুলে যায়। এই ফোলা লিম্ফ নোড ঘাড়কে শক্ত করে ফেলে, এতে ব্যথা হয়।
ঠান্ডার কারণে শরীরের টিস্যুগুলো ফুলে নিজের জায়গা থেকে অল্প অল্প ছড়াতে থাকে এবং নার্ভে গিয়ে চাপ সৃষ্টি করে। ফলে ব্যথা হয়।
আরও একটি বিষয় উল্লেখ করছেন বিশেষজ্ঞরা, তা হলো রাইনোভাইরাস। এই ভাইরাস শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে কম তাপমাত্রায় দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে।
মানুষের স্বাভাবিক শরীরের তাপমাত্রা সাধারণত ৯৭ থেকে ৯৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট। শীতল আবহাওয়ায় এই ভাইরাস বেশি সক্রিয় হয়, ফলে ঠান্ডা লাগার ঝুঁকি বাড়ে।
শুষ্ক আবহাওয়ায় নাক আর সাইনাসের ভেতরটা শুকিয়ে গিয়ে চাপ তৈরি হয়। তখন চোখের পেছনে ব্যথা, মাথা ঝিমঝিম করে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
চিকিৎসকদের মতে, এই সময়ে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ৫৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ।
এছাড়া যাদের আগে থেকেই হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি জটিল হতে পারে।
এর বাইরে ঋতু পরিবর্তনের সময় ভাইরাস সংক্রমণকে খুব অস্বাভাবিক বলেও মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা।
ডা. মোনালিসা একটা পরিচিত মেডিকেল রসিকতার কথা মনে করিয়ে দেন, "ফ্লু হলে ওষুধ খেলে এক সপ্তাহ, না খেলেও সাত দিন। এর মানে এসব সংক্রমণ নিজে থেকেই সেরে যায়।"
তবে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মানুষদের অবশ্যই বাড়তি সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
সুস্থ থাকতে সহজ কিছু অভ্যাস
এই সময় মাথা, ঘাড় আর চোখের ব্যথা কমাতে বড় কোনো চিকিৎসার দরকার নাও হতে পারে। ছোট কিছু অভ্যাসই আরাম দিতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এক্ষেত্রে তারা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:
আবহাওয়া ঠান্ডা হলে বাইরে বেরোনোর সময় মাথা, কান আর কপাল ঢেকে রাখা জরুরি। শরীর যাতে ঘেমে ঠান্ডা বসে না যায়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। ঘাম হলে বারবার মুছে ফেলতে হবে।
পানি খাওয়ার কথা ভুলে গেলে চলবে না। তৃষ্ণা কম লাগলেও শরীরের পানির চাহিদা কমে না। গরম পানি, ভেষজ চা বা হালকা স্যুপ উপকারী হতে পারে।
ঘাড় ব্যথা করলে গরম তোয়ালে ঘাড়ের পেছনে রাখলে পেশি ঢিলে হয়। কপালে হালকা ঠান্ডা কাপড় দিলে ব্যথার তীব্রতা কিছুটা কমে। ধীরে ধীরে ঘাড় আর কাঁধ ঘোরানোর ব্যায়ামও উপকার দেয়।
ফিজিওথেরাপিস্টদের মতে, নিয়মিত এক্সারসাইজ শীতকালে ঘাড় ব্যথা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম রক্তসঞ্চালন বাড়ায়, পেশি ব্যথা কমায়। প্রয়োজনে ইলেকট্রোথেরাপি বা ম্যানুয়াল থেরাপিও নেওয়া যেতে পারে।
ঘরের বাতাস খুব শুকনো হলে সাইনাসে চাপ বাড়ে। এজন্য ঘরে পানিভর্তি পাত্র বা হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করলে ভালো।
পড়াশোনা বা স্ক্রিনে কাজ করার সময় আলো ঠিক রাখাও জরুরি নইলে চোখে বাড়তি চাপ পড়ে।
একই ভঙ্গিতে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা যাবে না। কিছুক্ষণ পরপর ভঙ্গি বদলাতে হবে। মাথা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে মোবাইল দেখার অভ্যাস কমানোই ভালো। কেননা এতে ঘাড়ে অনেক চাপ পড়ে।
সঠিক নিয়মে ঘুমানোও খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনিয়মিত ঘুম মাইগ্রেন আর ঘাড় ব্যথার ঝুঁকি বাড়ায়।
এখনকার ভাইরাস বেশ সংক্রামক হওয়ায় হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশির সময় নাক-মুখ ঢেকে রাখা, ব্যবহৃত জিনিসপত্র পরিষ্কার রাখা, এই পরিচিত স্বাস্থ্যবিধিগুলো মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া ধুলোবালি থেকে বাঁচতে মাস্ক ব্যবহার, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া আর প্রয়োজনে কুসুম গরম পানির ভাপ নেওয়ার পরামর্শও দিচ্ছেন তারা।
ঘরে ঘরে মাথাব্যথা আর ঘাড় ব্যথার এই গল্প আসলে শরীর আর পরিবেশের এক যৌথ সংকেত হতে পারে বলে জানিয়েছেন ডা মোনালিসা।
ঋতু বদলের এই সময়টায় শরীর একটু বেশি যত্ন চায়। ছোট উপসর্গগুলোকে অবহেলা না করে, আবার অকারণ আতঙ্কেও না ভুগে সচেতন থাকাই এখন সবচেয়ে বড় ওষুধ বলে তাদের মত। বিবিসি বাংলা
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

