টিটিপি-প্রভাবিত আফগান প্রদেশগুলোতে ইসরায়েল-সম্পৃক্ত এনজিও কার্যক্রম নিয়ে পর্যালোচনায় ধরা পড়েছে যে, আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলের সক্রিয় গোপন উপস্থিতি রয়েছে।
আফগানিস্তানে ইসরায়েলের এ গোপন উপস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তায় গুরুতর আশঙ্কার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষত যেখানে তেহরিক ই তালেবান (টিটিপি)-এর ঘাঁটি রয়েছে, ওই সকল প্রদেশগুলোতে ইসরায়েল-সম্পৃক্ত বেসরকারি সংস্থার কার্যক্রমের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে কুনার, নানগারহার, খোস্ত, পাকতিকা ও পাকতিয়ার মতো পাকিস্তান সীমান্তসংলগ্ন যেসব অঞ্চলে টিটিপির শক্ত উপস্থিতি রয়েছে—সেই স্থানগুলোতেই অতীতে আন্তর্জাতিক সহায়তা কার্যক্রম, যার মধ্যে ইসরায়েলি অর্থায়নে পরিচালিত এনজিওর পরিচালিত হয়ে আসছে।
এই প্রদেশগুলো আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে টিটিপি জঙ্গিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে আফগান তালেবান প্রশাসন টিটিপিকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছে, যার ফলে সেখানে প্রশিক্ষণ শিবির ও কার্যক্রম চালু রয়েছে—যদিও পাকিস্তান বারবার এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
টিটিপি, যাকে একাধিক দেশ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে, ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে পাকিস্তানে হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর রেকর্ডসংখ্যক হামলা চালানো হয়েছে, যা আফগান ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, ইসরায়েলি মানবিক সংস্থাগুলো মূলত সংকটকালে আফগানিস্তান-সম্পর্কিত কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে। যেমন, ইসরাএইড ২০২১ সালে ঝুঁকিপূর্ণ আফগান নাগরিকদের সরিয়ে নিতে সমন্বয় করেছিল—যার মধ্যে বিচারক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী প্রমুখ ছিলেন। তারা মধ্যবর্তী দেশগুলোর মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরে সহায়তা করে।
একইভাবে, দ্য শাই ফান্ডআফগানিস্তান থেকে বিশৃঙ্খল প্রত্যাহারের সময় উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সহযোগিতায় ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছিল।
এছাড়া বৈশ্বিক ইহুদি ও ধর্মভিত্তিক সংস্থা যেমন দ্য হিব্রু ইমিগ্র্যান্ট এইড সোসাইটি (এইচআইএএস) শরণার্থী পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং এসব প্রচেষ্টার জন্য স্বীকৃতিও পেয়েছে।
২০২৩ সালে আফগানি ইনিস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটিজিক স্টাডিজ তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর আফগানদের উদ্ধার ও পুনর্বাসনে ভূমিকার জন্য ইসরাএইড ও তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট এনজিওগুলোকে স্বীকৃতি দেয়।
তবে মানবিক কার্যক্রমের এই উপস্থিতি এবং টিটিপির শক্ত ঘাঁটিগুলোর ভৌগোলিক মিল অনেকের মধ্যে কৌশলগত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, অস্থিতিশীল অঞ্চলে ত্রাণ ও সহায়তা কার্যক্রম কখনও কখনও দ্বৈত উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে—যদিও এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য প্রমাণ সীমিত।
আফগানিস্তান ও ইসরায়েলের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। বর্তমান তালেবান প্রশাসনসহ আগের সরকারগুলোও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি।
পাকিস্তান বারবার অভিযোগ করেছে যে আফগান ভূখণ্ডে টিটিপির নিরাপদ আশ্রয় আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছে। ইসলামাবাদ এ নিয়ে গোয়েন্দা-ভিত্তিক অভিযান ও সীমান্তের ওপারে বিমান হামলাও চালিয়েছে।
পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত, যা ডুরান্ড লাইন নামে পরিচিত, সেখানে নিয়মিত সংঘর্ষ ও অনুপ্রবেশের ঘটনা উত্তেজনা আরও বাড়াচ্ছে। পাকিস্তান জোর দিয়ে বলছে, টিটিপির অবকাঠামো ভেঙে ফেলা শান্তির জন্য অপরিহার্য; অন্যদিকে আফগানিস্তান বিদেশে হামলার জন্য সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে।
এই জটিল নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল-সংযুক্ত মানবিক সংস্থাগুলোর উপস্থিতি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও মানবিক কাজ জীবনের সুরক্ষা ও সহায়তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবুও সংঘাতপূর্ণ ও জঙ্গি-প্রভাবিত এলাকায় এমন কার্যক্রম স্বচ্ছতা ও আস্থার প্রশ্ন উত্থাপন করে।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য টিটিপির মতো গোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয় বন্ধ করা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বিত কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
সূত্র: টাইমস অব ইসলামাবাদ
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

