কলকাতা থেকে যে জাতীয় মহাসড়ক দিল্লির দিকে চলে গেছে, সেই দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বর্ধমানের দিকে যেতে মেমারির কাছাকাছি রাস্তার ডানদিকে তাকালে একটি উঁচু মন্দিরের চূড়া দেখা যায়। দূর থেকে এই মন্দিরের চুড়ার বিশেষত্ব বোঝার উপায় খুব একটা নেই।
স্বাভাবিকভাবেই খুব বেশি ভাবিওনি। তবে সামাজিক মাধ্যমে ভারতের পুরাতত্ব বিভাগের পোস্ট দেখে এই মন্দিরের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। এই প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহের শুরুও তখন থেকেই।
জানতে পারি, ওই যে মন্দিরটি চোখে পড়ত, সেটি আসলে প্রাচীন এক জৈন মন্দির। একেশ্বরবাদী আব্রাহামিক ধর্মের ভারতে আগমন ঘটার আগে যে ধর্মগুলি ব্যাপকতা লাভ করেছিল, সেগুলির মধ্যে অন্যতম হলো জৈন ধর্ম। আর অন্য দুটি হলো হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম। এছাড়া অবশ্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলির নিজ নিজ ধর্মগুলিও ছিল, যেগুলি মূলত: প্রকৃতি পূজা।
বাংলায় হিন্দু ও বৌদ্ধ বাঙালি বহু রয়েছেন যাদের পিতৃপুরুষরা বহু প্রজন্ম ধরে সেই ধর্মই পালন করে আসছেন। কিন্তু বাংলাভাষী জৈন ধর্মাবলম্বী মানুষ যদি বলা হয়, তবে অনেকেই একটু আশ্চর্য হন।
কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলের বাসিন্দারা 'জৈন সম্প্রদায়' বলতে বোঝেন রাজস্থানের মাড়োয়ার, মেওয়াড়, বিকানের ইত্যাদি অঞ্চল থেকে ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করা ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কথা।
এখনও কলকাতায় যতগুলো জৈন মন্দির রয়েছে তার সবকটিরই প্রতিষ্ঠাতা ও নিয়ন্তা এই গোষ্ঠীর মানুষরাই। বাংলাভাষী অথচ ধর্মে জৈন, এই পরিচয় অনেকের কাছেই কিছুটা অবাক করার মতো।
তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এখন ভৌগলিক ভাবে বাংলার পশ্চিমাঞ্চলে যে রাঢ় এলাকা, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে, ২৪ তম এবং শেষ তীর্থঙ্কর, মহাবীর জৈনের এই অঞ্চলে আগমনের সময় থেকেই এখানকার মানুষ জৈন ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করেন।
পশ্চিমবঙ্গে বহু প্রাচীন জৈন মন্দির ও মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলিই পুরুলিয়া জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
আবার এই পুরুলিয়া জেলারই লাগোয়া ঝাড়খন্ড রাজ্যের পরেশনাথ পাহাড়ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অতি পবিত্র তীর্থক্ষেত্র, কারন, তারা বিশ্বাস করেন, জৈনদের ২৪ জন তীর্থঙ্করের মধ্যে ২০ জনই সাধনায় মোক্ষলাভ অর্থাৎ পরম জ্ঞানের প্রাপ্তি ঘটিয়েছিলেন এই পাহাড়ের চূড়ায়।
তাই এই অঞ্চলে জৈন প্রভাব থাকা অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু সেই বাঙালি জৈনরা কোথায় গেলেন? কী হল তাদের ধর্মস্থানগুলির?
সেই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
জৈন তীর্থঙ্কররা এসেছিলেন এখনকার বাংলায়
জৈনদের পবিত্র গ্রন্থ আচারঙ্গ সুত্র, যা লেখা হয়েছিল ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আশেপাশে, সেখানে উল্লিখিত আছে যে জৈন ধর্মের প্রবর্তক ও শেষ তীর্থঙ্কর বর্ধমান মহাবীর এই অঞ্চলে এসেছিলেন। সেই গ্রন্থে একাধিকবার 'লাড়' অঞ্চলের কথা উল্লেখ রয়েছে।
ইতিহাসবিদরা মনে করেন এই 'লাড়' বলতে আসলে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চলকে বোঝানো হয়েছে।
রাঢ় অঞ্চল থেকে পরেশনাথ পাহাড়ের মাঝে রয়েছে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলা যা প্রাচীন মানভূম ও বজ্রভূম অঞ্চলের অন্তর্গত ছিল।
ভারতের অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম সমসাময়িক সময়ে প্রবর্তিত ও বিস্তারলাভ করেছিল। পুরাণবিদ দেবদত্ত পট্টনায়ক লিখেছেন, বৈদিক আচার অনুষ্ঠানের আড়ম্বর বাদ দিয়ে অনাড়ম্বর জীবন যাপন ও নিজের চরিত্র গঠনের দিকে মনোনিবেশ করেছে জৈন ও বৌদ্ধ - এই দুই ধর্মই।
জৈন ধর্মে ২৪জন তীর্থঙ্করকে শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক রূপে পুজো করা হয়। 'বহুত্ববাদ' এই ধর্মের একটি মূল সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ, সত্য একটিই কিন্তু সত্যকে ব্যাখ্যা করার পথ বিভিন্ন হতে পারে।
জৈন ধর্ম 'বর্ণ-প্রথা'র বিরোধিতা করে। জৈন ধর্মাবলম্বীরা আমিষ অর্থাৎ মাংসজাত খাদ্য খান না। এমনকি মূল-কন্দ জাতীয় খাদ্য, যেমন পেঁয়াজ, রসুনও এই ধর্মে নিষিদ্ধ।
পুনর্জন্ম ও কর্মফলে বিশ্বাস করেন জৈনরা।
জৈন সাধকরা মূলতঃ উলঙ্গ থাকেন, জৈন তীর্থঙ্করদের মূর্তিও হয় উলঙ্গ কিন্তু কামনা-বাসনাহীন জীবনযাপনের কথা বলেন তারা।
যেভাবে শুরু হলো যাত্রা
তথ্য তো হাতে এল, কিন্তু মনে কিছু প্রশ্ন রয়েই যায়। কৌতুহল নিরসনের জন্য নিজের চোখেই দেখতে বেরিয়ে পড়ি।
বর্ধমানের যে অঞ্চলটিতে জৈন মন্দিরটি দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার নাম সাত দেউল বা সাত দেউলিয়া। স্থানীয়দের মধ্যে বেশ বয়স্ক একজন বললেন এখানে আগে সাতটি দেউল ছিল। তবে এখন একটিই দেউল রয়েছে।
উঁচু চূড়া যুক্ত রকেট আকৃতির মন্দিরগুলিকে দেউল বলা হয়।
তার আবার রেখ দেউল, পীড়া দেউল ইত্যাদি রকমফের আছে।
যে মন্দিরগুলিকে প্রাচীন জৈন মন্দির বলে চিহ্নিত করা হয়, সেগুলি রেখ দেউল রীতিতেই তৈরি। এই রেখ দেউলের সঙ্গে ওড়িশার মন্দির রীতির বিশেষ মিল রয়েছে বলে জানিয়েছেন ড. সুভাষ রায়। পুরুলিয়ার ইতিহাস ও সেখানকার জৈন মন্দিরগুলির ইতিহাস নিয়ে অনেক গ্রন্থের লেখক তিনি।
এই দেউলগুলি ইট বা পাথর উভয় দিয়েই নির্মিত হতে পারে। এই মন্দিরগুলি কিছুটা জৈন মন্দির ও কয়েকটি হিন্দু মন্দির বলে চিহ্নিত হলেও ইতিহাসবিদদের মধ্যে তা নিয়ে মতবিরোধ আছে।
বেশিরভাগ যে সব মন্দিরগুলিকে বহু ঐতিহাসিক জৈন মন্দির বলে চিহ্নিত করেন, সেই মন্দিরগুলির অনেকগুলিতেই বর্তমানে শিব মূর্তি রয়েছে, আবার কোথাও জৈন তীর্থঙ্করদের মূর্তিই শিব বলে পূজিত হচ্ছে।
সেই সংক্রান্ত নিদর্শন আমি আমার ভ্রমণে পেয়েছি যার ছবি এই প্রতিবেদনেই দেওয়া হয়েছে।
সাত দেউল বলে যে মন্দিরটিকে চিহ্নিত করা হয়, সেই মন্দিরটি ইটের তৈরি।
সেখানে গিয়ে দেখা গেল গর্ভগৃহ একটি গ্রিলের গেট দিয়ে বন্ধ।
গ্রামের কিছু মানুষ এই মন্দিরের চাতালে ফুল রেখে গিয়েছেন। যদিও মন্দিরটির ভিতরে কোনও বিগ্রহ নেই, নেই কোনও শিলাও। কিন্তু স্থানীয়রা এই মন্দিরকে শিবমন্দির বলেন।
এই মন্দিরটি থেকে অনতিদূরেই আরও একটি মন্দির রয়েছে।
বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি রাখা ওই মন্দিরটিতে গ্রামের মানুষ প্রার্থনা ও উৎসব পালন করতে আসেন। মন্দিরের দরজার সামনেই চোখে পড়ল অযত্নে পড়ে থাকা একটি পাথরের মোটিফ এবং পাশে তিন টুকরো হয়ে পড়ে থাকা প্রথম জৈন তীর্থঙ্কর ঋষভনাথের মূর্তি।
স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করা হলে তারা বলেন, মাটি খুঁড়ে কয়েক বছর আগে এই মূর্তিটি পাওয়া গিয়েছিল। সেটি দেখে তাদের মনে হয়েছিল কোনও ঠাকুরেরই মূর্তি হবে তাই মন্দিরে রাখা হয়েছে কিন্তু মূর্তিটি প্রথমে আড়াআড়ি ভাঙা ছিল।
গ্রামের মানুষের এই উত্তর একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়, বাংলায় এই মন্দিরগুলি যারা তৈরি করেছিলেন তারা কোথায় চলে গেলেন? বা কেন এই মন্দিরগুলিকে পরিত্যক্ত হতে দিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই আমার এই যাত্রার মূল উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে। এছাড়া বাংলার জৈনরা এখনও আছেন কিনা, থাকলে কেমন আছেন, সেই প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছিল মনের মধ্যে।
পশ্চিমবঙ্গের' আটলান্টিস' হয়ে ওঠা তেলকূপি
সালটা ছিল ১৯৫৭, স্বাধীন ভারত ক্রমেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। পশ্চিমবঙ্গে কৃষি ও সেচ ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করার জন্য ইতোমধ্যে স্থাপিত হয়েছে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন বা সংক্ষেপে ডিভিসি।
এর প্রথম পর্যায়ে পাঞ্চেত অঞ্চলে দামোদর নদের উপর একটি বাঁধ দেওয়া শুরু হয়। উদ্দেশ্য ছিল দামোদর নদের যে বন্যাপ্রবণ অববাহিকা, সেখানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করে সেগুলিকে কৃষিযোগ্য জমি হিসেবে গড়ে তোলা।
সেই উদ্দেশ্য সফল হলেও এই বাঁধের পিছনে যে জলাধার সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে ডুবে গিয়েছিল এক অত্যন্ত সমৃদ্ধ প্রত্নক্ষেত্র, যার নাম তেলকূপি। বর্তমানে এই প্রত্নক্ষেত্রের মাত্র দুটি পাথরের দেউল দাঁড়িয়ে রয়েছে অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায়।
গ্রীক রূপকথায় সমুদ্রের তলায় তলিয়ে যাওয়া সমৃদ্ধ শহর আটলান্টিসের মতো শুনতে লাগলেও তেলকূপির ইতিহাস বাস্তব ও সভ্যতার অগ্রগতির দোহাইতে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর শিকার।
১৮৭৮ সালে আর্মেনীয় বংশোদ্ভূত ভারতীয় পুরাতত্ববিদ জোসেফ ডেভিড বেগলার এই অঞ্চলে ২২টি মন্দির সম্বলিত এক বিস্তীর্ণ মন্দির-নগরীর সন্ধান পেয়েছিলেন বলে লিখেছেন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াকে তার দেওয়া একটি রিপোর্টে।
পাঞ্চেত বাঁধের উপর দিয়ে তেলকূপির দিকে যাওয়ার সময়ে গাড়িতে বসে জলাধারটির দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, না জানি কত রহস্য ধুয়ে গিয়েছে আর কত এখনও জলের নিচে টিকে রয়েছে।
গড় পঞ্চকোট থেকে তেলকূপি যাওয়ার রাস্তা কাঁচা। দুই দিকে বিস্তীর্ণ লাল মাটির জমি ও খেজুর গাছের সারি।
কাঁচা রাস্তার দুই পাশে কোথাও কোথাও ঘাসের উচ্চতা একজন মানুষের থেকেও বড়, তারই মধ্যে কাঁচা রাস্তার বিভিন্ন শাখা প্রশাখা চলে গিয়েছে ছোট ছোট গ্রামের ভিতরে। অবশেষে একটি কালী মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। সেখান থেকে আর গাড়ি যাওয়ার পথ নেই।
গাড়ি থেকে নেমে দেখলাম প্রায় পাঁচশো মিটার দূরে একটি পাথরের দেউল দাঁড়িয়ে রয়েছে।
'আ ট্যুর থ্রু দ্য বেঙ্গল প্রভিন্সেস' নামক সেই রিপোর্টের 'তেলকূপি' অধ্যায়ে পুরাতত্ববিদ মি. বেগলার বর্ণনা দিয়েছিলেন, 'দামুদা' (খুব সম্ভবত দামোদর) নদের দক্ষিণ তীরে তেলকুপি গ্রামটি অবস্থিত; বাংলার ছোটনাগপুর অঞ্চলে একটি ছোট পরিসরের মধ্যে এত বিপুল সংখ্যক এবং এত চমৎকার সব মন্দির সম্ভবত আর কোথাও দেখা যায় না। মন্দিরগুলো তিনটি সমষ্টিতে বিভক্ত, সবচেয়ে বড় সমষ্টিটি গ্রামের উত্তর-পূর্ব দিকে নদের একেবারে কিনারে অবস্থিত; দ্বিতীয় সমষ্টিটি গ্রামের খুব কাছেই, কিছুটা পশ্চিমে এবং তৃতীয় গুচ্ছটি গ্রামের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত।
তিনি এই মন্দিরগুলোতে শিবলিঙ্গ ও গণেশ মূর্তির উপস্থিতির কথা লিখেছিলেন। যদিও এই মন্দিরগুলির কয়েকটি জৈন মন্দির হতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
তিনি উল্লেখ করেন, "গ্রামের পূর্ব প্রান্তে দুটি মন্দির ও কয়েকটি মূর্তি রয়েছে, তবে সেগুলোর বিস্তারিত বর্ণনার বিশেষ কোনো প্রয়োজন নেই।"
"এ ছাড়া আরও দক্ষিণে বেশ কয়েকটি বিচ্ছিন্ন মন্দির রয়েছে, এর মধ্যে একটি বিষ্ণু বা শিবের মন্দির এবং তার কাছেই বুদ্ধের একটি মন্দির ও একটি বড় মঠের ধ্বংসাবশেষ আছে যা দেখতে অনেকটা ইটের তৈরি বিশাল এক ঢিবির মতো। আমার ধারণা, এটিই এখানকার একমাত্র বৌদ্ধ মন্দির, তবে এটি জৈন মন্দিরও হতে পারে। কারণ, প্রবেশপথের ওপরের ভাস্কর্যটি, যা থেকে মন্দিরটির পরিচয় সম্পর্কে একমাত্র ধারণা পাওয়া সম্ভব, এতই ছোট এবং আবহাওয়ার প্রভাবে এতটাই ক্ষয়ে গেছে যে, তা দেখে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে না এটি আদৌ বৌদ্ধ বা জৈন মন্দির কি না।"
জৈন সমাজের অনেকের এবং ঐতিহাসিকের দাবি, জৈন ধর্মাবলম্বী বণিকরাই ওই মন্দির-নগরী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
জৈনদের পবিত্রতম তীর্থস্থান পরেশনাথ পাহাড় থেকে এই স্থান পর্যন্ত সোজাসুজি দূরত্ব ৫৭ কিলোমিটার।
বছরের বেশিরভাগ সময়ে এই মন্দিরগুলি জলে ডুবে থাকে। শুধু চূড়াটুকু জলের উপরে উঠে থাকে। স্থানীয় এক বাসিন্দা জানালেন এই বছর বৃষ্টি কম হয়েছে, ফলে মন্দিরগুলোতে হেঁটেই যাওয়া যাচ্ছে। মন্দিরের মূল ফটকের উপরের অংশ পর্যন্ত জলের দাগ স্পষ্ট।
মন্দিরটি আড়াআড়িভাবে ফাটলের শিকার। একটি অংশ যে কোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। সামনের ফটকের কিছু অংশ এখনও অবশিষ্ট আছে। ফটকটির সঙ্গে ওড়িশার প্রাচীন মন্দিরগুলির ফটকের মিল রয়েছে।
সেই স্থান থেকে দূরে তাকাতেই আরেকটি মন্দির ঠাহর হলো। সেটিও একই রকম দেখতে। তবে আন্দাজে মনে হলো, দ্বিতীয় মন্দিরটি প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। তীব্র রোদে সেখানে যাওয়া এক প্রকার দুরূহ ব্যাপার।
সেখানে যাওয়ার বদলে তেলকূপি থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার কাঁচা লালমাটির রাস্তা ধরে পৌঁছলাম চেলিয়ামা গ্রাম। এই গ্রামের বাসিন্দা হলেন ড. সুভাষ রায়।
পুরুলিয়ার ইতিহাস ও পুরুলিয়ার জৈনদের মন্দির ও দেউল মন্দির নিয়ে তিনি বহু বই ও গবেষণাভিত্তিক লেখা লিখেছেন।
তিনি জানালেন, আচারঙ্গ সুত্র থেকেই জানা যায় যে মহাবীর জৈন এই অঞ্চল পরিভ্রমণ করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন এই অঞ্চলের মানুষরা তাকে গ্রহণ করেননি।
আচারঙ্গ সূত্রে উল্লেখ আছে যে এই অঞ্চলের মানুষরা বর্ধমান মহাবীর জৈনের পিছনে কুকুর লেলিয়ে দিতেও দ্বিধা করেননি। কিন্তু তিনি এই অঞ্চলে জৈন ধর্ম প্রচার করেন। সময়টা ছিল খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের আশেপাশে।
তবে এখানে তার মতবাদ তখন কতটা প্রসার লাভ করেছিল সেই নিয়ে কোনও প্রামাণ্য নথি পাওয়া যায়নি। কিন্তু কিছু মানুষ যে তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এমনটা মনে করা হয়।
ড. রায় জানালেন, অষ্টম ও নবম শতক নাগাদ পরেশনাথ পাহাড়কে কেন্দ্র করে একটি জৈন রাজত্বের সূচনা হয়েছিল তেলকূপি থেকে দামোদরের দক্ষিণ পাড় পর্যন্ত। তখন বহু জৈন বণিক বারাণসী অঞ্চল থেকে এই অঞ্চলে আসেন। যে ব্যবসা হতো, তা ছিল মূলত তাম্র আকরিক ও বিভিন্ন তৈলবীজের।
একাধিক গবেষক ও ইতিহাসবিদ বলছেন, তেলকূপি অঞ্চলে বীজ ভাঙিয়ে তেল তৈরি করা হতো বলে এর নাম প্রাচীন পুঁথিতে উল্লেখ রয়েছে 'তৈলকম্প' নামে। এই অঞ্চল থেকে রাঢ় অঞ্চল হয়ে প্রাচীন তাম্রলিপ্ত বন্দর পৌঁছতেন জৈন বণিকরা।
ড. রায়ের মতে, যে পথে জৈন বণিকরা তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতেন, সেই পথে বহু জৈন মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ড. রায়ের কথা ধরলে এটা মেনে নিতে হয় যে জৈনরা সেই সময়ে একটি বৃহৎ ব্যবসায়িক শক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন।
নাহলে এত সুবিশাল মন্দির নির্মাণ ও বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পুরাতাত্বিক প্রভাব রেখে যাওয়া ছোট বা দুর্বল জনগোষ্ঠীর পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে মহাবীর জৈন বাংলায় এলেন। কিন্তু জৈনদের বিভিন্ন পুরাতাত্বিক নিদর্শন, যা পাওয়া গিয়েছে, তা সাক্ষ্য দেয় বাংলায় জৈন মন্দির গড়ে উঠেছিল অষ্টম শতক নাগাদ।
জৈনদের বাংলায় রমরমাও তখন থেকেই। কিন্তু তার মাঝের প্রায় ১৩০০ বছর জৈনরা কী অবস্থায় ছিলেন?
'হিন্দু হয়ে ওঠা' জৈন দেউল
পুরুলিয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলে জৈন ধর্মের মূর্তি পাওয়া যায়। তার মধ্যে বহু মূর্তিই এখন হিন্দুদের দ্বারা শিব হিসেবে পূজিত হচ্ছে।
ড. সুভাষ রায় আমাকে বললেন বান্দা বা বাঁদা-র দেউলটি অবশ্যই দেখতে, সঙ্গে পারা ও দেউলঘাটার দেউলগুলিও দেখতে।
বান্দা দেউলটির কাছে গিয়ে দেখলাম ফটক বন্ধ। কিন্তু বাইরে থেকে দেউলটি স্পষ্ট দেখা গেল।
এই দেউলটি এএসআই-এর সংরক্ষিত প্রত্ন-স্থল। তাই রক্ষণাবেক্ষণের ছাপ স্পষ্ট। তেলকূপিতে যে দেউলগুলি দেখেছিলাম বান্দার দেউলটি হুবহু এক, শুধু রক্ষণাবেক্ষণের ফলে এটি অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে।
ড. রায় জানিয়েছিলেন, এই দেউলটি তেলকূপি নেটওয়ার্কেরই একটি অংশ। সামনে এএসআইএর ফলকটিও এই দাবির পক্ষে সাক্ষ্য দেয়।
ড. রায় বলেন, "শুধু জৈন বণিকদের দ্বারাই সব মন্দির তৈরি হওয়া সম্ভব নয়, এখানকার সাধারণ মানুষের সিংহভাগই জৈন ধর্মের এই প্রসারকে গ্রহণ করেছিলেন।"
যদিও এই মন্দিরটিকে কয়েকটি জৈন সমিতি ও স্থানীয় মানুষ জৈন মন্দির বলে দাবি করলেও এএসআই এটিকে জৈন বা হিন্দু কোনও ভাগেই স্পষ্ট ভাগ করেনি। যদিও এই মন্দিরের কাছে একটি নারী মূর্তি আছে যা অনেকের মতে তীর্থঙ্করদের যক্ষিনী হতে পারে।
পুরুলিয়া শহরের পথে পারা অঞ্চলে যে দেউল দুটি পাশাপাশি অবস্থিত, সেই দুটির মধ্যে একটি ইট নির্মিত রেখ-দেউল ও অন্যটি পাথরের রেখ-দেউল।
ইটের দেউলটি দেখতে হুবহু বর্ধমানের সাত দেউলের মতই। কিন্তু এই দুটি দেউল মন্দিরকে পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ বিভাগ গ্রামের মানুষের বর্তমান বিশ্বাস অনুযায়ী 'চণ্ডী ও লক্ষ্মী মাতার মন্দির' বলে চিহ্নিত করে। তবে এই দেউল দুটি যে এক সময়ে জৈন মন্দিরই ছিল, এটি তাত্বিকভাবে বহুল প্রচলিত হলেও যথেষ্ট তথ্য প্রমাণের অভাব রয়েছে।
আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার বরোদা সার্কেলের সুপারিণ্টেণ্ডিং আর্কিওলজিস্ট, ড. শুভ মজুমদার জানান, "পারার মন্দিরগুলি থেকে কোনও জৈন মূর্তি পাওয়া যায়নি। যদিও পারার আশেপাশে প্রচুর জৈন মূর্তি পাওয়া গিয়েছে।"
দেউলঘাটায় একই ধরণের দেউল দেখা গেল পুরুলিয়া শহর ছেড়ে বাঘমুন্ডি যাওয়ার পথে।
একই সময়কাল ও একই স্থাপত্যশৈলী, তবে ভিতরে রয়েছে শিবলিঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন বিভাগ এই মন্দিরকে অবশ্য জৈন মন্দির বলেই ব্যাখ্যা করেছে।
পুরাতত্ববিদ ড. শুভ মজুমদার জানান, "জৈন মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী দেখে হিন্দু মন্দিরের সঙ্গে পার্থক্য করা যায় না। জৈন তীর্থঙ্করের মূর্তি বা তীর্থঙ্করের সঙ্গী কোনও যক্ষিণী মূর্তি বা নিবেদন- দেউলের উপস্থিতি দেখে তাকে জৈন মন্দির বলে চিহ্নিত করা যায়।"
তিনি বলেন, "বাঁকুড়ার বহুলাড়া গ্রামের একটি মন্দিরে মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তি, শিবলিঙ্গ ও গণেশ মূর্তি পুজো করা হয়, কিন্তু ওই মন্দিরে একটি পার্শ্বনাথের মূর্তি আছে ও আশেপাশে ২২টি ছোট নিবেদন-দেউলের উপস্থিতি আছে।"
যার জেরে সেটিকে জৈন মন্দির বলেই স্বীকার করে এএসআই যেখানে পরে 'ব্রাহ্মিনিক্যাল মোড অফ অ্যাপ্রিসিয়েশন' ঘটে।"
পুরুলিয়ার পারা থানার কাছে চালকা গ্রামেও জঙ্গলের ভিতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জৈন মূর্তি দেখা গেল। সেখানে ওই মূর্তিগুলোকে ঘিরে স্থানীয় আদিবাসীদের ধর্মস্থান বা 'থান' গড়ে উঠেছে। মাদল বাজিয়ে সেখানে নৃত্যও করেন তারা।
এরপরে পৌঁছেছিলাম মানবাজার ব্লকের পাকবিড়রা ভৈরব মন্দিরে।
এই মন্দিরটি স্থানীয়দের কাছে ভৈরব মন্দির নামে পরিচিত। কিন্তু এই মন্দিরটির চারপাশে বহু জৈন মূর্তি পাওয়া গিয়েছে। এএসআইও এটিকে জৈন মন্দিরই বলে।
মন্দির পরিসরটিতে তিনটি মন্দির রয়েছে। তিনটিতেই জৈন মূর্তি প্রায় অক্ষত অবস্থায় রয়েছে।
যদিও মন্দিরগুলি ভগ্নপ্রায় ছিল ও পরে সংস্কার হয়েছে। কিন্তু ড. মজুমদারের মতে, মন্দিরগুলির আসল আকৃতিই সংস্কারের পরে হারিয়ে গিয়েছে।
প্রবেশ পথের পাশেই পার্শ্বনাথ জৈনের একটি বিরাট মূর্তি রয়েছে। সামনে রাখা একটি লাল রঙের দানপাত্র, তাতে সাদা রঙ দিয়ে লেখা - প্রণামী। বেদীর উপর শুকনো ফুল ও বেলপাতার উপস্থিতি দেখে আমি নিশ্চিত ছিলাম যে এটিকে স্থানীয় মানুষ শিবজ্ঞানে পুজো করে।
এরকম আরও একটি মন্দির হলো বাঁকুড়ার দেউলভিড়ার পরেশনাথ মন্দির। পার্শ্বনাথের একটি মূর্তি রয়েছে মন্দিরের ভিতরে। পুরাতত্ব বিভাগের সাইনবোর্ডেও সেটিকে জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের মন্দির বলেই লেখা আছে। অবশ্য সেখানেও বহু মানুষ শিবের উদ্দেশ্যে পুজো দিতে আসেন।
পাকবিড়রা মন্দির পরিসরে দেখা হলো নিমাই মাহাতোর সঙ্গে। ওই মন্দিরগুলি ঘুরে দেখার পরেই মি. মাহাতো একটি চাবি নিয়ে হাজির হলেন। মন্দিরের পেছনেই একটি গোল ঘর মতো করা রয়েছে।
সেই ঘরের তালাটি খুলে আমাকে বললেন জুতো খুলে প্রবেশ করতে। সাধারণ দর্শনার্থীদের ভিড়ে যাতে এই ঘরে রাখা প্রত্ন-বস্তুগুলি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তার জন্যই এই ব্যবস্থা।
ঘরটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভনাথ, মহাবীর, পার্শ্বনাথ (বা পরেশনাথ), শান্তিনাথ, নেমিনাথ, বহুবলীর মতো জৈন সন্ত ও তীর্থঙ্করদের মূর্তি। প্রায় একশোর উপর প্রত্নতাত্বিক নিদর্শনে ঠাসা ঘরটি।
নিমাই মাহাতোকে জিজ্ঞেস করতে উনি জানালেন যে এই সব নিদর্শন এই দেউল পরিসর থেকেই পাওয়া গিয়েছে।
বাংলার সরাক জৈনদের কথা
পশ্চিমবঙ্গের পুরাতত্ব ও সংগ্রহালয় বিভাগের পত্রিকা 'পুরাবৃত্ত'-র কার্যনির্বাহী সদস্য ও প্রশিক্ষক অধ্যাপক ড. রঙ্গনকান্তি জানা জানালেন, যে সময়ে মহাবীর জৈন বাংলায় এসেছিলেন, তার অনেক পরে বাংলায় এসেছিলেন এই জৈন বণিকরা, যারা ওই মন্দির-নগরীগুলি বানিয়েছিলেন। মহাবীর জৈন বাংলায় আসার সময় থেকে শুরু করে বণিকদের আসা, অর্থাৎ প্রায় ১৩০০ বছরের যে সময়কাল, সেখানে বাংলার স্থানীয় জৈন বলতে 'সরাক' গোষ্ঠীর উল্লেখ পাওয়া যায়।
ড. জানা বলেন, "ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ ও বৃহদ্ধর্ম পুরাণে এই 'শ্রাবক' শ্রেণীর মানুষদের নিম্নশ্রেণীর মানুষ বলে উল্লেখ করা হয়েছে যারা পরবর্তীকালে সরাক জৈন নামে পরিচিত হয়।"
"জৈন ধর্ম প্রবর্তন হওয়ার আগে ১২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বীরভূম জেলার কোটাসুরে লৌহ আকরিক ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। তখন সবে তাম্র যুগ থেকে বেরিয়ে এসে লৌহ যুগে পা রেখেছে মানুষ, ফলে লোহা অত্যন্ত মূল্যবান একটি ধাতু।"
"ষোড়শ জনপদ গড়ে ওঠার মূল ভিত্তিই ছিল লোহা। অন্যদিকে দামোদর উপত্যকায় লৌহ আকরিক পাওয়া যায়। সেই সময়ের মানুষও এখানে লোহার উপস্থিতির কথা জানত। তখন বহু মানুষই এই অঞ্চলে আসেন," বলছিলেন ড. জানা।
"ষোড়শ জনপদ থেকে বাংলা সাংস্কৃতিকভাবে ও জঙ্গল দ্বারা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল। তবে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে যে এই অঞ্চল থেকে কয়লা সহ বিভিন্ন আকরিক যেত ষোড়শ জনপদে, সেই পথ ধরেই মহাবীর জৈন এই অঞ্চলে এসে থাকতে পারেন।"
তার মতে, গৌতম বুদ্ধ ধর্ম প্রচার করতে পশ্চিম অভিমুখে গিয়েছিলেন, যার ফলে মহাবীর জৈনের জন্য পূর্বে যাওয়াই সহজ মনে হয়েছিল।
অর্থাৎ বাংলায় জৈনদের তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম, যারা খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে তীর্থঙ্কর মহাবীরের প্রভাবে জৈন ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।
দ্বিতীয়, যারা অষ্টম শতকে উত্তর ভারত থেকে এসেছিলেন ব্যবসার উদ্দেশ্যে এবং বেশিরভাগ মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন।
তৃতীয়, ঔপনিবেশিক রাজত্বের শুরুর দিকে রাজস্থান ও গুজরাত অঞ্চল থেকে আসা জৈনরা, যারা কলকাতায় আসেন ব্যবসার উদ্দেশ্যে এবং এখনও রয়েছেন।
ড. সুভাষ রায়ের সুত্রে কথা হয় রঘুনাথপুর দুই নম্বর ব্লকের কামারগুড়া ইচর গ্রামের বাসিন্দা খগেন্দ্রনাথ মাঝির সঙ্গে। তার দাবি, মহাবীর জৈন এই অঞ্চলে আসার পরেই তার পূর্বপুরুষরা জৈন ধর্মে দীক্ষিত হন।
পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী সরাক জৈনদের বেশিরভাগই পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, বর্ধমান ও ঝাড়গ্রাম জেলায় থাকেন।
মি. মাঝি জানান, এই অঞ্চলের জৈনরা অর্থনৈতিকভাবে খুব স্বচ্ছল নন। কেউ কেউ বর্তমানে চাকুরিজীবি হলেও বেশিরভাগই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত।
এদের মধ্যে কিছু মানুষ এখন আমিষভোজী হলেও বেশিরভাগ মানুষই নিরামিষ খাবার খান এবং পেঁয়াজ রসুনও খান না।
তিনি জানালেন যে রঘুনাথপুর ব্লক অঞ্চলে ৫০০ সরাক জৈন পরিবার আছে। তারা মনে করেন, বর্ধমান মহাবীরের প্রভাবে জৈন ধর্ম গ্রহণ করা সরাক জৈনরা শুধু বাংলার নয়, বরং সম্পূর্ণ ভারতেই আদি জৈন সম্প্রদায়।
"আগে আমাদের অনেক মন্দির ছিল, এখন তো সব শিবমন্দির বলে ওগুলোকে", এইটুকু বলে এক প্রস্থ থেমে তিনি বললেন, "আমরা তো আবার নতুন করে (জৈন) মন্দির বানাচ্ছি গ্রামে।"
কিন্তু জৈনদের উপস্থিতি সত্বেও পুরনো জৈন মন্দিরগুলি পরিত্যক্ত হলো কীভাবে, কেন সব শিবমন্দিরে রূপান্তরিত হয়ে গেল?
তখন কালো মেঘে চেয়েছে আকাশ, সামনে পারার ইট নির্মিত দেউল মন্দিরের চূড়া
জৈন মন্দিরগুলি কি ব্রাহ্মণ্যবাদীরা 'অধিগ্রহণ' করেছিল?
পাকবিড়রা থেকে বেরিয়ে ফের রাজ্য সড়কে ওঠার আগে বুধপুর বলে একটি গ্রাম পড়ে। সেখানেও সেটিও একটি দেউল মন্দির ঘিরে গড়ে উঠেছে শিবমন্দির।
অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকে নির্মিত মন্দিরগুলিতে জল নিকাশির জন্য 'মকরমুখ' নালা থাকত। বুধপুর গ্রামের দেউল মন্দিরে দেখা গেল ওই মকরমুখ নালাটিকেই তেল ও সিঁদুর লেপে পুজো করা হচ্ছে। খুব সম্ভবত সেটি মন্দিরেরই একটি ভাঙা অংশ।
ড. রায় বার বার 'অধিগ্রহণ' শব্দটিতে জোর দিয়েছেন এবং এর পিছনে সরাসরি বাংলায় সেন আমলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা শংকরাচার্য প্রবর্তিত শৈবধর্মের প্রভাবে জৈন মন্দিরে "জোরপূর্বক দখলদারি"কে দায়ী করেছেন।
"পাল রাজাদের শুরুর দিকের রাজারা বৌদ্ধ হলেও সব ধর্মের প্রতি সহনুভূতিশীল মনোভাব পোষণ করতেন। কিন্তু তার পরের সেন রাজাদের আমলে জৈন শেঠিদের সঙ্গে রাজশক্তির একটি ব্যবধান তৈরি হলো। কার্যত তাদের শূদ্র পর্যায়ে নামিয়ে নিয়ে আসা হলো।"
তবে যে প্রশ্নটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকল, তা হলো, এক হাজার বছর আগে ভারতের বিভিন্ন মন্দিরে মকরমুখ নালা দেখে মানুষ নিশ্চয়ই জানত সেটি একটি নালা, কিন্তু বর্তমানে সেটিকে বেদীতে রেখে পুজো করা হচ্ছে।
একই ধরনের জল নিকাশির জন্য মকরমুখ আমি নিজেই দেখেছি বান্দার দেউলে। এছাড়াও ওড়িশার ভুবনেশ্বরের শিব মন্দিরে ও কর্ণাটকের হাম্পিতে একাধিক মন্দিরে এমন মকরমুখ নিকাশি দেখা যায়।
আগেই ড. মজুমদার জানিয়েছেন, বহু দেউল পরিত্যক্ত হওয়ার পরে অনেক মূর্তি ও মন্দিরের অংশের দখল নেয় ব্রাহ্মণ্যবাদী আদর্শ।
তবে শৈবদের দ্বারা যে মন্দির জোরপূর্বক দখলকৃত হয়েছিল, এই তত্বকে মান্যতা দেন না ড. রঙ্গনকান্তি জানা।
তিনি বলেন, "সেন রাজাদের আমলে জৈন বণিকদের সঙ্গে সেন রাজাদের দুর্ব্যবহার যে হয়েছে তার প্রমাণ আছে। তাম্রশাসনে বহু জমির দলিলে সেখানে জৈনদের প্রবেশ নিষেধ পর্যন্ত করা হয়েছে।"
যদিও মন্দিরগুলিতে আক্রমণ করে দখল নেওয়ার খুব স্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি।
তা হলে কি 'মন্দির অধিগ্রহণ' বলতে যে হিংসাত্মক ছবি মনে আসে সেটি ভুল?
বর্ধমানে ড. জানার বাড়িতে বসে তার কাছে এই প্রশ্নটি রাখায় তিনি জানালেন, "সেন আমলে বিভিন্ন দমনমূলক নীতির ফলে বাংলায় আজ থেকে ১২০০ বছর আগে যে জৈন বণিকরা এসেছিলেন ও মন্দির নির্মাণ করেছিলেন, তারা অনেকেই বঙ্গদেশ ছাড়তে শুরু করেন ও মন্দিরগুলি পরিত্যক্ত হয়।"
ড. মজুমদার এই বিষয়ে বলেছেন, পরিত্যক্ত মন্দিরগুলি ধীরে ধীরে ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা অ্যাপ্রিশিয়েটেড বা অধিগৃহীত হয়। এই ধরনের অধিগ্রহণ ঘটে সাধারণ মানুষের দ্বারাই অত্যন্ত ধীরে, দীর্ঘ সময় ধরে।
আমি উল্লেখ করলাম, চালকা গ্রামে ভাঙা জৈন মূর্তিগুলি ঘিরে আদিবাসী সমাজের থান গড়ে উঠেছে। তাকে মকরমুখ নালার পূজিত হওয়ার ছবিও দেখাই।
ড. জানা জানালেন, এমন বহু থান রয়েছে পুরুলিয়া জুড়ে যেখানে জৈন মূর্তির ভগ্নাবশেষ রয়েছে ও যেগুলিকে বর্তমানে আদিবাসীরা তাদের থান বলে মান্য করেন। সেটিও একপ্রকার 'অ্যাপ্রিসিয়েশন'।
"এমন বহু থানেই জৈন মূর্তিগুলিকে ঘিরে আদিবাসী নারীরা পূর্ণিমার রাতে উলঙ্গ হয়ে নৃত্যও করেন। সেই আসরে পুরুষদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ।"
ড. জানা বললেন, "কে কাকে কী ভাবে পুজো করবে, সেটা পুরোটাই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার।" সূত্র: বিবিসি বাংলা
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

