হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একাধিক কঠোর শর্ত দিয়েছে ইরান। তবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ খুলে দেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি দুই পক্ষ। এর মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি জাহাজে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ উঠেছে।
শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের আচরণ পরিবর্তন না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলবে না। পরিষদের সচিব ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কমান্ডার মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বেশ কয়েকটি শর্ত তুলে ধরেন।
শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে আর কোনো হুমকি না দেওয়া, ইরান ও অঞ্চলটির মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং অঞ্চলটি থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী সরিয়ে নেওয়া। পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে ইরানের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ নিঃশর্তভাবে মুক্ত করার দাবিও জানিয়েছে তেহরান।
এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি যুক্তরাষ্ট্র। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে সম্মত হওয়ার আগে একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তি চায় ওয়াশিংটন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শনিবার জানিয়েছেন, নৌ চলাচল নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তারা কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে জাহাজ চলাচলের জন্য নির্ধারিত ট্রানজিট রুট নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে। তবে প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া অন্যান্য শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করছে বলে জানান তিনি। এ পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী চুক্তি লঙ্ঘনকে দায়ী করেন আরাগচি।
আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী ওমান জানিয়েছে, আলোচনা ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক পরিবেশে’ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলারও নিন্দা জানিয়েছে দেশটি। ইরান বর্তমানে কার্যত হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করেছে। দেশটি প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার দাবি করছে এবং নিজেদের নির্ধারিত রুট এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা জাহাজগুলোতে বারবার হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কোনো ধরনের টোল আরোপের বিরোধিতা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী চুক্তি অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সূচি এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ নিয়ে একটি পরিকল্পনা চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হওয়ার কথা। একই সঙ্গে ইরানের জব্দ করা সম্পদ নিয়েও আলোচনার কথা রয়েছে। চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে দেওয়া ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হতে আর এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় বাকি। তবে প্রয়োজন হলে এই সময়সীমা বাড়ানো হতে পারে। হরমুজ প্রণালি পরিচালনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলাদা একটি চুক্তিতেও পৌঁছানোর কাছাকাছি রয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, চুক্তির জন্য এটিই সবচেয়ে ভালো সময়। তার দাবি, যুদ্ধের মধ্যে ইরানের জনগণের মধ্যে ঐক্য ও শক্তি বজায় রয়েছে এবং দেশটি এ যুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে শনিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল-গ্যাস কোম্পানি অ্যাডনকের একটি জাহাজে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অংশ হিসেবে ইরান ওই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
এক বিবৃতিতে অ্যাডনক জানিয়েছে, হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময় তাদের এক ডজনের বেশি জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। এসব হামলায় একজন ক্রু নিহত এবং আরও ২০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
পরে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, ওমানের খাসাব শহরের পূর্বে একটি জাহাজে প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। এতে আগুন ধরে গেলেও পরে তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। জাহাজ ও এর সব ক্রু নিরাপদ রয়েছে। তবে এটি অ্যাডনকের জাহাজে হামলার একই ঘটনা কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

