পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে কারাগারে গুরুতরভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে এবং দীর্ঘদিন ধরে একাকী বন্দি করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার বোন উজমা খান। পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করার পর তিনি এসব অভিযোগ করেন।
দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদের কে-পি হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে উজমা তার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের বিস্তারিত তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ইমরানের বন্দিজীবনের পরিস্থিতি নিয়ে তার দেওয়া বার্তাও সাংবাদিকদের জানান তিনি।
উজমা বলেন, ইমরান তাকে জানিয়েছেন, গত ১০ মাস ধরে তার সঙ্গে খুবই অন্যায় আচরণ করা হচ্ছে। সবার কাছে গিয়ে এই অন্যায় ও নির্যাতনের কথা জানাতে ইমরান তাকে অনুরোধ করেছেন বলেও জানান উজমা।
তবে শারীরিকভাবে ইমরানের অবস্থা ভালো বলে দাবি করেন তার বোন। তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, ইমরান পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন।
’ চিকিৎসাকর্মীরা তার রক্তচাপ মেপেছেন এবং তা ১২০/৮০ ছিল বলে জানান তিনি।
উজমা জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে ডেকে পাঠানো হয়।
প্রথমে তাকে পুলিশের উপপরিদর্শক সাকলায়েনের কার্যালয়ে নেওয়া হয়। পরে একটি ছোট গাড়িতে করে তাকে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (পিআইএমএস) নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতালে পৌঁছে ওপরে যাওয়ার পর তিনি ইমরানকে দেখতে পান। উজমার ভাষ্য অনুযায়ী, ইমরান সেখানে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের দেখিয়ে বলেন, প্রায় ১০ মাস পর তার বোন তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।
উজমা বলেন, সাক্ষাতের সময় কর্মকর্তারা নানা কারণ দেখিয়ে দেরি করছিলেন। তাকে ও অন্যদের বারবার বিভিন্ন জায়গায় বসিয়ে রাখা হচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল, কর্মকর্তারা শুধু সময় পার করছেন। চিকিৎসা পরীক্ষার সময় ইমরানের চোখের চিকিৎসা নিয়েও কথা হয়। উজমার দাবি, চিকিৎসাকর্মীরা তার চোখের ড্রপ সম্পর্কে জানতে চান। পরে একটি চোখে চিকিৎসা প্রক্রিয়া করা হয় এবং সেখানে একটি ইনজেকশন দেওয়া হয়। এরপর অন্য চোখটি ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।
হাসপাতালে নেওয়ার পুরো সময় তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা কর্মকর্তারা জানাননি বলে অভিযোগ করেন উজমা। তিনি বলেন, তিনি বারবার গন্তব্যের কথা জানতে চাইলেও কেউ তাকে উত্তর দেননি। তাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও জানতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এ প্রশ্নেরও কোনো উত্তর পাননি। পরে আরিফ নামের একজন চিকিৎসক তার সঙ্গে পরিচিত হন বলে জানান উজমা। দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইমরান তার বর্তমান বন্দিজীবনের সঙ্গে সাবেক মিসরীয় প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির বন্দিত্বের তুলনা করেছেন বলেও জানান উজমা।
উজমার ভাষ্য অনুযায়ী, ইমরান বলেছেন, তাকে যেভাবে একাকী বন্দি রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে, মুরসিকেও একইভাবে বন্দি রাখা হয়েছিল এবং পরে তিনি মারা যান। ইমরান তাকে আরো জানিয়েছেন, একজন চিকিৎসক বলেছেন, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকার কারণে তার রক্তচাপ বেড়ে যাচ্ছে। ফজরের আজানের সময়ের দিকে ইমরানের সঙ্গে উজমার সাক্ষাৎ শেষ হয়। এরপর তাকে আবার আদিয়ালা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর ইমরানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. ফয়সাল সুলতানও আলাদা গাড়িতে করে কারাগারে পৌঁছান।
ইমরানের চিকিৎসা নিয়ে এসব তথ্য প্রকাশের পর খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসা বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া নির্দেশ বাস্তবায়ন করা হয়নি। এ কারণে পিটিআই আদালত অবমাননার আবেদন করবে বলেও জানান তিনি। এর আগে শুক্রবার দিনের শুরুতে ইমরান খানকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে সংক্ষিপ্ত চিকিৎসা পরীক্ষা শেষে তাকে আবার রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। স্থানীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে ডন এ তথ্য জানিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া নির্দেশনা মেনে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়া ও কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়। সপ্তাহের শুরুতে আদালত এ বিষয়ে নিরাপত্তা ও চিকিৎসাসংক্রান্ত নির্দেশনা দিয়েছিল।
তোশাখানা মামলায় ১৪ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন ইমরান খান। ২০২৩ সাল থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। সম্প্রতি কারাগারের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিতে তার রক্তচাপ ওঠানামা এবং এসংক্রান্ত কিছু শারীরিক সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়। এরপর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পন্ন করা হয়। এরপর ভোর হওয়ার আগেই তাকে সরাসরি আদিয়ালা কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

