জীবন মসৃণ নয়। পথে পথে অনেক বাঁক। আছে জয়-পরাজয়। আছে পাওয়া না পাওয়ার গল্প। জয় ও প্রাপ্তির আনন্দ যতটা মধুর, ঠিক তার চেয়ে পরাজয় ও অপ্রাপ্তির কষ্ট সীমাহীন। পরাজয়ে আমরা ভেঙে পড়ি, গুঁড়িয়ে যাই। মাথায় রাখতে হবে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি সবকিছুই জীবনের অংশ। অপূর্ণতা, না পাওয়া, নানান খুঁতগুলোও হতে পারে আপন। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী এবং গ্রহণ করার মানসিকতা আপনাকে অনেকটা স্বস্তি দিতে পারে। এক্ষেত্রে জাপানি পদ্ধতি ওয়াবি-সাবি মেনে চলতে পারেন। ওয়াবি-সাবি মূলত খুঁত, অসম্পূর্ণতা বা অপূর্ণতাকে গ্রহণ করার একটি চমৎকার দর্শন। এটি শেখায়, যা কিছু অসম্পূর্ণ বা খুঁতযুক্ত, যা কিছু সরল, তার মধ্যেও বিশেষ সৌন্দর্য আছে। সেটি হতে পারে মানসিক শান্তির কারণ।
ওয়াবি-সাবি দর্শন আপনাকে অসম্পূর্ণতার মধ্যেও স্বস্তি খুঁজে নিতে সাহায্য করবে। সবকিছুই পরিবর্তনশীল। তাই যা আছে তাকে গ্রহণ করে এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক ক্ষয়কে সম্মান জানিয়েই শান্তি ও সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
ওয়াবি-সাবি কীভাবে কাজ করে
'ওয়াবি' বলতে একাকীত্ব, সরলতা ও প্রাকৃতিক রুক্ষতাকে বোঝায়। 'সাবি' মূলত সময়ের সাথে সাথে জিনিসের যে ক্ষয় হয় তারও যে আলাদা সৌন্দর্য আছে, তাকে বোঝায়। ওয়াবি-সাবি দর্শন আধুনিক জীবনে অতিরিক্ত নিখুঁত হওয়ার চাপ থেকে মুক্তি দেয়। একইসঙ্গে বর্তমান মুহূর্তকে উপভোগ করতে শেখায়। এটি বাড়ির সাজসজ্জা, শিল্পকলা এবং জীবনযাত্রার পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে, যেখানে 'কমই বেশি' এবং 'যা আছে তাই যথেষ্ট'—এই দর্শন কাজ করে।
ওয়াবি-সাবি দর্শনকে যেভাবে নিজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারেন
সময় ও বয়সকে গ্রহণ করা
বয়সের সাথে সাথে মানুষের পরিপক্কতা আসে। তাই বয়সকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে হবে। তেমনি কোনো জিনিসের সময় বাড়লেও, বয়স বাড়লেও তার মধ্যে সামান্য খুঁত দেখা দিতে পারে। তাই বলে তা পরিবর্তন করে নতুন ও ঝকঝকে জিনিস আনতে হবে তা বাধ্যতামূলক নয়। বরং পুরোনোকে মেনে নিয়েও মানসিকভাবে সুখী থাকা যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জিনিসপত্রে চির ধরবে, মরিচা পড়বে এ ব্যাপারগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে হবে।
প্রাকৃতিক উপকরণ ও প্রাকৃতিক রঙ
যতটা সম্ভব প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করুন। প্রাকৃতিক উপকরণ ও প্রাকৃতিক রঙের সান্নিধ্যে থাকুন। কম প্লাস্টিক ব্যবহার করুন, কাঠের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ান। কাচ, মার্বেল, সিরামিক, কংক্রিট, পাথর, ধাতু—এসব উপকরণে আস্থা রাখুন।
কোনো বাড়তি ঝামেলা নয়
ওয়াবি-সাবি দর্শন মনে করায় সবকিছু নিঁখুত হওয়ার দরকার নেই। লিনেন পর্দা বা টেবিলক্লথ ইস্ত্রি করার দরকার নেই। পর্দার ঝুলে থাকা কোণ নিখুঁত না হলেও সমস্যা নেই। মেঝেতে দাগ, সোফায় ভাঁজ—সব ঠিক আছে। যতক্ষণ জিনিসপত্র পরিষ্কার ও সতেজ দেখায়, ততক্ষণ কোনো সমস্যা নেই। অতিরিক্ত সাজানো-গোছানো নিয়ে দুশ্চিন্তা নয়, বরং সহজ, স্বাভাবিক ও আরামদায়কতাই শান্তি দিতে পারে।
ঘরে সবুজ রাখুন
ঘরের ভেতর প্রকৃতির ছোঁয়া আনুন। ফুলদানিতে ডাল, তাজা ফুল রাখুন। কুড়িয়ে আনা পাথর বা এ জাতীয় কিছুও রাখতে পারেন পাত্রে। দেয়ালে টাঙাতে পারেন প্রাকৃতিক উপকরণের হস্তশিল্প।
প্রাকৃতিক আলোর ব্যবহার
ঘরে প্রাকৃতিক আলোর ব্যবহার বাড়ান। বাইরে অন্ধকার না হওয়া পর্যন্ত ঘরে আলো না জ্বালানোর অভ্যাসে বিদ্যুৎ বাঁচে, আবার মনও ভালো থাকে। প্রাকৃতিক আলো মানসিক চাপ বা বিষণ্নতা কমাতে সহায়তা করে। তাই প্রতিদিন অন্তত একবার জানালা খুলে দিন। এতে ঘরে ইতিবাচক শক্তি ফিরে আসবে।
সুঘ্রাণ জরুরি
মাঝে মাঝে ঘরের ভেতরটা সুরভিত রাখুন। স্বাস্থ্যকর ও অর্গানিক মোমবাতি ব্যবহার করতে পারেন। এসেনশিয়াল অয়েলও ব্যবহার করতে পারেন। প্রয়োজনে প্রাকৃতিক ও ঘরোয়া উপায়েও ঘর সুরভিত রাখা যায়। তবে খেয়াল রাখতে হবে কোনো কিছু যেন অতিরঞ্জিত, ঝলমলে না হয়।
অপ্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দিন
ওয়াবি-সাবি দর্শন অনুযায়ী অপ্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দেওয়া জরুরি। আপনার সংগ্রহে যদি অনেক সোয়েটার বা জুতা থাকে, তাহলে কিছু সোয়েটার বা জুতা অন্যদের দিয়ে দিন। সন্তানের সব পুরোনো জামা রেখে না দিয়ে দান করুন। স্মৃতি হিসেবে কয়েকটি রাখতে পারেন।
প্রয়োজনীয়তা ও নান্দনিকতার ভারসাম্য
যে জিনিস আপনার প্রয়োজন সেটি নান্দনিক কিনা তাও নির্দেশ করে ওয়াবি-সাবি। সুন্দর সাবান, ভালো তোয়ালে, রান্নাঘরের সুন্দর পাত্র—এসবকিছু পেতে অনেক টাকা লাগে তা নয়। কেবল নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গী দরকার। সুন্দরের প্রতি দরদ থাকা দরকার। ওয়াবি-সাবির দর্শন অনুযায়ী, প্রয়োজনীয়তা ও নান্দনিকতার ভারসাম্য বজায় রাখাও হতে পারে পরিপূর্ণ জীবনের চাবিকাঠি।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

