১৮৮৯ সালের এক নিঝুম রাত। দক্ষিণ ফ্রান্সের এক মানসিক হাসপাতালের শান্ত জানালা দিয়ে রাতের নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন এক নিঃসঙ্গ চিত্রশিল্পী।
ক্যানভাসে তুলির ঘূর্ণায়মান আঁচড়ে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন এক মায়াবী আকাশ। শিল্পী জানতেন না, তার মনের আবেগ আর প্রকৃতির সৌন্দর্য মেলাতে গিয়ে ক্যানভাসে তিনি যা তৈরি করছেন—তার আসল রহস্য উন্মোচিত হতে সময় লেগে যাবে এক শতাব্দীরও বেশি!
সেই কালজয়ী শিল্পকর্মই হলো ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের ‘দ্য স্টারি নাইট’ (The Starry Night)।
ছবির ভেতর কিসের এত রহস্য?
পদার্থবিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছেন, ভ্যান গঘের আঁকা নীল আকাশের তুলির টানে জড়িয়ে আছে প্রকৃতির এক জটিল নিয়ম—যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘টার্বুলেন্স’ (Turbulence)।
সহজ কথায় বললে, নদীতে পানি যেভাবে পাক খেয়ে ঘোরে, চায়ের কাপে দুধ মেশালে যেমন ধোঁয়াটে ঘূর্ণি ওঠে, কিংবা আকাশে ঝড়ের মেঘ যেভাবে আঁকাবাঁকা হয়ে ছোটে—সেটাই হলো টার্বুলেন্স।
১৯৪১ সালে এক রাশিয়ান গণিতবিদ বিশাল হিসাব-নিকাশ করে এই ঘূর্ণির একটি গাণিতিক সূত্র বের করেছিলেন।
মজার বিষয় হলো, বিজ্ঞানীরা যখন কম্পিউটার দিয়ে ভ্যান গঘের ছবির আলোর উজ্জ্বলতা আর তুলির টান মেপে দেখলেন, তখন দেখা গেল ভ্যান গঘের আঁকা আকাশ আর সেই জটিল গাণিতিক সূত্র একদম হুবহু মিলে গেছে!
ভ্যান গঘ কি বিজ্ঞান জানতেন?
একদমই না! ভ্যান গঘ কোনো সায়েন্সের ছাত্র ছিলেন না, আর হিসাব কষে ছবিও আঁকেননি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রকৃতির প্রতি তার নজর ছিল অসম্ভব তীক্ষ্ণ। তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাতের আকাশ আর বাতাস পর্যবেক্ষণ করতেন।
নিজের মনের ভেতর চলা ঝড় আর বাইরের প্রকৃতির এই গতিকে তিনি যেভাবে তুলির টানে বন্দি করেছেন, তা শত বছর পর আজকের আধুনিক বিজ্ঞানকেও তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
শিল্প যেখানে বিজ্ঞানকে হার মানায়
আজকের যুগে বড় বড় সুপারকম্পিউটার ব্যবহার করেও বিজ্ঞানীরা ঝড়ের এই ঘূর্ণি নিখুঁতভাবে হিসেব করতে হিমশিম খান। অথচ ভ্যান গঘ কেবল নিজের চোখ আর হাতের তুলি দিয়ে সেই কঠিন বিজ্ঞান ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
বর্তমানে নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট (MoMA)-এ ঝুলে থাকা এই ছবিটি তাই এখন আর কেবল কোনো সুন্দর আর্ট নয়, এটি হয়ে উঠেছে শিল্প ও বিজ্ঞানের এক ম্যাজিক!
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

