শুক্রবার,

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১,

২ আশ্বিন ১৪২৮

পরীক্ষামূলক প্রকাশ

শুক্রবার,

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১,

২ আশ্বিন ১৪২৮

Radio Today News

ছেলে শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা: বলাৎকার নাকি ধর্ষণ?

আবিদ আজম

প্রকাশিত: ০২:২৯, ২৯ আগস্ট ২০২১

আপডেট: ২৩:২২, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১

ছেলে শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা: বলাৎকার নাকি ধর্ষণ?

প্রতীকী ছবি

ফেনীর সোনাগাজীতে বলাৎকারের ঘটনা প্রকাশের ভয়ে শিক্ষক কতৃক মাদ্রাসাছাত্রকে হত্যার ঘটনাটি সংবাদের শিরোনাম হয়েছে সম্প্রতি। গেল ২৭ আগষ্ট ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া ওই শিক্ষকের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়। যাতে উপজেলার চরমজলিশপুর ইউনিয়নের চরলক্ষীগঞ্জ হাফেজ সামছুল হক (র.) নুরানী হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার মুহতামিম (অধ্যক্ষ) মোশারফ হোসেন জানিয়েছেন, এর আগেও তিনি আরাফাতকে বলাৎকার করেছেন। কিন্তু ২১ আগস্ট রাতে বলাৎকারের পর আরাফাত বিষয়টি তার পিতাকে বলে দেবে বলে জানায়। এরপর তিনি তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। একপর্যায়ে গলা টিপে আরাফাতকে হত্যা করে লাশ মাদ্রাসা সংলগ্ন ডোবায় ফেলে দেন।

এই ঘটনা প্রথম নয়। এর আগেও এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। যার মাধ্যমে শিশু বলাৎকারের ভয়ানক পরিস্থিতির কথা অনুমান করা যায়। বেসরকারী উন্নয়নকর্মী ও সমাজকর্মীরা বলছেন, প্রধানত দেশের আবাসিক মাদ্রাসা, হিফজখানা ও এতিমখানায় কোমলমতি শিশুরা বলাৎকারের শিকার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি আবাসিক স্কুল ও কলেজের এই ঘটনা ঘটছে। ফলে চরম শারিরীক ও মানসিক হুমকীর মুখে পড়ে যাচ্ছে অসংখ্য শিশু-কিশোরের সোনালী জীবন।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ৮ জুন পর্যন্ত ৪২ জন শিশু বলাৎবারের শিকার হয়েছে, এর ১৯ টি ঘটনাই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও ছয়জন শিশু মাদ্রাসার বাবুর্চি দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। লোক লজ্জা, ট্যাবু এবং আইনি জটিলার জন্য এসব ঘটনা অপ্রকাশিতই থেকে যাচ্ছে। আর মেয়ে শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হলে ধর্ষণ বলা হলেও ছেলে শিশুর বেলায় বলা হচ্ছে বলাৎকার। ফলে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অপরাধ একই হলেও এর শাস্তিও ভিন্নরকম। শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন' নামে একটি আলাদা কঠোর আইন থাকলেও বর্তমানে ছেলে শিশুর ধর্ষণের বিচার অনেক ক্ষেত্রেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে না হয়ে প্রচলিত ফৌজদারি আইনের অধীনেই হচ্ছে। এদিকে, ধর্ষণ এবং বলাৎকারকে একইভাবে বিবেচনা করে এ অপরাধের শাস্তিও সমান হওয়া উচিত মনে করছেন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবি ও সমাজকর্মীরা।

বলাৎকার ও ধর্ষণ, একই অপরাধের ভিন্ন সাজা 
বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনের দন্ডবিধিতে বলাৎকার এবং সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, বলাৎকারের অভিযোগ আসলে দন্ডবিধির কোন ধারার অপরাধ বলে গণ্য হয়? ইংরেজ শাসনামল হতে আমাদের দেশে বলাৎকার এবং সমকামিতাকে দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারার অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।

বিষয়টি নিয়ে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু রেডিও টুডেকে জানান, বাংলাদেশে ধর্ষণ এবং বলাৎকার প্রায় একই ধরনের কার্য হবার পরও পৃথক ধারায় অভিযোগ আনা হয়ে থাকে। মেয়ে শিশু ধর্ষণের শিকার হলে দন্ডবিধির ৩৭৫ ধারা আর ছেলে শিশু বলাৎকারের শিকার হলে দন্ডবিধির ৩৭৭ প্রযোজ্য। একই অপরাধে ভিন্ন সাজা কি অর্থে ব্যবহার করা হয় বলেও প্রশ্ন রেখে তিনি আরও বলেন, কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হলে তার ভার্জিনিটি (কুমারীত্ব) নষ্ট হবার হবার কথা বলা হয়, পাশাপাশি ছেলে শিশু বলাৎকারের শিকার হলে যেহেতু এমন কোন বিষয় থাকে না, তাই বিষয়টা অনেকেই হালকা গুরুত্বহীনভাবে দেখেন।

এদিকে, আইন ও শালিশ কেন্দ্র- আসকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা রেডিও টুডেকে বলেন, ছেলেশিশুদের ধর্ষণের ক্ষেত্রে এখনও বলাৎকার শব্দটি ব্যবহার করা হয়। বিষয়টি ঘটনাটিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে। অনেকেই মনে করেন, এটা তো বলাৎকার, ধর্ষণ না। গুরুতর কোনো অপরাধ নয়। আসলে ধর্ষণ তো ধর্ষণই, তা সে ছেলেশিশুর সঙ্গে হোক বা মেয়ে। এর বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। শীপা হাফিজা আরও বলেন, আইনের মাধ্যমে সমস্যাটিকে শনাক্ত করে সমাধান খুঁজতে হবে। সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে প্রচলিত আইন পর্যালোচনা করে ছেলেশিশু ধর্ষণ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।

আইনের অস্পষ্টতা, অসঙ্গতি ও ফাঁক ফোকর
বাংলাদেশের আইন অনুযায়, শর্ত সাপেক্ষে ১৬ বছরের কম বয়স্ক কোন ছেলে শিশু বলাৎকারের শিকার হলে সেক্ষেত্রে দন্ডবিধির ৩৭৫-৩৭৬ ধারায় ধর্ষণের মামলা নয় বরং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ৯ ধারার অপরাধ হিসেবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে হবে। কিন্তু বলাৎকারের শিকার শিশুটির বয়স যদি ১৬ বছরের অধিক হয় তাহলে আর তার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধকে ধর্ষণ হিসেবে মামলা করার সুযোগ থাকছে না। সেক্ষেত্রে ওই অপরাধটি তখন দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারার অপরাধ হিসেবে দায়রা/ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করতে হয়।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ধর্ষণকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে তাতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ধর্ষণের শিকার হতে পারে শুধু একজন নারী, একজন পুরুষের মাধ্যমে (দণ্ডবিধি ধারা-৩৭৫)। শুধু তাই নয়, দণ্ডবিধির সংজ্ঞাটি বলছে, ধর্ষণের ক্ষেত্রে যৌন সঙ্গম বিবেচনা করার জন্য 'পেনেট্রেশন'-ই (প্রবিষ্ট করা) যথেষ্ট। অথচ সংজ্ঞাটিতে কোথাও 'পেনেট্রেশন'-এর ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি।

এ প্রসঙ্গে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রোগ্রাম বিভাগের পরিচালক নিনা গোস্বামী রেডিও টুডের প্রতিবেদককে বলেন, ছেলে শিশু ধর্ষণকে বলাৎকার বলে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে। ধর্ষণ এবং বলাৎকারকে একইভাবে বিবেচনা করে এর শাস্তিও সমান হওয়া উচিত। আইন ও শালিশ কেন্দ্র সরকারের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে বলেও জানান নিনা গোস্বামী। এদিকে, মানবাধিকার কর্মী ও নারীবাদী লেখিকা জান্নাতুন নাইম প্রীতি মনে করেন, ছেলে শিশু ধর্ষণকে আদর করে বলাৎকার ডাকা হচ্ছে। ধর্ষণকে ধর্ষণ হিসেবেই উল্লেখ করতে গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

'প্রচলিত আইন পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নিহে হবে'
সরকারের শিশু অধিকার রক্ষায় ২৫ সদস্যবিশিষ্ট ককাসের চেয়ারম্যান এ্যাড. শামসুল হক টুকু রেডিও টুডেকে বলেন, বাংলাদেশের চলমান প্রেক্ষাপটে শিশু অধিকার সুরক্ষায় শিশু অধিকার কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার শিশু বান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠায় অঙ্গিকারাবদ্ধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিশু অধিকার ভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন আছে। বলাৎকার, ধর্ষণ ও নিপীড়ন বন্ধ এবং সর্বোপরী শিশু সুরক্ষার ব্যাপারে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ গতিশীল হলে অবশ্যই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে, ধর্ষণের বিদ্যমান আইনের দন্ডবিধিতে কোন পরিমার্জন, সংস্কার বা সংশোধন প্রয়োজ হলে পর্যালোচনা করে উদ্যোগ নিতে হবে বলেও জানান তিনি। এদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম) সোহেল রানা জানান, বলাৎকারের অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব করে না পুলিশ। 

সমাধান কোন পথে?
আইন প্রয়োগকারীদের আইন সম্বন্ধে অস্পষ্ট ধারণা থাকার কারণে ধর্ষণের শিকার বেশিরভাগ ছেলে শিশুই ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে’র কঠোরতম শাস্তির বিধান আর দ্রুত বিচার ব্যবস্থার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে ধর্ষণের পাশাপাশি নীরব মহামারী আকার ধারণ করছে বলাৎকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক তাসলিমা ইয়াসমীন মনে করেন- প্রথমত, আইনি ব্যাখ্যায় ছেলে শিশুর ধর্ষণকে ধারা ৯-এ অন্তর্ভুক্ত করা গেলেও প্রচলিত আইনে যে অস্পষ্টতা রয়েছে তা দূর করতে হবে। দণ্ডবিধির ধারা ৩৭৫-এ ধর্ষণের সংজ্ঞায় ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকে বুঝাতে নারীর পাশাপাশি 'শিশু' শব্দটি যুক্ত করতে হবে। তাসলিমা ইয়াসমীন এ'ও যোগ করেন, একই সাথে দণ্ডবিধির ৩৭৫-এর সংজ্ঞায় 'পেনেট্রেশন' বা 'প্রবিষ্ট করা' এই শব্দটির একটি যথাযথ ব্যাখ্যা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে সমলিঙ্গের মাধ্যমে যৌন সঙ্গমকেও 'পেনেট্রেশন' বলা যায়। পাশাপাশি 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে' 'শিশু'র সংজ্ঞায় ছেলে, মেয়ে বা অন্য কোন লিঙ্গ পরিচয়ের অনধিক ১৬ বছর বয়সী শিশুর কথা সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা যেতে পারে, যেকোন ধরনের অস্পষ্টতা দূর করার জন্য।

এ প্রসঙ্গে রেডিও টুডের কথা হয় বেসরকারি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা সেভ দ্য চিল্ড্রেন ইন্টারন্যাশনালের প্রোগ্রাম ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কোয়ালিটি ডিরেক্টর রিফাত বিন সাত্তারের সাথে। তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গা। ধর্ষণকে ধর্ষণ বলেই সনাক্ত করতে হবে। আইন ও নীতিমালার সংস্কার দরকার সবার আগে। পাশাপাশি বলাৎকার বন্ধে আইনে যথাযথ প্রয়োগসহ সবাইকে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবী শফিকুর রহমান মনে করেন, বিচার হীনতার সংস্কৃতি ও বিচার ব্যবস্থার ত্রুটি ও দূর্বলতা কাটিয়ে উঠা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে বলাৎকার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

 

রেডিওটুডে নিউজ/ইকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের