আইন না থাকার কারণেই কি কমছে নারী প্রার্থীর সংখ্যা?

বৃহস্পতিবার,

১৫ জানুয়ারি ২০২৬,

২ মাঘ ১৪৩২

বৃহস্পতিবার,

১৫ জানুয়ারি ২০২৬,

২ মাঘ ১৪৩২

Radio Today News

আইন না থাকার কারণেই কি কমছে নারী প্রার্থীর সংখ্যা?

রেডিওটুডে রিপোর্ট

প্রকাশিত: ০৮:৪৩, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬

Google News
আইন না থাকার কারণেই কি কমছে নারী প্রার্থীর সংখ্যা?

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। তবে এর মধ্যে অন্তত ৩০টি দলই কোনো নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। এই নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা আনুপাতিক হারে মাত্র চার শতাংশ।

রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের শর্ত অনুযায়ী, দলীয় পদে নির্দিষ্ট হারে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথা থাকলেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে কিছু বলা নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনি বাধ্যবাধকরা না থাকার কারণেই নারী মনোনয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না দলগুলো। এতে রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে।

তারা সতর্ক করে বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলো এই প্রবণতা অব্যাহত রাখলে দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আগের নির্বাচনের সাথে তুলনামূলক চিত্র

বাংলাদেশে এর আগে জাতীয় নির্বাচন হয় যথাক্রমে ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে।

এবারের নির্বাচনে দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনে দুই হাজার ৫৮২টি মনোনয়ন জমা পড়েছিলো। এর মাঝে নারী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র ১০৭টি, যা মোট প্রার্থীর তুলনায় চার দশমিক ২৬ শতাংশ।

মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর এবার ৩৯ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। শেষমেশ নির্বাচনী প্রতিযোগিতার জন্য এখন পর্যন্ত টিকে আছেন ৬৮ নারী প্রার্থী।

আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়াইয়ে মোট কতজন টিকবেন, তা জানা যাবে ২০শে জানুয়ারি।

তবে আগের সব রেকর্ডকে ভেঙে দিয়ে ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলো ৯৪ জন প্রার্থী, আনুপাতিক হারে যা ছিল প্রায় পাঁচ দশমিক ১৫ শতাংশ।

"ওই বছর সব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। তারপরও এত নারী প্রার্থী ছিল। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা আরও বেশি ছিল। এবার বেশিরভাব দলই অংশগ্রহণ করেছে। তারপরও ইতিহাসের সর্বনিম্ন নারী মনোনয়ন এটি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল আলীম।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর এক প্রতিবেদনে ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নবম, দশম, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণের হার উল্লেখ করা হয়েছে।

তাতে দেখা গেছে, পুরুষ প্রার্থীদের তুলনায় নবম (২০০৮) নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের হার ছিল তিন দশমিক ৫১ শতাংশ বা ৫৫ জন, দশম (২০১৪) নির্বাচনে পাঁচ দশমিক ৫৫ শতাংশ বা ৩০ জন এবং একাদশ (২০১৮) নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার ছিল মাত্র মাত্র দশমিক ৮১ শতাংশ বা ৭৩ জন।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনসহ উপরে যে মোট পাঁচটি নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে, এর মাঝে ২০০৮ সালের নির্বাচনকেই "গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে গণ্য করা হয়" উল্লেখ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, "সেটিতেও অনেক নারী প্রার্থী ছিল। পরের তিন প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের একটিতে বিএনপি অংশগ্রহণ করলেও তখনও আওয়ামী লীগের অনেক নারী প্রার্থী ছিল। সেই তুলনায় এবার অনেকটাই কম।"

আইন ও বাস্তবতার ফাঁক
আইনে একটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন পাওয়ার অন্যতম শর্ত হলো দলে ৩০ শতাংশ নারী নেতৃত্ব থাকতে হবে। কিন্তু কত শতাংশকে মনোনয়ন দিতে হবে, তা নিয়ে কিছু বলা নেই।

তবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদে বলা হয়েছে, প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে এবারের সংসদীয় নির্বাচনে ন্যূনতম পাঁচ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে তা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৩৩ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।

কিন্তু জুলাই সনদ যেহেতু এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, তাই কার্যত সেই নিয়মও এখন অচল।

এ বিষয়ে আব্দুল আলীম বলছিলেন, "বাংলাদেশে দলের পদের ক্ষেত্রে আইন আছে, তবে প্রার্থিতার ক্ষেত্রে নাই। জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যে পাঁচ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দিতে হবে। কিন্ত এটি এখন পর্যন্ত অ্যাপ্রুভড না। গণভোটের পর হয়তো অ্যাপ্রুভ হবে। ২০৩০ সালের মাঝে দলগুলোকে এটিকে বাড়িয়ে ৩৩ শতাংশে বা ১০০ আসনে নিয়ে যেতে হবে।"

অর্থাৎ, চতুর্দশ নির্বাচনে হয়তো দলগুলোর এই নিয়ম মানার বাধ্যবাধকতা থাকবে।

এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপি এগিয়ে থাকলেও ওই শতাংশের হিসেবে পিছিয়ে আছে। দলটি থেকে নারী প্রার্থী হলো মাত্র ১০ জন।

দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে নতুন নিবন্ধিত দল বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ-মার্কসবাদী) দলের নয় জন; একমাত্র এই দলটিই তাদের মোট প্রার্থীর এক তৃতীয়াংশ নারী মনোনয়ন দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ধারাবাহিকভাবে নারী প্রার্থী বাড়ানোর বদলে দলগুলো আবারও পুরুষ প্রার্থীকে 'নিরাপদ' বিকল্প হিসেবে দেখছে এবং আইন না থাকার কারণেই এটা সম্ভব হচ্ছে।

"অনেক দেশেই এ নিয়ে আইন নাই। পাশাপাশি, অনেক রাজনৈতিক দলও নিজেরা পলিসি ডেভেলপ করে। অর্থাৎ, স্বপ্রণোদিত হয়ে কোটা তৈরি করে যে আমরা হয়তো ২০ বা ৩০ বা ৪০ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দিবো। বাংলাদেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোনো দল সেরকম কোনো পলিসি নেয়নি," বলছিলেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম।

প্রার্থিতা দেওয়ার বিষয়টি আইনের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কিছু করার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো কোনো দেশে প্রার্থিতা নিয়ে আইন আছে।

"যেমন, ইন্দোনেশিয়ায় আছে। সেখানে ৩৩ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দিতে হবে। না দিলে ওই দেশের নির্বাচন কমিশন ওই তালিকা ফেরত পাঠায় যে ওটা সংশোধন করে আনো।"

কেন কমছে নারী মনোনয়ন?
তবে আইনি বাধ্যবাধকতার বাইরেও আরও কিছু কারণ উঠে এসেছে বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণে।

তারা মনে করছেন, দলগুলোর ভেতরের ক্ষমতার কাঠামো এখনো পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত। সেইসাথে, মনোনয়ন বাণিজ্য, নির্বাচনী ব্যয়ের চাপ এবং সহিংস রাজনীতির আশঙ্কা নারীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পারিবারিক চাপ ও সামাজিক বাস্তবতাও নারী প্রার্থীদের নিরুৎসাহিত করছে।

শুধু ব্যক্তিগত সক্ষমতা নয়, পুরো রাজনৈতিক পরিবেশটাই নারীদের জন্য এখনো প্রতিকূল মনে করছেন তারা।

এ বিষয়ে আব্দুল আলীম বলছিলেন, "রাজনৈতিক দলগুলো যেকোনো মূল্যে জিততে চায় বলেই নারী প্রার্থী দেয়নি। তারা চিন্তা করে, কোন প্রার্থীর জেতার সম্ভাবনা আছে এবং বাংলাদেশের যে সংস্কৃতি, নারীরা সেখানে জিততে পারবে না এবং নারীদের টাকা-পয়সাও কম আছে।"

তবে বাংলাদেশের এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় দল বিএনপি'র এত কম সংখ্যক নারীর মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।

জোবাইদা নাসরীন এ বিষয়ে বলেন, "বিএনপি মনে করছে, মাঠের রাজনীতিতে এখন শক্তিশালী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং নির্বাচনে তাদের কোনো নারী প্রার্থী নেই। যখন জামায়াতে ইসলামীর বিপরীতে নারী প্রার্থী দেওয়া হবে, তখন আসলে ধর্মের ব্যবহার চলে আসবে। তাই সেই আসনে ওই নারীর হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এটাই বাস্তবতা।"

এছাড়া, তৎকালীন সরকারের "মামলা, গ্রেফতার, দমননীতির" কারণে গত ১৫ বছর ধরে মাঠের রাজনীতিতে বিএনপি'র নারী কর্মী আস্তে আস্তে কমে গিয়েছিলো বলে তার ধারণা।

"এছাড়া, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী বিদ্বেষী আবহাওয়া বিরাজ করছে। যারা নমিনেশন পেয়েছেন, দেখা যাচ্ছে যে তারা কোনো না কোনো নেতার স্ত্রী বা আত্মীয়। অর্থাৎ, মাঠের ত্যাগী নারী খুব কম। এখানেও পুরুষতান্ত্রিক ধারা অবলম্বন করা হয়েছে," যোগ করেন তিনি।

"আওয়ামী লীগের সময়ও এই ধরনের পুরুষতান্ত্রিক ধারা ছিল, কিন্তু মাঠের নারীদেরও নমিনেশন দেওয়া হয়েছে তখন," যোগ করে তিনি আরও বলেন, এবার আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার কারণও নারী প্রার্থীদের মনোনয়নে প্রভাব ফেলেছে।

তবে জোবাইদা নাসরীন আরও মনে করেন, মনোনয়নকে আলদা করে দেখার সুযোগ নেই। এখানে মতাদর্শকে কৌশলের আঙ্গিকে উপস্থাপন করে নারীকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

এসময় তিনি গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম ও নারী ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতার কথা উল্লেখ করে বলেন, "গত দেড় বছর ধরে রাজনৈতিক দলগুলো নারী বিদ্বেষী বক্তব্য দিয়েছে, বেগম রোকেয়ার ছবিকে অবমাননা করা হয়েছে, নারী সংস্কার কমিশনকে জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে গালাগাল দিয়েছে। তখন কোনো দল তার প্রতিবাদ করেনি। বরং , নারী সংস্কার কমিশনকে গালাগালি দেওয়ার সময় এনসিপি উপস্থিত ছিল।"

"পুরো দেড় বছর ধরে প্রধান উপদেষ্টা যখন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বা সংস্কার নিয়ে মিটিং করেছেন, তখন নারীদেরকে বাদ দিয়ে করেছেন। আমরা যত ছবি দেখেছি, তা নারী বিবর্জিত। নারী বিষয়ক সিদ্ধান্তেও নারী ছিল না। এটি নারী বিদ্বেষের ক্ষেত্রে উপাদান ছড়িয়েছে।"

তাই, "বিষয়টি এমন না যে হঠাৎ করে নারীর মনোনয়ন কম। পুরো দেড় বছর ধরে নারীবিহীন রাজনীতির সংস্কতি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চর্চিত হয়েছে। এটি তার মনোনয়ন।"

এর প্রভাব কী হতে পারে
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এবং ভোটারের অর্ধেক নারী। নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ বাদ দিতে দেশকে এগিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার, বলছেন বিশ্লেষকরা।

কারণ নারী প্রার্থী কমে যাওয়া মানে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কাঠামোগত সংকটেরই প্রতিফলন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীরা না থাকলে নীতি প্রণয়নেও তার প্রভাব পড়বে।

আব্দুল আলীম বলেন, "তাদেরকে বাদ দিলে পলিসি ডেভেলপমেন্ট, উন্নয়ন ও নীতি-নির্ধারণ, আইন প্রণয়নে নারীরা বাদ যেতে পারে। তাই, আরও বেশি নমিনেশন দরকার ছিল।"

নারী প্রার্থী কমে গেলে সংসদে নারীদের কণ্ঠ আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে নারী ও শিশু বিষয়ক নীতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সমতার প্রশ্নে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এ ধারা চলতে থাকলে রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের নারীরা আগ্রহ হারাতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর।

"যেসব তরুণ নারী নির্বাচনে আসতে চায়, তাদের আগ্রহে ভাটা পড়বে। তারা ভাববে, আমাদের নমিনেশন দেয় না, পদ দেয় না, কেন আমরা নির্বাচন করবো?" বলেন মি. আলীম।

জুলাই আন্দোলনে নারীদেরও সমান অংশগ্রহণ থাকলেও নির্বাচনে তা সেখা যাচ্ছে না জানিয়ে জোবাইদা নাসরীন বলেন, "একটা দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে যদি বাদ দেওয়া হয়, দূরে রাখা হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের গণতন্ত্র কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না।" সূত্র: বিবিসি বাংলা

রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের