‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অবস্থান এখন মুখোমুখি। সরকার যখন সর্বশক্তি নিয়ে প্রচার মাঠে, তখনই নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটে সরকারি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কোনো পক্ষ নিতে পারবেন না। তারা যদি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-এর পক্ষে প্রচার চালান, সেটি হবে দণ্ডনীয় অপরাধ।
ইসির এই পদক্ষেপে সরকারের উচ্চ মহলে তীব্র অসন্তোষের খবর মিলেছে। সাংবিধানিক সংস্থাটির এমন আকস্মিক পদক্ষেপে অনেকটাই হকচকিয়ে গেছেন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা। তারা ধারণাও করতে পারেননি সরকারকে অন্ধকারে রেখে ইসি এমন নির্দেশনা জারি করবে। ভোট গ্রহণের মাত্র ১২ দিন আগে ইসির এই নতুন নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ে কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ মাঠ পর্যায়ে সরকারের সব কর্মকর্তা ইতোমধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে নেমে পড়েছেন।
১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তপশিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। এরপর থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে নানা উপায়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার শুরু হয়। শুরুতে একাধিক আইনজ্ঞসহ গণমাধ্যমে সরকারের এই পদক্ষেপের সমালোচনা এবং আইনগত বাধার কথা আলোচনায় এলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। উল্টো সরকারের তরফে আইনজ্ঞদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সরকারের প্রচার চালাতে আইনগত কোনো বাধা নেই।
অন্যদিকে ইসি বলছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি গণভোট বিষয়ে জনগণকে অবহিত ও সচেতন করতে পারবেন। তবে তিনি গণভোটে ‘হ্যাঁ-এর পক্ষে বা ‘না’-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য জনগণকে কোনোভাবে আহ্বান জানাতে পারবেন না। গতকাল বৃহস্পতিবার সব রিটার্নিং কর্মকর্তাকে দেওয়া চিঠিতে ইসি আরও বলেছে, এ ধরনের কার্যক্রম গণভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে, যা গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৮৬ অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের এ বিধান অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
প্রচার শুরুর এত দিন পরে কেন ইসি এই চিঠি দিল– এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ সমকালকে বলেন, ‘বিষয়টি নজরে আসার পরই চিঠি দিয়েছেন তারা। মোট কথা এত দিন করলেও আর যাতে না করেন, সেটা নিশ্চিত করতেই এ পদক্ষেপ। এরপর থেকে সরকারি কর্মকর্তারা গণভোটের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কোনোটার পক্ষেই প্রচারণা চালাবেন না বলেই তিনি বিশ্বাস করেন।
যদিও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট চেয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে গণভোটের প্রচারের জন্য ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সব দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে নেমে পড়েছেন। সরকারি সব কার্যালয়, ব্যাংক-বীমাসহ সব ধরনের স্থাপনায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যানার-বিলবোর্ড টাঙানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদ অবশ্য দাবি করেছেন, এত দিন যারা প্রচার করেছেন, তাদের বিষয়গুলো অপরাধ হিসেবে আমলে নেওয়ার চেয়ে নতুন করে যাতে কেউ প্রচারে না নামে, সেটাই ইসির উদ্দেশ্য।
তবে গতকাল ইসির এ নির্দেশনা জারির পরে রাতে সমকালের সঙ্গে আলাপকালে উপদেষ্টা পরিষদের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চ মহলে নানা আলোচনা রয়েছে। প্রয়োজনে ইসির যে আইনের বরাতে নির্দেশনা জারি করেছে, ওই আইন সংশোধন করে নতুন অধ্যাদেশ জারির চিন্তাও রয়েছে। তবে এসব কিছুর আগে সরকারের পক্ষ থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো ইসির এই চিঠিতে প্রচার চালালে শাস্তির কথা বলা হলেও সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থায় এরই মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে লাগানো বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার ইত্যাদি প্রচারসামগ্রীর ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নিতে হবে– সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। এগুলো অপসারণ করার বিষয়েও কোনো নির্দেশনাও ওই চিঠিতে নেই। এ প্রসঙ্গে ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ সমকালকে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে এসব প্রচারসামগ্রী কারা স্থাপন করেছে, সেটি ইসির জানা নেই। এমনও তো হতে পারে, এগুলো অন্য কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিও থেকে স্থাপন করা হয়েছে। এ কারণে এগুলোর বিষয়ে ইসি কোনো নির্দেশনা দেয়নি। তিনি বলেন, এসব প্রচারসামগ্রীর বিষয়ে কী করা হবে– সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগ বা সংস্থাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারা এগুলো সরাবে না রেখে দেবে, সেটাও তারাই ঠিক করবে।
এর আগে গত মঙ্গলবার ইসি জানায়, নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন না। তবে তাদের জন্য ভোটারদের গণভোটে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার অনুমতি থাকবে। এর দুদিন পরই বৃহস্পতিবার সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে প্রচারণা চালানোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দিল ইসি।
গণভোট অধ্যাদেশের ২১ ধারায় বলা আছে, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান মোতাবেক যেসব কার্য অপরাধ ও নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসাবে গণ্য, একই ধরনের কার্য গণভোটের ক্ষেত্রেও যতদূর প্রযোজ্য, অপরাধ ও আচরণবিধির লঙ্ঘন বলিয়া গণ্য হইবে এবং এরূপ ক্ষেত্রে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান প্রয়োগ করিয়া এখতিয়ারসম্পন্ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক উক্ত অপরাধের বিচার এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে।’
অন্যদিকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৮৬ ধারায় বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি কোনোভাবে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে তাঁর সরকারি পদমর্যাদার অপব্যবহার করলে তিনি সর্বোচ্চ পাঁচ বছর ও সর্বনিম্ন এক বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবেন।
সরকারের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, নির্বাচন কমিশনের এমন সিদ্ধান্তে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল ক্ষুব্ধ। সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা বা সরকারের মতামত না নিয়েই কমিশন এই চিঠি দিয়েছে, যা গণভোটের মূল চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইসির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে গণভোট আয়োজনে সরকারের তরফে সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ সমকালকে বলেছেন, ‘আমরা নির্বাচন কমিশনের চিঠি পেয়েছি। আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাব।’
উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা প্রচার চালাতে পারবেন– এমন মত দিয়ে নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদ বলেন, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা গভর্নমেন্ট সার্ভেন্ট বা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নন। কাজেই উপদেষ্টারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে বলতে পারবেন। উনারা নিজেরাই জাতির জন্য অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে এ বিষয়ে একটা উদ্যোগ নিয়েছেন। সে কারণে উপদেষ্টারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাবেন– এটাই বাস্তবতা। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তা পারবেন না।
চারটি বিষয়ে গণভোট, এক উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’
এবারের গণভোট অনুষ্ঠিত হবে চারটি বিষয়ে। এর মধ্যে রয়েছে– ক. নির্বাচনের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। খ. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। গ. সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। ঘ. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
গণভোটের দিন এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে মতামত জানাতে হবে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

