আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে ‘সিরিয়াল কিলার’ আখ্যায়িত করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। অধস্তন কর্মকর্তা হিসেবে তাহলে কেন বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি- এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, জিয়াউল আহসান ছিলেন তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) আওয়ামী লীগের শাসনামলে শতাধিক মানুষকে গুম ও খুনের ঘটনায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় দ্বিতীয় দিনের মতো জেরার মুখোমুখি হন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ইকবাল করিম।
এই মামলার একমাত্র আসামি সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে এদিন কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তার উপস্থিতিতেই সাক্ষী ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জেরা চলে।
জিয়াউল আহসানকে ‘সিরিয়াল কিলার’ বলার ভিত্তি কী—আসামিপক্ষের আইনজীবী জানতে চাইলে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমি জিয়াউল আহসান সম্পর্কে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিবেচনাক্রমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে উনি একজন সিরিয়াল কিলার। এই বিভিন্ন মাধ্যমের কোনো একটি তথ্য লিখিত নয়।’
মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স (এমআই) এবং পার্সোনাল সার্ভিসে (পিএস) জিয়াউল আহসান ‘সিরিয়াল কিলার’ মর্মে উল্লেখ ছিল কি না, প্রশ্নে সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমার মনে নেই। আমার অধস্তনরা আমার মৌখিক নির্দেশের প্রেক্ষিতে নির্দেশ পালন সম্পর্কে আমাকে মৌখিকভাবে জানাতেন।’
প্রথম দিনের জেরায় ইকবাল করিম বলেছিলেন, ‘আমি মেজর জেনারেল মোমেনকে (আনোয়ারুল মোমেন) ডেকে বলেছি যে জিয়াউল আহসান একজন সিরিয়াল কিলার। আমি তাকে পদোন্নতি দেওয়ার পক্ষে নই।’
সাবেক এই সেনাপ্রধান আজ জেরায় বলেন, ‘জিয়াউল আহসান সিরিয়াল কিলার জানার পর আমি লিখিত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করিনি। কারণ, সে আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।’
ইকবাল করিম ভূঁইয়া আওয়ামী লীগ আমলে ২০১২ সালের ২৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি যখন সেনাপ্রধান ছিলেন, তখন জিয়াউল আহসান র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদে ছিলেন।
২০১৬ সালে তাকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল করে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক করা হয়। পরের বছর তাঁকে টেলিযোগাযোগ নজরদারির জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) পরিচালক করা হয়। ২০২২ সালে তাকে পদোন্নতি দিয়ে মেজর জেনারেল করে এনটিএমসির মহাপরিচালক করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র–গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সেনাবাহিনীর চাকরি হারান জিয়াউল আহসান। ওই মাসেই রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে।
কোনো ব্যবস্থা নিতে না পারলেও জিয়াউল আহসানকে অপকর্ম থেকে বিরত রাখতে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন দাবি করে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘ডিএমআই জগলুল (জগলুল আহমেদ, পরিচালক মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স) এবং সিওএএসইউ (কমান্ড্যান্ট, আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলকে (আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ) দায়িত্ব দিয়েছিলাম তাকে অপকর্ম থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়ার জন্য। প্রশাসনিক আদেশ মৌখিকভাবে, লিখিতভাবে, বৈঠকের মাধ্যমে এবং ব্যক্তিগতভাবে ডেকে এনে দেওয়া হয়। আমি জিয়াউল আহসানকে ব্যক্তিগতভাবে কখনো ডাকিনি। তিনি আমার সাথে একবার বা দুবার দেখা করতে এসেছিলেন।’
সেনাপ্রধান থাকার সময় জিয়াউল আহসানের কোনো বিষয় নিয়ে কোনো ধরনের তদন্তের নির্দেশ দেননি বলেও জানান ইকবাল করিম। তিনি বলেন, তিনি জিয়াউল আহসানকে সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু পারেননি।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

