জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে (ইউএনজিএ) ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বক্তব্য শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই অধিবেশনকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান সেখানে উপস্থিত একমাত্র মার্কিন প্রতিনিধি।
অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরান সন্ত্রাসবাদের শিকার। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, দেশের আত্মরক্ষার জন্য ইরান কারও অনুমতি বা অনুমোদন নেবে না।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ‘আমরাই সন্ত্রাসবাদের শিকার।’ এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ইরানকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করে বক্তব্য দেন।
পেজেশকিয়ান বলেন, তিনি এমন একটি ইরান থেকে এসেছেন, যেখানে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে কোনো আইনি কাঠামো বা কারণ ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরও বলেন, ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলা চালানো হয়েছে।
ভাষণের শুরুতে পেজেশকিয়ান নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির একটি ছবি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে তুলে ধরেন। এ ছাড়া হামলায় নিহত শিশুদের ছবিও দেখান। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এসব বক্তব্য দেন।
পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের নিরপরাধ মানুষ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও অস্ত্রে সজ্জিত দুই দেশের হামলার মুখে ইরান ‘সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে’ নিজেদের রক্ষা করেছে।
ইরানের পাল্টা হামলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব দিয়েছে, তবে বেসামরিক জনগণকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়নি। তার অভিযোগ, ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল, হাসপাতাল ও অন্যান্য অবকাঠামোতে হামলা চালানো হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
তিনি বলেন, ইরান গত ২০০ বছর ধরে কারও ওপর হামলা করেনি। অথচ এখন দেশটিকেই আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার উৎস এবং সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান ক্ষমতা চায় না অন্য দেশকে আক্রমণ বা আগ্রাসন চালানোর জন্য। দেশটির প্রয়োজন অগ্রগতির জন্য শক্তি, অস্ত্রের মাধ্যমে অন্য সমাজকে হুমকি দেওয়ার জন্য নয়।
ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, এমনভাবে দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে কেউ মনে না করে ইরানের শহরগুলোতে বোমা হামলা চালালেও তার কোনো জবাব দেওয়া হবে না। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, দেশের প্রতিরক্ষার জন্য ইরান কারও অনুমতি বা অনুমোদন নেবে না।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অবস্থান
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও অবস্থান তুলে ধরেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না। তবে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার ইরানের রয়েছে।
তিনি বলেন, ইরান তার এই ‘অন্তর্নিহিত অধিকার’ থেকে সরে আসবে না। তার ভাষায়, ‘পারমাণবিক অস্ত্র নয়, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তিতে কোনো সীমাবদ্ধতাও নয়।’
একই সঙ্গে ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ইসরায়েলের হাতে পারমাণবিক বোমা রয়েছে, কিন্তু দেশটির ওপর কোনো পরিদর্শনের দাবি নেই; অথচ ইরানের ক্ষেত্রে পরিদর্শকদের যেতে বলা হচ্ছে।
তিনি গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়েও সমালোচনা করেন। পেজেশকিয়ানের দাবি, গাজায় ইসরায়েলের হামলায় ৭০ হাজারের বেশি নিরপরাধ মানুষ নিহত হয়েছে। তার অভিযোগ, ইরান যখন আলোচনার টেবিলে ছিল, তখনও দেশটির ওপর হামলা চালানো হয়েছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, ‘তারা হত্যা করে, আর আমাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, আমাদের শাস্তি দেওয়া হয়।’
নিষেধাজ্ঞা নিয়েও সমালোচনা
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, এসব নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ মানুষের।
তার দাবি, অসুস্থ, নিরপরাধ, দরিদ্র ও সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষই এসব নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ‘অবৈধ লক্ষ্য’ অর্জনের জন্য একটি দেশের জনগণকে ত্যাগ করতে চাইছে।
জাতিসংঘে মার্কিন প্রতিনিধির বেরিয়ে যাওয়া
পেজেশকিয়ান যখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ শুরু করেন, তখন মার্কিন প্রতিনিধিদলের একজন কর্মকর্তা সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। ভাষণ শুরুর সময় ওই মার্কিন কর্মকর্তা উঠে দাঁড়ান, নিজের ব্রিফকেস নেন এবং চশমা খুলে সভাকক্ষ ত্যাগ করেন।
পেজেশকিয়ানের ভাষণের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিনিধির বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এর আগে মঙ্গলবার জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেছিলেন। তিনি দাবি করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতেই যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এবং কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো না গেলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ‘ধ্বংস’ করার হুমকিও দেন।
পেজেশকিয়ান তার ভাষণে এসব বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে বলেন, ইরানই সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছে। পাশাপাশি তিনি দেশের আত্মরক্ষার অধিকার, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নিয়ে ইরানের অবস্থান তুলে ধরেন।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

