বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেলেন তারেক রহমান। শুক্রবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তাকে এই পদে আসীন করার সিদ্ধান্ত হয়। স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গুলশান কার্যালয়ের সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, দলের গঠনতন্ত্রের বিধান অনুসারে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে শূন্য পদে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। এর মাধ্যমে তিনি দলীয় গঠনতন্ত্র অনুসারে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, আজকের বৈঠকটি পূর্বনির্ধারিত ছিল না এবং কোনো নির্দিষ্ট এজেন্ডাও ছিল না। তবে বৈঠক শেষে জানানো হয়, দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়েই তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
চেয়ারপারসনের পদ শূন্য হওয়ায় সিদ্ধান্ত
২০১৮ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়। গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর বিএনপির চেয়ারপারসনের পদটি শূন্য হয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় দলের নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিক পরিবর্তন আনা হলো।
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, তারেক রহমান স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন। দলীয় গঠনতন্ত্রের ৭-এর ‘গ’ ধারায় (৩) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের কর্তব্য, ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রসঙ্গে বলা আছে ‘যেকোনো কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান চেয়ারম্যানের অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে বহাল থাকবেন।’
দীর্ঘ নির্বাসনের অবসান
সতেরো বছরের বেশি সময় যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। তার প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বিএনপির ভেতরে ও বাইরে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের অবসান ঘটে।
বিএনপির পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের বাধার কারণেই তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারেননি। যদিও তিনি দেশে ফিরেছেন ওই সরকারের পতনের প্রায় ১৫ মাস পর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার দেশে ফেরা বিএনপির জন্য ‘ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর’ মতো একটি ঘটনা, যা দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে।
বিএনপি আগেই ঘোষণা দিয়েছিল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির নেতৃত্ব দেবেন তারেক রহমান। এই নির্বাচনেই তিনি প্রথমবারের মতো নিজে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
রাজনৈতিক উত্থান ও প্রভাব
১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণকারী তারেক রহমান সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় সন্তান। আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের সময় মায়ের নির্বাচনি কার্যক্রম তদারকির মাধ্যমে তার সক্রিয় রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়।
২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের বিজয়ের পর তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ২০০২ সালে তাকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করা হয়, যা দলের ভেতরে তার বড় উত্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০০৯ সালে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ২০১৮ সালে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান।
মামলা ও নির্বাসন
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ বিভিন্ন মামলায় আওয়ামী লীগ আমলে তারেক রহমান দণ্ডিত হন। তবে সরকারের পতনের পর তিনি এসব মামলা থেকে অব্যাহতি পান।
২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ ও নির্যাতনের অভিযোগের পর ২০০৮ সালে লন্ডনে চলে যান তিনি। পরে সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় পান।
নতুন অধ্যায়ের সূচনা
বিশ্লেষকরা বলছেন, নানা সংকট, বিতর্ক ও নির্বাসন পেরিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন দলটির জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এখন দেখার বিষয়; তিনি কতটা দক্ষতার সঙ্গে দলকে নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে নেতৃত্ব দিতে পারেন।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

