জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেনন, আমরা গতানুগতিক কোন বিরোধীদল হিসেবে এই সংসদে ফাংশন করতে চাই না। আমরা চাই জনগণের সব চাওয়া পাওয়ার কেন্দ্রবিন্দু ও অর্থবহ হোক সংসদ। সরকারি দল যেমন তার দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করবে, আমরাও বিরোধীদলের অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে চাই।
তিনি শনিবার রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ইফতার মাহফিলে সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। এই ইফতারে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যোগ দেন। এ সময় জামায়াত আমির সহ দলীয় নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।
জামায়াত আমির তার বক্তব্যে বলেন, আজকের দিননি দুটি দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদের পর চব্বিশের ৩৬ জুলাই তরুণ যুবসমাজের নেতৃত্বে যে গণবিপ্লব হয়েছিল, তাতে দলমত নির্বিশেষ আমরা শামিল হয়েছিলাম। সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এ মাসের ১২ তারিখ অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সংসদ ও সরকার গঠিত হয়েছে। এই সরকার ও সংসদের কাজে জনগণের বিপুল প্রত্যাশা। আমার মনে হচ্ছে, গত ১৮-১৯ বছর মানুষর এমন একটা দিনের প্রত্যাশায় ছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে এই ইফতার মাহফিল ভিন্ন বার্তা ও আবেদন নিয়ে হাজির হয়েছে।
তিনি বলেন, আরেকটি কারণে এই দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। তাহলো ২০১৩ সালের এই দিনে বিশ্ব নন্দিত কুরআনের ভাষ্যকর, কুরআনের সেবক আল্লামা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীকে ‘পার্ভাটেড কোর্টে’ মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল। তার প্রতিবাদে মানুষ স্বত:স্ফূর্ত বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তা দমনে সরকার অস্ত্রের ভাষা ব্যবহার করে। একদিনে ৭০ জন সহ এক সপ্তাহে ১৬৪ জনকে খুন করা হয়। বিশ্বে এমন নজির আছে বলে জানা নেই। আজকের দিনে সেই ব্যক্তিকে স্মরণ করছি।
তিনি বলেন, আমাদের দু:খ এখানেই থেমে যায়নি। যাদেরকে হত্যা করা হলো, আবার তাদের আপনজনদের নামে মামলা দেওয়া হলো। সেই মামলায় অভিযুক্তরা অনেক নাজেহাল হয়েছেন, আবার অনেকের আদালতের আঙ্গিনা দেখার আগেই জীবন প্রদীপ নিভে গেছে। হাজার হাজার মানুষকে পঙ্গু করা হয়েছে। সেই ক্ষত আমাদের মন থেকে খুব সহজে মুছে যাবার নয়। এভাবে একে একে আমাদের ১১ জন নেতাকে বিদায় করা হয়েছে।
খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে জামায়াত আমির বলেন, আমরা কৃতজ্ঞ, সেদিন বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে এই হত্যাকান্ডকে গণহত্যা বলে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। ১৬ দিন পর তিনি হতরতাল ঘোষণা করেছিলেন। তিনি আজ দুনিয়ায় নেই। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আজকে তার সন্তানের ওপর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পড়েছে। আমরা গতানুগতিক কোন বিরোধীদল হিসেবে এই সংসদে ফাংশন করতে চাই না। আমরা চাই জনগণের সব চাওয়া পাওয়ার কেন্দ্রবিন্দু ও অর্থবহ হোক সংসদ। সরকারি দল যেমন তার দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করবে, আমরাও বিরোধীদলের অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে চাই।
তিনি বলেন, অতীতে আমরা বিরোধীদল দেখেছি। নির্বাচন যেমন আমি-ডামি ছিল, সরকার ও বিরোধীদল তেমন আমি-ডামি ছিল। এ ধরণের কোন বিরোধীদল কোন দেশের জন্য ভাল কোন বার্তা বয়ে আনতে পারে না। সরকারের গৃহীত সব সঙ্গত পদক্ষেপে আমাদের পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। কিন্তু আমাদের বিবেচনায় আমরা যদি দেখি সরকার কোন অসঙ্গত সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নিয়েছেন, আমরা প্রথমে দৃষ্টি আকর্ষণ করে সহযোগিতা করবো। সরকার আমাদের পরামর্শ গ্রহণ করলে আমরা কৃতজ্ঞ হবো, জাতি উপকৃত হবে। আর না গ্রহণ করলে বিরোধীদলের যে ভূমিকা সেটাই আমরা করবো। আমরা জাতির অধিকারের পক্ষে দাঁড়াবো। এবং জাতিকেও আমাদের সঙ্গে শামিল থাকতে বলবো। তবে আমরা এই সদিচ্ছাই রাখতে চাই এবং এ ধারণাই পোষন করতে চাই-এই সরকার এই সংসদকে আগামীতে এগিয়ে যাওয়ার বাহনে পরিণত করবে।
জামায়াত আমির বলেন, কোন বাহন এক চাকায় চলে না। দুটি চাকা প্রয়োজন হয়। সরকারি দল যদি সামনের চাকা হয়, তাহলে বিরোধীদল হবে পিছনের চাকা। একটাকে বাদ দিয়ে আরেকটা চলতে পারবে না। আমরা সেই পথচলায় সমন্বয় চাই এবং পারস্পারিক সম্মান চাই। আমরা আমাদের মহান জাতীয় সংসদে একটা সেকেন্ড নষ্ট হোক তা চাই না। আমরা প্রত্যাশা করি না, জাতীয় সংসদ হবে কারো চরিত্র হননের কেন্দ্রবিন্দু। বরঞ্চ জাতীয় সংসদ হবে দেশের সমস্যার সমাধানের কেন্দ্র বিন্দু। যে সব কালো আইন এখনো সংবিধানে রয়ে গেছে, আমরা সম্মিলিতভাবে সংশোধনের প্রয়াস চালাবো। আর জাতিকে একটা সুস্থ, বিকশিত ও সম্মানের জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে দাঁড় করানোর জন্য যে আইন সংযোজনের প্রয়োজন, আমরা প্রত্যাশা করবো-সরকারি দল ও বিরোধীদল মিলে সেভাবেই এগিয়ে যাব। যদি এই রাজনীতি আমরা করতে পারি, তাহলে অতীতের রাজনীতির যে হতাশাজনক ধারা এখন পর্যন্ত জাতিকে গ্রাস করে আছে, তা থেকে মুক্তি পাবে।
ইফতারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, সরকারের মন্ত্রিপরিষদের অন্যান্য সদস্য, জামায়াত সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এমপি ও নেতা, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, সাবেক বিচারপতি ও সিনিয়র আইনজীবী, কৃষিবিদ, চিকিৎসক, ওলামা-মাশায়েখ, কবি সাহিত্যিক, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদের নির্বাচিত নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন । অনুষ্ঠানে দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

