‘আমাদের পরিবারের সব শেষ হয়ে গেছে। ছোট্ট রিশান ছিল আমাদের প্রাণ। ঘর মাতিয়ে রাখত সারাক্ষণ। সেও বাঁচল না। একসঙ্গে আমরা তিনজনকে হারিয়েছি।’ কথাগুলো বলেছিলেন রাজধানীর উত্তরার অগ্নিকাণ্ডে নিহত রিশানের ছোট খালা আফরিন জাহান। শুক্রবার উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের আবাসিক ভবনের অগ্নিকাণ্ডে রিশান (২), তার বাবা কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী (৩৮) ও মা আফরোজা আক্তার সুবর্ণার (৩৭) মৃত্যু হয়। একই আগুনে আরেকটি পরিবারের তিনজন প্রাণ হারান।
রিশানসহ তার বাবা-মায়ের মরদেহের সুরতহাল রিপোর্ট করেন উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবু সাঈদ। তিনি সমকালকে বলেন, তিনজনেরই ধোঁয়ায় মৃত্যু হয়েছে। তাদের শরীরে পোড়া ক্ষত নেই। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিনা ময়নাতদন্তে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
স্বজন জানান, রাব্বি ও তাঁর স্ত্রী সুবর্ণা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। রিশান তাদের একমাত্র সন্তান। স্বামী-স্ত্রী চাকরি করায় ছোট্ট রিশানকে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরে নানা-নানির বাসায় রেখে অফিসে যেতেন তারা। অফিস থেকে ফিরে ছেলেকে নিয়ে বাসায় ফিরতেন এই দম্পতি।
১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের ৩৪ নম্বরের যে বাড়িতে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, সেটির ৫ম তলায় এই দম্পতি ভাড়া থাকতেন। রাব্বি গুলশানে এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসে চাকরি করতেন। তাঁর স্ত্রী সুবর্ণা চাকরি করতেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের বাড্ডা কার্যালয়ে। আগুনের সময় রাব্বি দম্পতি ও তাদের সন্তান রিশানকে অচেতন অবস্থায় ওই বাড়ি থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার করেন। রাব্বি ও রিশানকে উত্তরার দুটি হাসপাতালে এবং সুবর্ণাকে নেওয়া হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। এসব হাসপাতালের চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান জানান, সুবর্ণাকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। তবে তাঁর শরীরে কোনো পোড়া ক্ষত নেই। ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে তিনি মারা গেছেন।
স্বজন জানান, রাব্বির পৈতৃক বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের চিওরা কাজী বাড়ি। তবে তাঁর বাবা-মা কুমিল্লা শহরের নানুয়া দিঘিরপাড়ে বাস করেন। রাব্বিরা দুই ভাইবোন। রাব্বি বড়। তাঁর বাবা খোরশেদ আলম ঠিকাদারি করেন। রাব্বির মা ফেরদৌস আরা বেগম কুমিল্লা শহরের নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষিকা। একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যুর খবরে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
রাব্বির চাচা ব্যবসায়ী কামরুল হাসান গতকাল রাত ৮টায় সমকালকে বলেন, মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরই গতকাল রাব্বির বাবা-মা কুমিল্লা থেকে ঢাকা আসেন। সন্ধ্যায় তারা তিনজনের মরদেহ নিয়ে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হন। গ্রামের বাড়িতে রাব্বির দাদার কবরের পাশে তিনজনের মরদেহ দাফন করা হবে।
কুমিল্লার নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রাশেদা আক্তার সমকালকে বলেন, রাব্বির মা তাঁর একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে শোকে বাকরুদ্ধ। সকালে যখন তিনি খবরটি পান, তখনও জানতেন না তাঁর ছেলে, বউ ও নাতি আর বেঁচে নেই। এ দুর্ঘটনায় একটি পরিবার তছনছ হয়ে গেল।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

