‘আমাগো কোনো জাগা-ভূই নি, চরে বাস করে ছেলে-পিলে নে কোনো রকমে বেঁচে আছি। নদীতে মাছ-কাঁকড়া ধরেও জীবন চলতেছে না, এখন উচ্ছেদ করলি কনে যাবো’। কথাগুলো বলে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সুন্দরবনসংলগ্ন চুনা নদীর চরে বসবাসকারী সত্তরোর্ধ্ব দিনমজুর আহম্মদ আলী।
শরীরে জড়ানো গামছায় দু’চোখ মুছে নিজেকে সামলে নিয়ে নদীর চরে গড়ে তোলা ঘরের বারান্দায় বসে বৃদ্ধ বলেন, ‘একটা প্রতিবন্ধী সন্তানসহ নাত-পুতি মিলে ১০ জনের সংসার, পাশের নদী আর পানি ছাড়া আমাগো কিচ্ছু নি। ঘরবাড়ি ভেঙে দিলি রাস্তায় থাকতি হবে, তোমরা দয়া করে আমাগো এটটু রক্ষা করো’।
নিজের দো-চালা ঘরের সামনে দাড়ানো ৫৫ বছর বয়সী নীলকান্ড বৈরাগীর ভাষ্য, ‘চল্লিশ বছর ধরে চুনা নদীর চরে সরকারি জমিতে আমাগো বসবাস। পাশের নদীতে মাছ-কাঁকড়া ধরে জীবন চালাচ্ছি। আগে আরও অনেকে চরের এ সরকারি জমি ইজারা নে ঘের-ভেড়ী করলেও আমাগো সরতে বলিনি। তবে সবুজ খান নামের একজন দু’বছর আগে এই জমি ইজারা নেওয়ার পর থেকে আমাগো উচ্ছেদের চেষ্টা চালাচ্ছে।’
তিনি জানান, মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ওয়াপদা অফিসে ডেকে ২৪ ঘণ্টা মধ্যে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে হুকুম দেছে। কথা না মানলি ভেকু দিয়ে বাড়িঘর গুড়িয়ে দেবে বলে হুমকি দেছে তার ম্যানেজার।
তবে শুধু আহম্মদ আলী আর নীলকান্ড নয়-এমন কথা বলেন ওই এলাকার অনেকে। শ্যামনগরের কলবাড়ি ব্রিজসংলগ্ন চুনা নদীর চরে বসবাসরত মারুফা বেগম, আমিনুর রহমান, রতন মন্ডল ও শীবপদ ঋষিসহ প্রতিটি পরিবার এখন চরম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। আর-রাদ ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাগ্রো পার্ক নামের একটি প্রতিষ্ঠান মৎস্য প্রকল্পের জন্য চুনা নদীর চরটি ইজারা নিয়ে সেখানে বসবাসরত ভূমিহীন পরিবারগুলোকে উচ্ছেদে নানামুখী ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।
দশকের পর দশক ধরে চুনা নদীর চরে বসবাস করছে দাবি করে ভূমিহীন পরিবারগুলোর সদস্যরা জানান, আর-রাদ ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাগ্রো পার্ক চিংড়ি ঘের করার জন্য তিন বছরের জন্য ইজারা নিলেও ইতিমধ্যে দেড় বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। মাত্র দেড় বছর বাকি থাকতে হঠাৎ প্রতিষ্ঠানটি উক্ত জমিতে পুকুর গড়ে তোলার চেষ্টায় চরের অন্তত একশ’ বাইন ও কেওড়া গাছ কেড়ে উজাড় করেছে। বাড়িঘর সরাতে সম্মত না হওয়ায় তাদের ঘরের পাশ ঘেঁষে এসকেভেটর দিয়ে গর্ত করে মাটি খুঁড়ে পুকুরের পাড় তৈরি করছে। এমনকি এসেকেভেটর দিয়ে ঘরবাড়ি গুড়িয়ে দেওয়াসহ মামলা দিয়ে হয়রানিরও ভয় দেখাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার।
নিজেরা খুবই অসহায় মানুষ- দাবি করে এসব ভূমিহীনরা জানান, সামর্থ্য না থাকায় তারা অনেকেই ছেলেমেয়েদের বিয়ে পর্যন্ত দিতে পারছেন না। দিনমজুরি করে সংসার চালাচ্ছেন। তারা জানান, সনাতন ধর্মালম্বীদের সৎকারের জন্য একটি শ্মশান থাকলেও এসকেভেটর দিয়ে মাটি কেটে সেটা ঢেকে দেওয়া হয়েছে। সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া শিকারের জন্য তাদের দু’টি নৌকা থাকলেও সেগুলো সরিয়ে নিতে প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে। তাদের নানামুখী অত্যাচার আর হুমকিতে চরম ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছেন বলে দাবি ভূমিহীন পরিবারের সদস্যদের। এমতাবস্থায়, মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়স্থল ছিনিয়ে না নিয়ে বরং আর-রাদ ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাগ্রো পার্কের অনুকূলে ইজারা বাতিলের আবেদন জানিয়েছে এসব ভূমিহীন পরিবারের অসহায় সদস্যরা।
অভিযোগের বিষয়ে আর-রাদ ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাগ্রো পার্কের ম্যানেজার আব্দুর রহমান জানান, উকিল নোটিশ দেওয়ার পরও সেখানে বসবাসরত পরিবারগুলো কোনো জবাব দেয়নি। এমনকি মৌখিকভাবে বলার পাশাপাশি পরিবার পিছু ৫০ হাজার করে টাকা ক্ষতিরপরুণ দিতে চাইলেও তারা কর্ণপাত করছে না। ইজারার তিন বছরের মধ্যে অর্ধেক সময় অতিক্রান্তের পর ভূমিহীন পরিবারগুলো উচ্ছেদের চেষ্টা কেন এমন প্রশ্নে তিনি জানান, এটা ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত। এরপর তিনি কথা না বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামছুজ্জমান কনক জানান, জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

