ঋণখেলাপির নাম ছবি প্রকাশ করতে চায় ব্যাংকগুলো

বৃহস্পতিবার,

২৯ জানুয়ারি ২০২৬,

১৬ মাঘ ১৪৩২

বৃহস্পতিবার,

২৯ জানুয়ারি ২০২৬,

১৬ মাঘ ১৪৩২

Radio Today News

ঋণখেলাপির নাম ছবি প্রকাশ করতে চায় ব্যাংকগুলো

রেডিওটুডে রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১১:১২, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬

Google News
ঋণখেলাপির নাম ছবি প্রকাশ করতে চায় ব্যাংকগুলো

খেলাপি ঋণগ্রহীতার নাম, ছবিসহ তালিকা প্রকাশের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি চেয়েছে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)। ঋণখেলাপিদের উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ পাওয়ার সুবিধা আইনিভাবে রহিত করার ব্যবস্থাও চেয়েছে ব্যাংকগুলো। এ ছাড়া বন্ধকি সম্পদের ডেটাবেজ প্রণয়ন, নিলামে বন্ধকি সম্পদ বিক্রি সহজ করা, ঋণখেলাপিদের বিদেশ যেতে ব্যাংক বা আদালতের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতাসহ বিভিন্ন প্রস্তাব করা হয়েছে। 

খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সম্প্রতি এসব প্রস্তাব জমা দিয়েছে এবিবি। সংগঠনের চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে পাঁচ ধাপে প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। গভর্নর বরাবর দেওয়া চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক বৈঠকে খেলাপি ঋণ কমাতে করণীয় বিষয়ে ব্যাংকের এমডিদের প্রস্তাব দিতে বলা হয়। সে আলোকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে লিখিতভাবে তাদের মতামত তুলে ধরেছেন এমডিরা।

ব্যাংক খাতের এক-তৃতীয়াংশের বেশি ঋণ এখন খেলাপি। গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। মোট ঋণের যা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। জানা গেছে, ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ কমে ৩০ শতাংশে নেমেছে। তবে গত ডিসেম্বরভিত্তিক বিস্তারিত হিসাব এখনও তৈরি হয়নি। 

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দুই লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ ছিল খেলাপি। সে বিবেচনায় এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন লাখ ৫৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা বা দ্বিগুণের বেশি। খেলাপি ঋণের উচ্চহার অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনেক লুকানো খেলাপি ঋণ বেরিয়ে আসছে, যা গত সরকারের আমলে নিয়মিত দেখানো হতো। 

বাংলাদেশ ব্যংকের সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা চাইলে ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশের অনুমোদন দিতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারে ব্যাংককে সেই সুযোগ দেওয়া আছে। ঋণখেলাপিদের জাতীয় বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যদিও অনেক ঋণখেলাপি আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচন করার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে ব্যবসায়ী সংগঠনে নির্বাচন বিষয়ে বিদ্যমান আইনে কিছু বলা নেই।

এমডিদের প্রস্তাব

এমডিদের প্রস্তাবের প্রথম ধাপে খেলাপি ঋণ তাৎক্ষণিক কমানোর উপায় তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিচারে খেলাপি ঋণ আংশিক অবলোপনের সুবিধা দিতে হবে। লিয়েনকৃত শেয়ার নগদায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া মৃত্যু, মরণব্যাধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত ঋণ, গৃহঋণ, ক্রেডিট কার্ড, কিংবা তার একক-মালিকানাধীন কুটির, ক্ষুদ্র এবং ছোট প্রতিষ্ঠানের সুদ মওকুফের মাধ্যমে দ্রুত ঋণ আদায়ের উদ্দেশ্যে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের প্রধানের মতামত নেওয়ার শর্ত তুলে দিতে হবে। 

দ্বিতীয় ধাপে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ঋণের অর্থ পরিশোধে উদ্বুদ্ধ করতে তিনটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ব্যাংক বা আদালতের নির্দেশনা ছাড়া বিদেশ যেতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যবস্থা করতে হবে। খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশের অনুমোদন দিতে হবে। তৃতীয়ত, খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের যে কোনো ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুপযোগী ঘোষণা করতে হবে। 

তৃতীয় ধাপে বন্ধকি সম্পদ বিক্রয়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায় জোরদারে ছয়টি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ব্যাংকের নিলামে বিক্রয় বা ক্রয় করা সম্পত্তি হস্তান্তরে সব ধরনের আয়কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার করতে হবে। নিলামে সম্পদ ক্রয় উৎসাহিত করতে ক্রেতাদের আয়কর রেয়াত কিংবা অন্যান্য প্রণোদনা দিতে হবে। স্থানভেদে নিলামে বিক্রি করা সম্পদ ক্রয়ে জেলা প্রশাসকের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা বিলোপ করতে হবে। নিলামে বিক্রি করা সম্পদ হস্তান্তরে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। নিলামে বিক্রয়ের সুবিধার্থে বন্ধকদাতার অনুপস্থিতিতেও ব্যাংক কর্তৃক জমির খাজনা ও জরিপ সম্পন্ন করার সব সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। আদালত থেকে ব্যাংকের নামে মালিকানা হস্তান্তরিত জমির নামজারি, বয়নামা এর ভিত্তিতে বিনা খরচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করা।

এবিবির প্রস্তাবের পরের ধাপে খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা পরিচালনা সহজ করা এবং মামলার রায় দ্রুত কার্যকরের বিষয়টি রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণগ্রহীতা এবং সংশ্লিষ্ট ঋণের জামানতদাতাদের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রক্ষিত আমানত, সঞ্চয়পত্রের তথ্য, মালিকানাধীন সম্পদের তথ্য, আয়কর রিটার্নের তথ্য, ওয়ারিশ সনদ, জন্ম সনদ, মৃত্যু সনদ এবং পাসপোর্টের তথ্য আদালতের হস্তক্ষেপ ব্যতীত চাহিবামাত্র প্রাপ্তির সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক বা আদালতের যে কোনো পদক্ষেপের বিপরীতে আদালতে যাওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাউনপেমেন্ট জমা দেওয়ার শর্ত আরোপ করতে হবে। সিআইবি প্রতিবেদনের বিপরীতে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে স্থগিতাদেশ পাওয়ার সুবিধা আইনিভাবে রহিত করতে হবে। উচ্চ আদালত থেকে দেওয়া স্টে-অর্ডারে কিস্তিভিত্তিক উল্লেখযোগ্য হারে অর্থ দেওয়ার শর্ত নিশ্চিত করা এবং ওই নির্দেশনা পরিপালনে ব্যর্থ হলে আদালতের হস্তক্ষেপ ব্যতীত স্টে-অর্ডার বাতিল হিসেবে গণ্য করার ব্যবস্থা করতে হবে। 

প্রস্তাবে আরও বলা হয়, উচ্চ আদালত কর্তৃক স্টে-অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের শুনানি নিশ্চিত এবং যেসব জেলায় খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেশি অবিলম্বে আলাদা অর্থঋণ আদালত স্থাপন করতে হবে। একই সঙ্গে থানাগুলোতে খেলাপি ঋণ-সংক্রান্ত আটকাদেশ জরুরি ভিত্তিতে নিশ্চিত করা, আদালত থেকে থানায় সাত দিনের মধ্যে আটকাদেশ প্রেরণ নিশ্চিত করা, অর্থঋণ মামলায় ব্যক্তিগতভাবে হাজিরা ছাড়া মামলা পরিচালনার সুযোগ রহিত করা, অর্থ ঋণ মামলায় দেওয়ানি আটকাদেশের পরিমাণ ছয় মাসের স্থলে ঋণের পরিমাণভেদে সাত বছরে উন্নীত করা এবং স্বল্পতম সময়ে অর্থঋণ আইনের প্রস্তাবিত সংশোধন প্রণয়ন করতে হবে। 

সর্বশেষ ধাপে নতুন খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ঠেকানোর প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জরুরি ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ভূমি জরিপকারী ও মূল্যায়নকারীর তালিকা প্রকাশ করতে হবে। নিবন্ধক কিংবা তহশিল অফিসে বন্ধকি সম্পদের তালিকা সহজে যাচাই করার সুবিধা নিশ্চিত এবং সিআইবি ডেটাবেজের মতো বন্ধকি সম্পদের ডেটাবেজ প্রণয়ন এবং সহজে তা যাচাই করার সুবিধা দিতে হবে। 

চিঠির সমাপনীতে দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এসব প্রস্তাব বিবেচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে দেশের খেলাপি ঋণ আদায় তথা ব্যাংকিং খাত পুনরুজ্জীবিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক অগ্রণী ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করা হয়। 

রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের