মঙ্গলবার,

১৮ মে ২০২১

ক্রিকেটের বরপুত্র ‘ডন’

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২:২৪, ১১ নভেম্বর ২০২০

আপডেট: ০৬:১৩, ১৩ জানুয়ারি ২০২১

ক্রিকেটের বরপুত্র ‘ডন’

ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান

‘দেব বরে জাত পুত্র’ বাক্যটির অর্থ হলো শ্রেষ্ঠ সন্তান। পুরোনো দিনে বলা হতো বরপুত্র। মানে, যে ব্যক্তি কোনো অসাধ্য সাধন করেন, বা বড় কোনো জয় অর্জন করেন, বা সর্বকালের সেরা; তাকে ডাকা হতো বরপুত্র। ক্রিকেট ইতিহাসে সেরা খেলা খেলে থাকেন অনেকেই, তবে সর্বকালের সেরা বলতে আছেন হাতে গোনা ক’জন। তাদের মধ্যে অন্যতম স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। যাকে বলা হয় ক্রিকেটের বরপুত্র।

ক্রিকেটকে শৈল্পিকতার মাধ্যমে তিনি নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। ঊনিশ শতকে ব্যাট-বলের এ খেলা যখন পাখা মেলে ধীর লয়ে আধুনিকতার দিয়ে আগাচ্ছিল তখনকার সময়ে স্যার ডন ব্র্যাডম্যান ছিলেন ক্রিকেটে অনন্য এক নাম।

স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের পুরো নাম ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান। ভক্তকূলের কাছে যিনি ‘দ্য ডন’ নামে পরিচিত। অস্ট্রেলিয়ায় নিউ সাউথ ওয়েলসের কুটামুন্ড্রা গ্রামে ১৯০৮ সালে জন্ম ক্রিকেটের এই বরপুত্র। ১৯২৮ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে অভিষেক হয় তার। ডানহাতি ব্যাটসম্যান এ ব্যাটসম্যান ২২ গজের খেলায় ছিলেন দুই দশক। যদিও কিছু বছর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে খেলা থেকে দূরে ছিলেন। অবসর নেন ১৯৪৮ সালে।

২০ বছরের ক্রিকেট জীবনে স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের এমন কিছু অর্জন আছে, যা হয়ত অনেকেই জানেন না। ক্রিকেট ভক্তদের জন্য রইল সে তথ্যগুলো-

১. ১৯৩০ সালে ইংল্যান্ড সফরে ৯৮.৬৬ গড়ে ডন ব্র্যাডম্যানের রান সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার। সফরে ছিল ৫ টেস্ট। আরও ছিল কয়েকটি প্রস্তুতি ম্যাচ। ডনের ঝুলিতে জমা হয় ৬টি ডাবল সেঞ্চুরি, ১০টি সেঞ্চুরি এবং ১৫টি হাফ সেঞ্চুরি।

২. পুরোদস্তুর মিউজিশিয়ার যাকে বলে, ডন ব্র্যাডম্যান তা না হলেও পাল্লার সমান হবে ঊনিশ-বিশ। ‘এভরিডে ইজ আ রেইনবো ডে ফর মি’ নামে একটি গানের সুর করেছিলেন ডন। ১৯৩০ সালের অ্যাশেজ জিতে অস্ট্রেলিয়া ফেরার পর গানটির সুর করেন তিনি। ‘অ্যান ওল্ড ফ্যাশনড লকেট’ এবং ‘আওয়ার বাংলো অব ড্রিমস’ নামে দুটি গানে পিয়ানো বাজিয়েছিলেন সর্বকালের সেরা এই ক্রিকেটার।

৩. অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের অফিসগুলোর পোস্ট বক্স নাম্বার ৯৯৯৪। এই নাম্বারটি স্যার ডনের সম্মানে চালু করেছিলেন ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের সেই সময়ের জেনারেল ম্যানেজার স্যার চার্লস মোজেস। পেছনের কারণে হলো স্যার ডনের অতিমানবীয় ব্যাটিং গড় ‘৯৯.৯৪’। চার্লস ও ডন ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

৪. সেঞ্চুরির আগের ঘরে এসে অনেক ব্যাটসম্যান আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েন। শতক হাঁকানো থেকে পিছিয়ে পড়বেন কিনা চিন্তা করেন। তবে অজি ব্যাটসম্যান হিসেবে ব্র্যাডম্যানের এসব কিছুতে কোনো চিন্তাই ছিল না। প্রতিবারই শতক হাঁকিয়েছিলেন এই ব্যাটসম্যান। একবার মাত্র অপর প্রান্তের ব্যাটসম্যান আউট হওয়ায় তাকে থামতে হয়েছিল ২৯৯ রানে।

৫. ওয়াল্ট ডিজনির একটা বিখ্যাত কার্টুন চরিত্র ‘ডোনাল্ড ডাক’ সৃষ্টি হয়েছিল ব্র্যাডম্যান থেকে। ঘটনাটি এমন- ১৯৩২ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন ডন ও তার দল। চার মাসের সফরে প্রীতি ম্যাচ, প্রদর্শনী ম্যাচ মিলিয়ে ৫১টি ম্যাচের ৫০টিতে ৩ হাজার ৭৬৫ রান করেন স্যার ডন। একটি ম্যাচে সাজঘরে ফেরেন ‘০’ রানে। দুনিয়ার তাবড় তাবড় বোলারদের ঘুম হারাম করা ডনের খ্যাতি তখন তুঙ্গে। এরমধ্যে শূণ্য রানে (ডাক) আউট হওয়ায়  পত্রিকায় বড় বড় কয়েকটি কলাম লেখা হয়। সেগুলোয় চোখে পড়ে ওয়াল্ট ডিজনির। তারপরই সৃষ্টি হয় ডোনাল্ড ডাক।

৬. অস্ট্রিয়ার একটি এয়ারলাইন্সের নাম ছিল ‘লাউডা এয়ারলাইন্স’। এ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাবেক ফরমুলা ওয়ান রেসার নিকি লাউডা। ২০০২ সালে সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যে এই এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং বিমানের নামকরণ করা হয় ‘স্যার ডন ব্র্যাডম্যান’। বিমানটি ভিয়েনা থেকে সিডনি হয়ে মেলবোর্ন পর্যন্ত যাতায়াত শুরু করে।

৭. প্রথম শ্রেণী এবং টেস্ট ক্রিকেটে স্যার ডনের সর্বোচ্চ সংগ্রহ যথাক্রমে ৪৫২ এবং ৩৩৪। ১৯৪৮ সালে ভারতের কাঠিয়াওয়ারের এক আঞ্চলিক দলের সাথে ক্রিকেট খেলছিল মহারাষ্ট্র দল। ওই ম্যাচে নিম্বলকর নামে এক ব্যাটসম্যান ৪৪৩ রান করেও অপরাজিত ছিলেন। কিন্তু ম্যাচের সব আম্পায়ার মিলে ম্যাচটি আর মাঠে গড়ারে দেননি। তারা মনে করেছিলেন, স্যার ডনের রেকর্ড  ভাঙা উচিত হবে না। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক মার্ক টেলরও এক ম্যাচে ৩৩৪ রান করে মাঠে ছেড়ে চলে আসেন। কারণ, ওই একই।

৮. ১৯৩১ সালে নিউ সাউথ ওয়েলসের টিমমেট ওয়েন্ডেল বিলের সঙ্গে ব্ল্যাকহিথ ভ্রমণ করেন ব্র্যাডম্যান। সেখানে নতুন বানানো একটি পিচে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলেন। সে সময়কার ৮ বলের ওভারে ১৮ মিনিটে সেঞ্চুরি করেন তিনি। ৩ ওভার খেলে রান করেন ২৫৬। ২৯টি চার ও ১৪টি ছয় মেরেছিলেন তিনি।

ওই তিন ওভারের প্রতি বলে ডনের রান ছিল - ৬, ৬, ৪, ২, ৪, ৪, ৬, ১। ৬, ৪, ৪, ৬, ৬, ৪, ৬, ৪। ১, ৬, ৬, ১, ১, ৪, ৪, ৬।

৯. ১৯৩৪ সালে ইংল্যান্ডে এসে অ্যাশেজ খেলে ৩০৪ আর ২৪৪ রানের দুটি ইনিংস খেলেন ডন। বাড়ি ফেরার সময় প্রচণ্ড পেটের ব্যথায় জ্ঞান হারালে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরীক্ষার পর জানা যায় তিনি অ্যাপেন্ডিসাইটিসের রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে অজি দলের বোলার বিল ও রিলিকে ফোন করেন ইংল্যান্ডের রাজা পঞ্চম জর্জ। নিয়মিত ডনের খবর নিয়েছিলেন পঞ্চম জর্জ। পত্রিকাগুলোতে ডন মারা যাচ্ছেন ভেবে শোক শোকগাঁথা ছাপাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে পত্রিকাগুলো।

১০. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ না নিলেও রণক্ষেত্রে তার নাম উচ্চারণ করা হয়েছিল। কীভাবে? ১৯৪৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইটালির মন্টে ক্যাসিনো আক্রমণের পরিকল্পনা করে মিত্রবাহিনী। সংকেত এলেই ধ্বংসজজ্ঞ শুরু হবে। যুদ্ধের সংকেত ছিল - ‘ব্র্যাডম্যান ব্যাটিং টুমরো।’ কিন্তু সংকেত আসে  ‘ব্র্যাডম্যান নট ব্যাটিং’। মূলত আবহাওয়া খারাপ থাকায় মিত্রবাহিনীর এ সংকেত পরিবর্তন হয়ে যায়।

১১. দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা তার ২৭ বছরের কারাভোগের ২২তম বছরে তৎকালীন অস্ট্রেলিয়ান প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম ফ্রেজারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন- ‘মি. ফ্রেজার, ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান কি এখনও জীবিত আছেন?’ ১৯৮৬ সালের ওই ঘটনার ৭ বছর পর ম্যান্ডেলা-ফ্রেজার আবার দেখা হয়। মুক্ত নেলসন ম্যান্ডেলাকে একটি ব্যাট উপহার দিয়েছিলেন ফ্রেজার। স্বয়ং ব্র্যাডম্যানের সই করা ছিল ওই ব্যাট। ম্যান্ডেলার সম্মানে তিনি লিখেছিলেন, ‘নেলসন ম্যান্ডেলার দুর্দান্ত অসমাপ্ত ইনিংসের স্বীকৃতিস্বরূপ- ডন ব্র্যাডম্যান’।