অর্থনৈতিক সংস্কার ও নীতিগত উদ্যোগ বাস্তবায়নে নানা সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে নিজের কাজের মূল্যায়নে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৭০ বা ৮০–এর বেশি দিতে চান না অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, অনেক উদ্যোগ নেওয়া গেলেও সবকিছু শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে জনগণের স্বার্থে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়াই কাজ শুরু করতে পারা—এটিকেই তিনি বড় সাফল্য মনে করেন।
আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি বাস্তববাদী মানুষ। নিজেকে ১০০ নম্বর কেন দেব? আমাদের অনেক ইচ্ছা ছিল, অনেক কাজ শুরু করেছি, কিন্তু সব শেষ করতে পারিনি। তাই ৭০ বা ৮০–এর বেশি দিতে রাজি নই।’
তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সময়ে অর্থনীতি সামাল দেওয়া সহজ ছিল না। কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের কারণে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সময় লেগেছে।
এনবিআর ও কর সংস্কারে অসম্পূর্ণতা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যকর করতে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হলেও নীতিগত সংস্কার পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি। নীতিনির্ধারণী বিভাগগুলো যদি আরও আগে থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ শুরু করতে পারত, তাহলে ফল আরও ভালো হতো।
তবে কর নীতিমালার একটি দিকনির্দেশনামূলক প্রতিবেদন রেখে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি, যা ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য সহায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও ব্যাংক খাতের চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, কেবল আইনে গভর্নরের মর্যাদা বাড়ালেই প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না; কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা ও দায়িত্বশীলতাও জরুরি। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, চার বছর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বড় কোনো সরকারি হস্তক্ষেপের মুখে পড়েননি।
ব্যাংক খাতকে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, খেলাপি ঋণ, আস্থাহীনতা ও সীমিত ঋণপ্রবাহ অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে আমানত কিছুটা বেড়েছে, পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি বড় বাধা
অর্থ উপদেষ্টার মতে, অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থান। ব্যবসা ও শিল্প সচল না হলে কর্মসংস্থান বাড়বে না, আর কর্মসংস্থান না বাড়লে মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বাড়বে না।
তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা, যার সঙ্গে সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় জড়িত।
পুঁজিবাজার ও বন্ড বাজার উন্নয়নের প্রয়োজন
পুঁজিবাজারের দুর্বলতার কথা স্বীকার করে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আদালতকেন্দ্রিক জটিলতা ও দীর্ঘদিনের সমস্যার কারণে সংস্কারকাজ ধীরগতির হয়েছে। তবে ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শেয়ারবাজার ও বন্ড বাজারের উন্নয়ন অপরিহার্য।
তিনি বলেন, বিশ্বের সব দেশেই বেসরকারি খাতের জন্য শেয়ার ও বন্ড বাজার গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ব্যাংকের ওপর নির্ভর করে টেকসই শিল্পায়ন সম্ভব নয়।
অর্থ পাচার: তথ্য আছে, প্রক্রিয়া জটিল
অর্থ পাচার প্রসঙ্গে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, কোন দেশে কারা অর্থ পাচার করেছে—এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট অঙ্ক বলা কঠিন।
বিদেশ থেকে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘ভিত তৈরি হয়েছে। পরবর্তী সরকার আন্তরিক হলে এই তথ্য কাজে লাগাতে পারবে।’
ভবিষ্যৎ সরকারের প্রতি আহ্বান
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, নতুন করে সব আবিষ্কার করার দরকার নেই। ইতোমধ্যে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। ভালো দিকগুলো ধরে রাখা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোই সবচেয়ে জরুরি।
নিজের জবাবদিহিতা প্রসঙ্গে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, সম্পদের হিসাব অনেক আগেই জমা দিয়েছেন। ভবিষ্যতে কোনো আইনি জটিলতার আশঙ্কা দেখছেন না।
গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সমালোচনা অবশ্যই করবেন, তবে পুরো চিত্রটি দেখতে হবে। ১৭–১৮ মাসে কিছুই করা হয়নি—এমন বলা ঠিক নয়। অনেক কাজ শুরু হয়েছে, যার ফল সামনে দেখা যাবে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

