চীনের হুনান প্রদেশের ছাংশায় একটি অত্যাধুনিক ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (বিসিআই) প্রযুক্তিনির্ভর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এক অন্ধ নারী আংশিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছেন। এই সাফল্য রেটিনার ক্ষয়জনিত রোগে আক্রান্ত রোগীদের দেখাচ্ছে নতুন আশা।
৬১ বছর বয়সী ছেন নামের ওই নারী ৪০ বছর বয়সে রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা রোগে আক্রান্ত হন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগটি তার দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ কেড়ে নেয়। ২৩ এপ্রিল তিনি একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য নির্বাচিত হন এবং সেন্ট্রাল সাউথ ইউনিভার্সিটির সিয়াংইয়া হসপিটালে অস্ত্রোপচার করান।
অস্ত্রোপচারের সময় ৬ মিলিমিটার বাই ১০.৮ মিলিমিটার আকারের একটি ক্ষুদ্র ইলেকট্রোড অ্যারে রোগীর চোখের ভেতরে ম্যাকুলা অঞ্চলের রেটিনার উপরিভাগে স্থাপন করা হয়।
অস্ত্রোপচারের পর রোগীকে একটি বিশেষ চশমা ব্যবহার করতে হয়, যাতে ক্ষুদ্রাকৃতির ক্যামেরা ও রেডিও সিগনাল পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
আশপাশের দৃশ্য ধারণ করে ক্যামেরা। এরপর একটি ভিডিও প্রসেসর সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে সংকেতে রূপান্তর করে। এরপর বেতার প্রযুক্তির মাধ্যমে সংকেতগুলো চোখে স্থাপিত ইমপ্লান্টে পাঠানো হয়। ইমপ্লান্ট সেই তথ্যকে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনায় রূপান্তর করে রেটিনার স্নায়ুকোষে পাঠায়, যা শেষ পর্যন্ত মস্তিষ্কে পৌঁছে দৃশ্য দেখার অনুভূতি তৈরি করে।
অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক ও এ প্রকল্পের প্রধান গবেষক সু হুইচুও বলেন, ‘চোখকে যদি একটি ক্যামেরা ধরা হয়, তবে রেটিনা হলো তার ফিল্ম। যখন সেই ফিল্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন আমরা বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে সুস্থ স্নায়ুকোষগুলোকে জানিয়ে দিই কী দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ আমরা দৃষ্টিব্যবস্থার জন্য একটি বিকল্প পথ তৈরি করছি।’
এ সিস্টেম চালু হওয়ার পর রোগীরা প্রথমে অন্ধকার পটভূমিতে উজ্জ্বল আলোর বিন্দু দেখতে পান, যাকে ‘ফসফিন’ বলা হয়। নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা এসব আলোর বিন্দুকে একত্রিত করে বস্তুর আকার, প্রতিবন্ধকতা, দিক-নির্দেশক চিহ্ন এবং সাধারণ অক্ষর শনাক্ত করতে শেখেন।
গবেষকরা জানান, এই প্রযুক্তি এখনো স্বাভাবিক মানুষের মতো রঙিন ও স্পষ্ট দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে পারে না। এটি মূলত আলো-ছায়াভিত্তিক একটি নিম্ন-রেজল্যুশনের কৃত্রিম দৃষ্টিব্যবস্থা।
হুইচুও আরও বলেন, ‘যারা বহু বছর ধরে অন্ধ, তাদের জন্য এমন সামান্য দৃশ্যগত তথ্যও জীবনযাপনে বড় উপকার করতে পারে।’
বর্তমানে চেনের দৃষ্টিশক্তির মাত্রা ০.১-এ উন্নীত হয়েছে। পরীক্ষার সময় তিনি নির্দিষ্ট দিকের ডোরাকাটা নকশা শনাক্ত করতে সক্ষম হন এবং ঘরের ভেতরে নির্দেশনা অনুসরণ করে হাঁটার কাজও সফলভাবে সম্পন্ন করেন।
রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসার মতো রেটিনার অবক্ষয়জনিত রোগ বিশ্বজুড়ে অপরিবর্তনীয় অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ। রোগের শেষ পর্যায়ে সাধারণ ওষুধ, অস্ত্রোপচার বা জিন থেরাপি প্রায়ই কার্যকর হয় না। নতুন এই প্রযুক্তি ক্ষতিগ্রস্ত আলোকগ্রাহী কোষকে পাশ কাটিয়ে একটি কৃত্রিম দৃষ্টিপথ তৈরি করে।
চীনের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি আইএমআইই ইন্টেলিজেন্ট রেটিনা সিস্টেমে বর্তমানে ২৫৬টি স্টিমুলেশন চ্যানেল রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত ৬০-চ্যানেলের সমজাতীয় প্রযুক্তির তুলনায় চার গুণেরও বেশি তথ্য ধারণক্ষমতা দেয়। এক্ষেত্রে কৃত্রিম দৃষ্টিকে যদি একটি ইলেকট্রনিক পর্দার সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে স্টিমুলেশন চ্যানেলের সংখ্যা হলো পিক্সেলের সমান।
চীনের গবেষক দল ইতোমধ্যে ৫১২-চ্যানেলের নমনীয় ইলেকট্রোড প্রযুক্তি উন্নয়ন সম্পন্ন করেছে। ভবিষ্যতে ১,০২৪ থেকে ২,০৪৮ চ্যানেলবিশিষ্ট সংস্করণ তৈরির লক্ষ্যও রয়েছে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

