চলতি বছরের ১০ জুন। সন্ধ্যায় শানসি প্রদেশের ছিনইয়ুয়ান কাউন্টির পাহাড়ি পথে অবসর ভ্রমণে বেরিয়ে প্রকৃতিপ্রেমী লি ফেংফেই হঠাৎই মুখোমুখি হন প্রকৃতির অন্যতম দুর্লভ প্রাণীর, যাকে উত্তর চীনা চিতাবাঘ নামে ডাকা হয়।
তার সঙ্গে বিরল বন্য বিড়ালজাতীয় প্রাণীটির দূরত্ব ছিল মাত্র কয়েক মিটার। তবু মুহূর্তটি যেন সময়কে থামিয়ে দিয়েছিল। বিস্ময় ও শ্রদ্ধায় তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। প্রথমে চিতাবাঘটির চোখে ছিল সতর্কতা ও সন্দেহ। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর সেটি বুঝতে পারে যে, কোনো হুমকি নেই। ধীরে ধীরে তার আচরণ স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং কিছুক্ষণ পর সে আবার জঙ্গলের গভীরে মিলিয়ে যায়।
শানসির সবুজ বনাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে বিলুপ্তপ্রায় এই প্রাণীটির এমন আরও বহু উপস্থিতির তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, উত্তর চীনা চিতাবাঘের সংখ্যা এবং তাদের বিচরণক্ষেত্র— দুটিই এ প্রদেশে বাড়ছে।
উত্তর চীনা চিতাবাঘ বা প্যান্থেরা পারডাস জেপোনেনসিস চীনের নিজস্ব এক উপ-প্রজাতি। এটি দেশটির প্রথম শ্রেণির রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাপ্রাপ্ত বন্যপ্রাণী। একসময় পরিবেশগত অবক্ষয় এবং মানুষের অনুপ্রবেশের কারণে এদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল এবং প্রজাতিটি বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।
তবে জাতীয় বন ও তৃণভূমি প্রশাসনের ফেলাইন গবেষণা কেন্দ্রের সাম্প্রতিক গবেষণায় আশাব্যঞ্জক চিত্র উঠে এসেছে। বর্তমানে শুধু শানসি প্রদেশেই এ প্রজাতি প্রায় ৬৮০টি চিতাবাঘ রয়েছে, যা দেশের সব প্রাদেশিক অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনজুড়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগের ফলেই চিতাবাঘের উপস্থিতি বেড়েছে। ২০২০ সাল থেকে শানসি ‘উত্তর চীনা চিতাবাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চিতাবাঘের প্রাকৃতিক আবাসস্থলের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে এবং তাদের বেঁচে থাকা ও বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
চীনে বন্য বিড়ালজাতীয় প্রাণীর বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সংরক্ষণে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ‘চায়না ফেলাইন কনজারভেশন অ্যালায়েন্স’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং সংরক্ষণকর্মী সোং তাচাও বলেন, ‘বন্য পরিবেশে চিতাবাঘের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণই হলো এসব সংরক্ষণ প্রচেষ্টা।‘
সোং তাচাওয়ের তোলা একটি বিখ্যাত ছবিতে দেখা যায়, একটি মা চিতাবাঘ তার শাবকদের নিয়ে একটি বায়ুচালিত টারবাইনের নিচ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
প্রকৃতি ও প্রযুক্তির সহাবস্থানের প্রতীক হয়ে ওঠা এই ছবিটি কোনো আকস্মিক সৌভাগ্যের ফল নয়। এটি দীর্ঘ পরিকল্পনা, কৌশলগতভাবে বসানো ইনফ্রারেড ক্যামেরা এবং তার দলের নিরলস ধৈর্যের ফল। তার দল গত ১৮ বছর ধরে হ্যুশুন কাউন্টির স্থানীয় জনগণের সঙ্গে থেকে কাজ করছে।
তিনি জানান, তার সংস্থার সংরক্ষণ কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হ্যুশুন কাউন্টি। সেখানে চিতাবাঘের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। প্রতিবছর ১০ থেকে ২০টি শাবকের জন্ম হচ্ছে, যা একটি শক্তিশালী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ চিতাবাঘের জনসংখ্যার ইঙ্গিত বহন করে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

