"আমি সাম্রাজ্য নূরজাহানের হাতে তুলে দিয়েছি, আমার আর কিছু চাওয়ার নেই, শুধু এক পেয়ালা মদ এবং মাংস আধ পেয়ালা"। মুঘল সাম্রাজ্যের চতুর্থ সম্রাট নূরউদ্দীন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর সম্পর্কে মির্জা মুহাম্মদ হাদি তার বই 'তুজক-ই-জাহাঙ্গিরি'-এর ভূমিকায় এই কথাগুলো লিখেছিলেন।
কিন্তু জাহাঙ্গীর নিজে তার দৈনন্দিন ঘটনাবলির ভিত্তিতে যে বই লিখেছিলেন, যেটিকে তিনি 'জাহাঙ্গীরনামা' নামে অভিহিত করেছিলেন, সেখানেও মদ ও অন্যান্য মাদক সেবনের ঘটনাগুলো আড়াল করেননি।
বরং শাসন, বিচার, শিল্পকলা এবং প্রকৃতি সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি মাদস সেবনের বিষয়গুলোও উল্লেখ করেছেন।
বেনি প্রসাদ তার 'হিস্ট্রি অফ জাহাঙ্গির' বইয়ে লিখেছেন, ১৫৬৯ সালের ৩১শে অগাস্ট জন্ম নেওয়া শিশুটি ছিল "প্রার্থনা, মানত এবং তীর্থযাত্রার পর জন্ম নেওয়া, তার যুগের সবচেয়ে ধনী ও গৌরবময় রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্র, এবং মনোরম রাজকীয় নগরী ফতেহপুর সিকরির প্রিয় রাজপুত্র।"
জাহাঙ্গীরের জীবনপথ যেন তার পূর্বপুরুষদের তুলনায় ফুলে সাজানো ছিল।
"কিন্তু এই আরামের কারণেই জাহাঙ্গীর সারা জীবন ইচ্ছাশক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুর্বলতায় ভুগেছেন। তিনি নিজের চেয়ে অধিক প্রতিভাবান বা অধিক ধূর্ত মানুষের সামনে নিজেকে অসহায়ভাবে ছেড়ে দিতেন। ব্যক্তিত্বের এই দুর্বলতাগুলো আরও গভীর হয়েছিল কৈশোরের দোরগোড়ায় গড়ে ওঠা একটি অভ্যাসের কারণে– মদ্যপান।"
বেনি প্রসাদের মতে, মদ্যপান ছিল মুঘল রাজবংশের দীর্ঘদিনের একটি দুর্বলতা।
নিজের আত্মজীবনীতে বাবর এমনসব আসরের জীবন্ত বর্ণনা দিয়েছেন, যেখানে দুঃখ ও উদ্বেগ মদের নেশায় ডুবে যেত। হুমায়ুন মদ ও আফিম সেবনের মাধ্যমে নিজের শারীরিক শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিলেন। তার পুত্র মুহাম্মদ হাকিমও মদ্যপানের কাছে আত্মসমর্পণ করেন এবং মাত্র ৩১ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে যান।
আকবর সামগ্রিকভাবে এ ধারার একটি ব্যতিক্রম ছিলেন, যদিও তরুণ বয়সে তার মদ্যপান অস্বাভাবিক ছিল না এবং তিনি কখনও কখনও মাত্রা ছাড়িয়েও যেতেন। তার দুই কনিষ্ঠ পুত্র মুরাদ ও দানিয়ালও শেষ পর্যন্ত মদ্যপানের কারণে করুণ মৃত্যুবরণ করেন।
১৭তম জন্মদিনের আগে পর্যন্ত জাহাঙ্গীর কখনও মদের স্বাদ নেননি, শিশুদের কিছু ওষুধে থাকা সামান্য অ্যালকোহল ছাড়া।
১৬০৫ থেকে ১৬২৭ সাল পর্যন্ত ভারত শাসনকারী জাহাঙ্গীর তার শাসনকালের অর্ধেকেরও বেশি সময় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে কাটিয়েছিলেন।
আংশিকা জৈন তার 'এম্পেরর জাহাঙ্গীর: দ্য ন্যাচারালিস্ট' বইয়ে লিখেছেন, ছোটবেলা থেকেই জাহাঙ্গীর অসাধারণ তীক্ষ্ণতায় চারপাশের পৃথিবী পর্যবেক্ষণ করতেন এবং ভারত ও বিদেশ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া পশুপাখি পর্যবেক্ষণ ও চিত্রায়ণ করতেন।
তার মতে, জাহাঙ্গীর মার্কহোর ও বারবারি ছাগলের সংকর প্রজননও করিয়েছিলেন এবং এদের বংশধরদের চলাফেরা ও আচরণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন।
প্রাণিজগতের প্রতি জাহাঙ্গীরের আগ্রহ জীবনের শেষদিকে খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রেও এক অস্বাভাবিক সতর্কতায় রূপ নিয়েছিল।
"তিনি শিকার করা প্রাণীগুলো তার সামনে পরিষ্কার করার নির্দেশ দিতেন এবং নিজেই তাদের পাকস্থলী পরীক্ষা করতেন, তারা কী খেয়েছে তা দেখার জন্য। যদি কোনো প্রাণীর পাকস্থলীতে তার বিবেচনায় ঘৃণ্য কিছু পাওয়া যেত, তবে তিনি সেই প্রজাতিকে নিজের খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিতেন।"
আংশিকা জৈনের মতে, জাহাঙ্গীরের ব্যক্তিত্ব ছিল বৈপরীত্যে ভরা। একদিকে তিনি ছিলেন ভোগবিলাসে নিমগ্ন রাজা, অন্যদিকে অসাধারণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টির একজন পর্যবেক্ষক।
ইতিহাসবিদ হেনরি বেভারিজ এমনও লিখেছেন যে, জাহাঙ্গীর "আরও ভালো এবং আরও সুখী" মানুষ হতে পারতেন, যদি তিনি মহান মুঘল সাম্রাজ্যের পরিবর্তে কোনো প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরের প্রধান হতেন।
লিসা বালাবান-লিলার তার গবেষণাপত্র 'দ্য এম্পেরর জাহাঙ্গীর অ্যান্ড দ্য পারস্যুট অব প্লেজার'-এ লিখেছেন, তিনি খুব কম ক্ষেত্রেই নিজে সেনাবাহিনী পরিচালনা করেছেন; বরং প্রায়ই তার ছেলেদের নেতৃত্ব অনুসরণ করতেন, অথবা ব্যক্তিগত আনন্দের খোঁজে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতেন।
"তাদের ঘোরাঘুরি, শিকারের প্রতি আসক্তি, প্রকাশ্য মাদকসেবন এবং প্রায় অবিরাম ভ্রমণ সত্ত্বেও, রাজকীয় কর্মচারী ও অভিজাতদের কাছে তারা কমবেশি গ্রহণযোগ্য ছিলেন।"
নিজের আত্মজীবনী 'তুজক-ই-জাহাঙ্গিরি'-তে সম্রাট জাহাঙ্গীর কেবল তার বিজয়, দরবার ও সাম্রাজ্যের কথাই বলেননি, নিজের দুর্বলতাগুলোকেও প্রকাশ করেছেন।
বই থেকে জানা যায়, মদের প্রতি তার আসক্তির গল্প শুরু হয় একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
তরুণ যুবরাজ জাহাঙ্গীর তার বাবা সম্রাট আকবরের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সিন্ধু নদের তীরে অ্যাটক অঞ্চলে ছিলেন। একদিন শিকার থেকে ফিরে ক্লান্ত বোধ করলে গোলন্দাজ উস্তাদ শাহ কুলি তাকে এক পেয়ালা মদ পান করার পরামর্শ দেন।
জাহাঙ্গীর তার মদ পরিবেশনকারী মাহমুদকে হাকিম আলির বাড়ি থেকে কোনো মাদকজাতীয় পানীয় আনতে নির্দেশ দেন। এরপর একটি ছোট বোতলে প্রায় দেড় পেয়ালা মিষ্টি হলুদ রঙের মদ আনা হয়।
জাহাঙ্গীর তা পান করেন, স্বাদ পছন্দ করেন এবং তার নিজের ভাষায়, "দিন দিন এর পরিমাণ বাড়াতে থাকেন"।
এক পর্যায়ে তিনি উল্লেখ করেন যে, তিনি প্রতিদিন মদ পান করতেন, তবে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার রাতে তা থেকে বিরত থাকতেন।
বৃহস্পতিবার ছিল তার সিংহাসনে আরোহনের দিন এবং শুক্রবার ছিল পবিত্র দিন। এ দুই দিনে সংযম ছিল তার ধর্মীয় ও রাজকীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত।
আঙুরের মদের নেশা যখন আর তার জন্য যথেষ্ট ছিল না, তখন তিনি আরক বা পাতিত মদের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
নয় বছরের মধ্যে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে তিনি দিনে দুবার মিলিয়ে ২০ পেয়ালা আরক পান করতেন, যার মধ্যে দিনে ১৪ ও রাতে ছয় পেয়ালা। প্রতিটি পেয়ালায় প্রায় ৮২ গ্রাম বা প্রায় ৮৫ মিলিলিটার অ্যালকোহল থাকত।
এই মাত্রার নেশা শুধু একটি সংখ্যা ছিল না। এর শারীরিক প্রভাবের ভয়ঙ্কর চিত্রও জাহাঙ্গীর নিজেই জানিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন, তার হাত এতটাই কাঁপত যে নিজের হাতে পেয়ালা তুলে পান করতে পারতেন না এবং অন্যদের দিয়ে তাকে পানি খাওয়াতে হতো। এরপর হাকিম হাম্মাম সম্রাটকে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেন যে, এভাবে মদ্যপান চালিয়ে গেলে কয়েক মাসের মধ্যেই আর চিকিৎসা সম্ভব হবে না।
জাহাঙ্গীর লিখেছেন, এই উপদেশ তার ওপর প্রভাব ফেলেছিল, কারণ "জীবন ছিল প্রিয়"। তিনি মদ কমাতে শুরু করেন। কিন্তু একই সঙ্গে এক আসক্তি থেকে আরেক আসক্তিতে চলে যান।
এরপর এই গল্পে প্রবেশ করে আফিম।
জাহাঙ্গীর লিখেছেন, ৪৬ বছর চার মাস বয়সে তিনি তার দৈনিক আফিম গ্রহণের হিসাবও লিপিবদ্ধ করেছিলেন– দিনের পাঁচ ঘণ্টা পর পর আট রতি (এক গ্রাম) এবং রাতের এক ঘণ্টা পর আরও ছয় রতি (পাঁচ গ্রাম)। অর্থাৎ আফিম সেবনেরও তিনি নিয়মিত দৈনিক হিসাব রাখতেন।
তিনি লিখেছেন, ১৮ বছর বয়স থেকে তিনি মদ পান করে আসছেন। কখনও ২০ গ্লাস পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন, পরে পরিমাণ কমিয়েছেন এবং ৩০ বছর পর কেবল রাতে পান করা শুরু করেন।
শেষ পর্যন্ত তিনি একই যুক্তি পুনরাবৃত্তি করেন– এখন মদ কেবল হজমের জন্য।
তার শাসনের ১৩তম বছরে গুজরাটের আবহাওয়া তার অনুকূলে ছিল না এবং স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। চিকিৎসকেরা তাকে মদ ও আফিম দুটোই কমানোর পরামর্শ দেন।
জাহাঙ্গীরের মতে, তিনি একই দিন দুটির ব্যবহার কমিয়ে দেন এবং প্রথম দিনেই স্বাস্থ্যের "উল্লেখযোগ্য উন্নতি" অনুভব করেন।
কিন্তু অভ্যাস তো সব সময় যুক্তি মানে না।
একই অসুস্থতার সময় তীব্র মাথাব্যথা ও জ্বরে ভোগার পরও তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই আবার তার পরিচিত পেয়ালাগুলোর কাছে ফিরে যান।
পরবর্তী বছরগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
জাহাঙ্গীর লিখেছেন, এক গুরুতর অসুস্থতার সময় মদ তাকে সাময়িক স্বস্তি দেওয়ায় তিনি দিনে পান করা শুরু করেন, যদিও আগে তার এমন অভ্যাস ছিল না।
এরপর তিনি স্বীকার করেন যে ধীরে ধীরে পরিমাণ সীমা অতিক্রম করে যায়। গরম আবহাওয়া এর ক্ষতিকর প্রভাব আরও বাড়িয়ে দেয় এবং দুর্বলতার পাশাপাশি তার শ্বাসকষ্টও শুরু হয়।
\
জাহাঙ্গীর লিখেছেন, নূরজাহান বেগম ধীরে ধীরে তার মদ্যপান কমিয়ে দেন, অনুপযুক্ত খাবার ও পানীয় গ্রহণে বাধা দেন এবং তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
নূরজাহানের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে চিকিৎসকদের চেয়েও বেশি কার্যকর বলে বর্ণনা করেছেন জাহাঙ্গীর তার, কারণ তার মতে এতে ভালোবাসা ও মমতা ছিল।
'তুজক-ই-জাহাঙ্গিরি'-এর এই বিবরণ নূরজাহানকে শুধু একজন প্রভাবশালী রানি নয়, অসুস্থ স্বামীর যত্ন নেওয়া এবং তার মদ্যপান সীমিত করতে সচেষ্ট একজন ব্যক্তি হিসেবেও তুলে ধরে।
কিন্তু মুনিলাল তার 'জাহাঙ্গির' বইয়ে লিখেছেন, জাহাঙ্গীরের অসহায়ত্ব প্রায় করুণ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। নূরজাহানের প্রতি মোহ তার অবশিষ্ট সামান্য বিচারবোধ ও ইচ্ছাশক্তিও কেড়ে নিয়েছিল।
দীর্ঘ অসুস্থতা, মদাসক্তি এবং তীব্র শারীরিক কামনা ছিল সেই প্রধান কারণগুলো, যা জাহাঙ্গীরকে নূরজাহানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল করে তুলেছিল। কখনও কখনও তীব্র মানসিক চাপে তিনি অস্থির হয়ে উঠতেন।
তবে এনসাইক্লোপিডিয়া ইরানিকা-য় লিসা বালবান-লার লিখেছেন, যদিও কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেন সম্রাট জাহাঙ্গীর সাম্রাজ্যের ক্ষমতা তার স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তবুও শাসনের শেষ পাঁচ বছর তিনি রাজ্যের রাজনৈতিক বিষয়ে গভীর আগ্রহ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ বজায় রেখেছিলেন।
নূরজাহান প্রকৃতপক্ষে ছিলেন এমন এক রাজার সহশাসক, যিনি ক্ষমতাকে অবহেলা করেননি; বরং তিনি সরকারের দায়িত্বের একটি অংশ তার বিশ্বস্ত ও প্রতিভাবান সহযোগীর হাতে অর্পণ করেছিলেন।
তুজকের প্রসঙ্গে লিসা লিখেছেন, জাহাঙ্গীর খেলাধুলা ও শিকারের প্রতি অত্যন্ত অনুরাগী ছিলেন এবং নূরজাহান প্রায়ই এসব অভিযানে তার সঙ্গী হতেন।
"এমনই এক অভিযানে তিনি মাত্র ছয়টি গুলিতে চারটি সিংহ হত্যা করেছিলেন"। স্ত্রীর এই অসাধারণ দক্ষতায় গর্বিত হয়ে জাহাঙ্গীর তার মাথায় এক হাজার আশরফি ঢেলে দেন এবং এক জোড়া মুক্তা ও এক লক্ষ রুপি মূল্যের একটি হীরাও উপহার দেন।
"কিন্তু শাসনের এই তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ মধ্যপর্বেও, যখন কোনো রাজপুত্রের বিদ্রোহ রাজার শান্তি নষ্ট করেনি, তখনও জাহাঙ্গীর মদ ও মাদকের ওপর তার গভীর নির্ভরতা থেকে মুক্ত হতে পারেননি। এমনকি তার দরবারে এমন একজন কর্মকর্তাও ছিলেন, যার একমাত্র দায়িত্ব বলেই মনে হয় রাজকীয় মাদকদ্রব্যের দেখভাল ও সংরক্ষণ করা।"
সম্ভবত এই আত্মজীবনীর সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য প্রকাশ পায় তখন, যখন সম্রাট হওয়ার পর জাহাঙ্গীর তার প্রজাদের জন্য মদ ও অন্যান্য মাদক উৎপাদন ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেন, কিন্তু একই ফরমানেই নিজের মদ্যপানের কথাও স্বীকার করেন।
এই আত্মজীবনীতে জাহাঙ্গীর অন্যদের মদ ও আফিম সেবনের পরিণতিও লিপিবদ্ধ করেছেন।
তিনি ইনায়াত খানের বিষয়ে লিখেছেন যে তিনি আফিমে আসক্ত ছিলেন এবং মদও পান করতেন, এমন পর্যায়ে যে মদ তার শারীরিক অবস্থাকে আরও খারাপ করে তুলেছিল।
অন্যদের সম্পর্কে লিখতে গিয়ে জাহাঙ্গীর নেশার ধ্বংসাত্মক প্রভাব দেখতে পেয়েছেন, কিন্তু নিজের মদ্যপানকে প্রায়ই সংযম, ওষুধ বা হজমের প্রয়োজনীয়তার ভাষায় বর্ণনা করেছেন।
সম্ভবত এই বৈপরীত্যের একটি উদাহরণ তার পুত্র খুররমের ঘটনা, যিনি পরে সম্রাট শাহজাহান হন।
জাহাঙ্গীর লিখেছেন, ২৪ বছর বয়স পর্যন্ত খুররম মদ থেকে বিরত ছিলেন। একবার জাহাঙ্গীর তাকে মদ খাওয়ার প্রস্তাব করেন এবং সংযমী হওয়ার উপদেশ দেন।
তিনি ইবনে সিনার একটি উক্তিও উদ্ধৃত করেন যে, অল্প মদ ওষুধ, কিন্তু অতিরিক্ত হলে তা সাপের বিষে পরিণত হয়।
সম্রাট নিয়মিতভাবে দরবারে পানাহারের আসরের আয়োজন করতেন। জাহাঙ্গীরের ভাষায়, এসব আসরে তার সভাসদরা "আনুগত্যের মদে মাতোয়ারা" হয়ে উঠতেন।
নওরোজ উপলক্ষে সম্রাট ফরমান জারি করেছিলেন যে, রাজকীয় উৎসব উদযাপনকারীরা তাদের ইচ্ছামতো যে কোনো "মাদক বা নেশাজাতীয় পদার্থ" ব্যবহার করতে পারবেন এবং কোনও "নিষেধাজ্ঞা বা বাধা" নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।
রাম চন্দ্র প্রসাদ তার 'আর্লি ইংলিশ ট্রাভেলার্স ইন ইন্ডিয়া' বইয়ে লিখেছেন, ১৬১৬ সালে জাহাঙ্গীর মাতাল অবস্থায় তার কিছু সভাসদকে ডেকে তার সঙ্গে মদ পান করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
পরদিন কেউ ভুলবশত বা ইচ্ছাকৃতভাবে আগের রাতের ঘটনাটি উল্লেখ করেন। সম্রাট তার আদেশের কথা মনে করতে পারেননি। তখন তিনি জিজ্ঞেস করেন, সভাসদদের মদ পান করার অনুমতি কে দিয়েছিল।
জাহাঙ্গীরের কাছে নেশা কেবল মদ ও আফিমে সীমাবদ্ধ ছিল না।
কাশ্মীর সফরের সময় তিনি স্থানীয় একটি মাদক জাতীয় পানীয়েরও উল্লেখ করেছেন, যেটি গাঁজা মিশ্রিত ছিল বলে তার বিশ্বাস। তিনি এর নেশা ও শারীরিক প্রভাবের কথা লিখেছেন এবং বলেছেন, প্রয়োজন হলে মদ না থাকলে এটি বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
নারসিংহ পি. সিলের মতে, বিলাসিতায় নিমগ্ন শাসক হিসেবে বিবেচিত হলেও জাহাঙ্গীর বিচার প্রদানের একটি নিয়মিত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল 'ন্যায়ের শৃঙ্খল', যা প্রতীকীভাবে নির্দেশ করত যে প্রজাদের অভিযোগ ও আবেদন সরাসরি সম্রাটের কাছে পৌঁছাতে পারে।
জাহাঙ্গীরের শাসনামলেই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।
এভাবে জাহাঙ্গীরের উত্তরাধিকার শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং জটিল পারিবারিক সম্পর্কের সমন্বয়কে প্রতিফলিত করে, যা মুঘল ইতিহাসের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তার ব্যক্তিত্বের বহু পরস্পরবিরোধী দিককে তুলে ধরে।
লিসা লিখেছেন, জীবনের শেষ বছরগুলোতে দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত মদ ও মাদক সেবনে জাহাঙ্গীরের দেহ এমন দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে, আরেক পুত্রের বিদ্রোহ দমনের একটি সফল কিন্তু ক্লান্তিকর অভিযানের পর তিনি প্রায় অক্ষম হয়ে পড়েন। তিনি হাঁটতে পারতেন না, আফিমও নিতে পারতেন না, কেবল অল্প অল্প করে মদ পান করতেন।
তবুও তিনি ভ্রমণ ছাড়েননি।
১৬২৭ সালের উষ্ণ গ্রীষ্মে জাহাঙ্গীর শান্তি ও বিশ্রামের আশায় তার প্রিয় কাশ্মীরের উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর কয়েক দিনের মধ্যেই জাহাঙ্গীর নিজে এবং তার সঙ্গে থাকা কনিষ্ঠ পুত্র শাহজাদা শাহরিয়ার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এরপর তিনি লাহোরে ফেরার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু পথেই ১৬২৭ সালের ২৮শে অক্টোবর চিঙ্গারসিরিতে তার মৃত্যু হয়। তখন তার বয়স ছিল ৫৮ বছর এবং তিনি ২১ বছরের কিছু বেশি সময় ধরে সিংহাসনে ছিলেন।
অসুস্থতা ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনীর লেখা তার শাসনের ১৭তম বছরের পর থেমে যায়। পরবর্তী অংশ দরবারি ইতিহাসবিদ, বিশেষ করে মুতামিদ খান ও মুহাম্মদ হাদি সম্পন্ন করেন।
লিসার মতে, জাহাঙ্গীরের পরবর্তী মুঘল সম্রাটরাও তাদের পূর্বসূরিদের মতো ভ্রমণনির্ভর ও সক্রিয় জীবনধারা বজায় রেখেছিলেন, যতদিন তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি তা অনুমোদন করেছিল। এই প্রবণতা আরও প্রায় ১০০ বছর অব্যাহত ছিল।
তবে জাহাঙ্গীরের আগে বা পরে এমন কোনো মুঘল সম্রাটের নজির খুব কমই পাওয়া যায়, যিনি আনন্দের অনুসন্ধানে অবিরাম ভ্রমণকে এত ধারাবাহিকভাবে নিজের জীবনের অংশ করে তুলেছিলেন।
একইসঙ্গে জাহাঙ্গীর প্রকাশ্যেই তার মদ্যপানের অভ্যাস এবং তা কাটিয়ে ওঠার সংগ্রামের কথা স্বীকার করেছিলেন। জাহাঙ্গীরের নিজের বর্ণনা অনুযায়ী, তার সভাকবি তালিব আমলি এই অবস্থাকে একটি কবিতায় এভাবে বর্ণনা করেছিলেন–
"আমার দুটি ঠোঁট, একটি মদের অনুরাগী,
আর অন্যটি মাতাল হওয়ার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।"
সূত্র: বিবিসি বাংলা
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

