সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢুকলেই চোখে পড়ে নিখুঁত চেহারা, সাজসজ্জা ও সৌন্দর্যের নানা ছবি। কারো ত্বক আরো উজ্জ্বল, কারো সাজ আরো আকর্ষণীয়।
এসব ছবি দেখতে দেখতে অনেকের মনে তৈরি হতে পারে নিজের চেহারা নিয়ে অস্বস্তি। মনে হতে পারে, ‘আমাকেও আরো সুন্দর হতে হবে।’
ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে জানায়, সৌন্দর্য নিয়ে এই অতিরিক্ত চিন্তা ধীরে ধীরে দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা একে ‘বিউটি অ্যাংজাইটি’ বা সৌন্দর্য-সংক্রান্ত উদ্বেগ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
এতে একজন মানুষ নিজের চেহারা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তিত হয়ে পড়তে পারেন এবং বারবার নিজের মধ্যে কোনো ‘খুঁত’ খুঁজতে শুরু করতে পারেন।
সৌন্দর্যের ধারণা কিভাবে বদলে গেল?
একসময় ত্বকের যত্ন বলতে ছিল সাধারণ ফেসওয়াশ, ময়েশ্চারাইজার বা প্রয়োজনমতো কিছু প্রসাধনী ব্যবহার। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিউটি ইন্ডাস্ট্রির বিকাশের সঙ্গে সৌন্দর্যচর্চার ধরনও বদলে গেছে।
ত্বকের যত্ন এখন অনেকের দৈনন্দিন রুটিনের বড় অংশ।
নানা ধরনের স্কিনকেয়ার পণ্য, প্রসাধনী, বিউটি ট্রেন্ড ও সৌন্দর্যচর্চার পরামর্শ নিয়মিত সামনে আসছে।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন নিজের যত্ন নেওয়ার বিষয়টি ধীরে ধীরে ‘নিখুঁত’ দেখানোর চাপে পরিণত হয়। নতুন কোনো ট্রেন্ড এলেই মনে হতে পারে, নিজের চেহারায় আরো কিছু পরিবর্তন করা দরকার।
সোশ্যাল মিডিয়া কেন বড় ভূমিকা রাখে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌন্দর্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ফিল্টার, এডিট করা ছবি এবং বাছাই করা জীবনযাপনের দৃশ্য অনেক সময় বাস্তবতার একটি অসম্পূর্ণ ছবি তুলে ধরে।
একজন মানুষ নিয়মিত এমন ছবি দেখতে থাকলে সেটিকেই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক সৌন্দর্যের মানদণ্ড মনে করতে পারেন। তখন নিজের স্বাভাবিক চেহারার সঙ্গে অন্যের ছবি তুলনা করার প্রবণতা বাড়ে।
এর ফলে নিজের চেহারা নিয়ে অসন্তুষ্টি তৈরি হতে পারে। ছোটখাটো বিষয় নিয়েও অতিরিক্ত চিন্তা শুরু হতে পারে। এমনকি আত্মবিশ্বাসেও প্রভাব পড়তে পারে।
কখন বুঝবেন বিষয়টি দুশ্চিন্তার পর্যায়ে যাচ্ছে?
নিজের যত্ন নেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু চেহারা নিয়ে চিন্তা যদি দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
যেমন—
বারবার অন্যের চেহারার সঙ্গে নিজের চেহারা তুলনা করা
সামান্য বিষয় নিয়েও নিজের চেহারা নিয়ে খারাপ লাগা
আয়না, ছবি বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের চেহারা বারবার পরীক্ষা করা
সাজসজ্জা বা সৌন্দর্যচর্চায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি সময় দেওয়া
চেহারা নিয়ে অস্বস্তির কারণে সামাজিক অনুষ্ঠান বা মানুষের সঙ্গে মেলামেশা এড়িয়ে চলা
নিজের চেহারা নিয়ে বারবার অন্যের কাছ থেকে আশ্বস্ত হওয়ার চেষ্টা করা
চেহারা নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণে আত্মবিশ্বাস বা মেজাজে পরিবর্তন আসা
এসব বিষয় নিয়মিত ঘটলে নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
যত্ন আর আত্ম-পর্যবেক্ষণের মধ্যে পার্থক্য
ত্বকের যত্ন নেওয়া, পরিচ্ছন্ন থাকা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বা নিজের পছন্দ অনুযায়ী সাজগোজ করা স্বাভাবিক ও ইতিবাচক অভ্যাস। কিন্তু এসব অভ্যাস যদি শুধু নিজের চেহারার ‘ত্রুটি’ খুঁজে বের করার কাজে পরিণত হয়, তাহলে তা মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিজের চেহারার পাশাপাশি শরীর কী করতে পারে, সেটির দিকেও মনোযোগ দেওয়া উচিত। সুস্থ থাকা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া, নিয়মিত খাবার খাওয়া এবং নিজের পছন্দের কাজের জন্য সময় রাখা সামগ্রিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা না করাই ভালো
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা প্রতিটি ছবি বাস্তব জীবনের সম্পূর্ণ প্রতিচ্ছবি নয়। আলো, ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল, ফিল্টার ও সম্পাদনার কারণে একটি ছবিকে বাস্তবের চেয়ে অনেক আলাদা দেখাতে পারে।
তাই অনলাইনে দেখা চেহারাকে নিজের জন্য সৌন্দর্যের মানদণ্ড বানানো ঠিক নয়। বরং এমন কনটেন্ট অনুসরণ করা যেতে পারে, যেখানে বাস্তবসম্মত ও বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যের ধারণা তুলে ধরা হয়।
নিজের প্রতি অতিরিক্ত কঠোর না হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। চেহারার প্রতিটি বিষয় পরিবর্তন বা ‘ঠিক’ করার প্রয়োজন নেই।
কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন?
চেহারা নিয়ে দুশ্চিন্তা যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে এবং তা পড়াশোনা, কাজ, পরিবার, বন্ধুত্ব বা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিজের চেহারা নিয়ে উদ্বেগ কমাতে এবং আত্মমূল্যায়নের একটি স্বাস্থ্যকর দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সৌন্দর্যচর্চার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নিজের যত্ন নেওয়া, নিজেকে নিয়ে সারাক্ষণ বিচার করা নয়। ‘আরো সুন্দর হতে হবে’ এই ভাবনার বদলে ‘নিজের যত্ন নেব, নিজের মতো থাকব’—এই দৃষ্টিভঙ্গিই হতে পারে বেশি স্বস্তিদায়ক।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

