রমজান মাসের রাতসমূহের মধ্যে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময় রাত হলো শবেকদর বা কদরের রাত। এ রাত রমজান মাসের সৌন্দর্য ও মর্যাদা আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বরকতময় এ রাতের স্রোতধারায় প্লাবিত হয়েছে পবিত্র মাহে রমজান। কোরআনুল কারিমে এ রাতকে বলা হয়েছে- লাইলাতুল কদর।
এ রাতেই অবতীর্ণ হয়েছে মহাগ্রন্থ আল-কোরআন। আল্লাহ্ বলেন- ‘নিঃসন্দেহে কদরের রাতে আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি।’ (সুরা কদর, আয়াত: ১)
শবে-কদর কোন রাত
হাদিসে শবেকদরকে রমজানের শেষ দশকের রাতসমূহে অণ্বেষণ করতে বলা হয়েছে। যেমন- আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করতেন আর বলতেন, তোমরা লায়লাতুল-কদরকে রমজানের শেষ দশকে অণ্বেষণ করো।
(বুখারি, হাদিস: ১৯১৬; মুসলিম, হাদিস: ২৮৩৩) অন্য হাদিসে রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতসমূহে অণ্বেষণ করতে বলা হয়েছে। আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা লায়লাতুল কদরকে রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতসমূহে অণ্বেষণ করো। (বুখারি, হাদিস: ১৯১৩) বোঝা যায়, শেষ দশদিনের যে কোনো রাতেই লায়লাতুল-কদর হতে পারে। তবে এর মধ্যে বেজোড় রাতগুলোর প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
যেহেতু এগুলোর মধ্যে লায়লাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। অবশ্য ২৭ রমজানের রাতের প্রতি কোনো কোনো হাদিসে ভিন্নভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে এসে আরজ করল যে, হে আল্লাহর রাসুল! আমি একজন বৃদ্ধ রুগ্ণ ব্যক্তি। রাতে নামাজে দাঁড়াতে আমার অসহনীয় কষ্ট হয়। তাই আপনি এমন একটি রাতের কথা বলে দিন, যে রাতে আমি লায়লাতুল-কদর পেতে পারি।
তখন তিনি বলেন, তুমি সাতাশের রাতের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দাও। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২১৪৯)
শবেকদরের মর্যাদা
শবেকদরের মর্যাদা অনুধাবনের জন্য এটাই যথেষ্ট যে, আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কোরআনে সুরা কদর নামে একটি স্বতন্ত্র সুরা অবতীর্ণ করেছেন। সুরায় এ রাতের চারটি বৈশিষ্ট্য ও ফজিলতের বর্ণনা এসেছে। আল্লাহ্ বলেন, ‘নিঃসন্দেহে কদরের রাতে আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি। আর আপনি কি জানেন- কদরের রাত কী? কদরের রাত হলো হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এ রাতে ফেরেশতা ও রুহুল কুদুস (জিবরাইল আ.) তাদের পালন কর্তার আদেশক্রমে প্রত্যেক মঙ্গলময় বস্তু নিয়ে (পৃথিবীতে) অবতরণ করে। (এ রাতের) আগাগোড়া শান্তি যা ফজর হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।’ (সুরা কদর, আয়াত ১-৫)
শবেকদরের আমল ও বিশেষ দোয়া
রমজানের শেষ দশক আসার সাথে সাথেই রাসুলুল্লাহ (সা.) সপরিবারে রাত জাগরণ করে ইবাদত-বন্দেগি করতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রমজানের শেষ দশ দিন আসার সাথে সাথেই রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে রাত জাগরণ শুরু করতেন এবং পরিবারবর্গকে জাগাতেন। ইবাদতের মধ্যে অত্যন্ত পরিশ্রম করতেন এবং দৃঢ় করে লুঙ্গি বেঁধে নিতেন। অর্থাৎ কোমর বেঁধে ইবাদতে আত্মনিয়োগ করতেন। (বুখারি, হাদিস : ১৯২০; মুসলিম, হাদিস : ২৮৪৪)
কদরের রাতের ইবাদত-বন্দেগি বান্দাকে গোনাহমুক্ত করে হাজার রাতের ইবাদতের নেকি অর্জন করার সৌভাগ্য দান করে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে কদরের রাতে ঈমানের সাথে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে কিয়ামুল লাইল (রাত জেগে ইবাদত) করবে, তার পেছনের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (বুখারি, হাদিস : ৩৫; মুসলিম, হাদিস: ১৮১৮)
কিয়ামুল লাইল হলো- রাত জেগে ইবাদত করা। অর্থাৎ একান্ত মনে নফল নামাজ, মনযোগের সাথে বিশুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াত, অশ্রুবিজড়িত অবস্থায় আল্লাহর কাছে তাওবা, ইস্তিগফার ও ক্ষমা প্রার্থনা ইত্যাদির মাধ্যমে রাতকে জাগ্রত রাখা। শবেকদরে পাঠের জন্য এক বিশেষ দোয়া কথা হাদিসে এসেছে।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি লায়লাতুল-কদর জানতে পারলে তাতে কী প্রার্থনা করব? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তুমি বলবে- ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা ‘আফুউউন, তুহিব্বুল ‘আফওয়া, ফা’ফু আন্নি।’ অর্থাৎ হে আল্লাহ্! নিশ্চয় তুমি ক্ষমাশীল দয়ালু। ক্ষমা করাকে ভালোবাসো। কাজেই আমাকে ক্ষমা করো। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫১৩; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৮৫০)
বিশেষ দোয়ার বিশেষত্ব
‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা ‘আফুউউন, তুহিব্বুল ‘আফওয়া, ফা’ফু আন্নি।’ দোয়াটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার কারণ হলো- আরবি ভাষায় মাগফিরাহ এবং ‘আফওয়া দুটি শব্দের অর্থই ক্ষমা। কিন্তু ‘আফওয়’ শব্দটি মাগফিরাহ শব্দের চেয়ে অধিক মর্যাদাসম্পন্ন ক্ষমা অর্থে ব্যবহার হয়। আরবি ভাষায় মুছে ফেলা অর্থে ‘আফওয়া’ শব্দটি ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন- আপনি চক দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছেন। এমন সময় আপনার লেখার মধ্যে কিছু ভুল শব্দ লিখে ফেলেছেন, তখন কী করবেন? নিশ্চয়ই ডাস্টার দিয়ে ভুল লেখাগুলো মুছে ফেলবেন? এই মুছে ফেলা অর্থে ‘আফওয়া’ শব্দটি ব্যবহার হয়। অর্থাৎ ‘আফওয়া’ হলো- এমন ক্ষমা, আল্লাহ্ আমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেওয়ার পর তা পুরোপুরি মুছে ফেলবেন।
এমনকি বিচার দিনেও আমাদের সেই গুনাহগুলো সম্পর্ক জিজ্ঞেস করবেন না। আল্লাহ্ তাঁর বান্দা এবং ফেরেশতাদের এই গুনাহগুলোর কথা ভুলিয়ে দেবেন। যেন বিচার দিনে এই গুনাহগুলোর জন্য আমাদের অপমানিত হতে না হয়। যখন মানুষ তার পাপকর্মের জন্য মন থেকে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চায়, তখন আল্লাহ্ তা‘য়ালা অত্যন্ত খুশি হয়ে এই ধরনের ক্ষমা করেন। পক্ষান্তরে মাগফিরাহ অর্থও ক্ষমা। অর্থাৎ আল্লাহ্ তায়ালা ক্ষমা করে দিয়েছেন কিন্তু গুনাহগুলো তারপরও লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে। বিচারের দিন এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে। বিচার দিনের আগে গুনাহগুলো মুছে ফেলা হবে না। এই দোয়ায় এই ‘আফওয়া’ শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

