প্রকৃতির এক ভয়ংকর তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে আমেরিকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ধেয়ে আসা শক্তিশালী ‘বোম্ব সাইক্লোন’ এবং তার সাথে যুক্ত হওয়া ঐতিহাসিক তুষারঝড়ে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে নিউ ইয়র্ক, বোস্টন, ফিলাডেলফিয়া এবং ওয়াশিংটন ডিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ম্যারিল্যান্ড থেকে ম্যাসাচুসেটস পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে ব্লিজার্ড ওয়ার্নিং জারি করা হয়েছে। প্রাণঘাতী এই পরিস্থিতিতে ৪ কোটিরও বেশি মানুষ বর্তমানে গৃহবন্দী অবস্থায় রয়েছেন।
পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করায় নিউ ইয়র্ক সিটি এবং নিউ জার্সিতে জরুরি যাতায়াত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানী রোববার রাত ৯টা থেকে সোমবার দুপুর পর্যন্ত সিটির সব রাস্তায় জরুরি সেবা ছাড়া অন্য সব সাধারণ যানবাহনের চলাচল নিষিদ্ধ করেছেন। মেয়র একে ২০১৯ সালের পর প্রথম ‘ওল্ড স্কুল স্নো ডে’ হিসেবে অভিহিত করে সোমবার স্কুলগুলোতে ইন-পারসন এবং ভার্চুয়াল উভয় ধরনের ক্লাসই বন্ধ ঘোষণা করেছেন। নিউ ইয়র্ক ছাড়াও নিউ জার্সি, ডেলওয়্যার, রোড আইল্যান্ড, কানেকটিকাট এবং ম্যাসাচুসেটসের গভর্নররা নিজ নিজ রাজ্যে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন।
আবহাওয়াবিদ ফ্রাঙ্ক পেরেইরা জানিয়েছেন, ঝড়টি ইতিমধ্যে ‘বোম্ব সাইক্লোন’-এর রূপ নিয়েছে। ঝড়ের কেন্দ্রে বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ২৪ ঘণ্টায় ২৪ মিলিবারের বেশি কমে যাওয়ায় এটি এক বিধ্বংসী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস জানিয়েছে, অনেক এলাকায় ১ থেকে ২ ফুট পর্যন্ত তুষার জমতে পারে। ঝড়ের তীব্রতা এতটাই যে কোনো কোনো স্থানে প্রতি ঘণ্টায় ২ ইঞ্চি পর্যন্ত তুষারপাত হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ‘থান্ডার-স্নো’ বা বজ্রসহ তুষারপাত, যা এই ধরনের চরম শক্তিশালী ঝড়ের ক্ষেত্রেই কেবল দেখা যায়।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটঅ্যাওয়্যার’-এর তথ্য মতে, রোববার বিকেল পর্যন্ত ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে এবং হাজার হাজার ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত এই সংখ্যা ১৫ হাজারে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জেএফকে, লা-গার্ডিয়া এবং বোস্টন লোগান বিমানবন্দরের কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি থমকে গেছে। প্রবল বাতাসের ঝাপটায় এবং ভারী তুষারের চাপে শত শত গাছ উপড়ে গিয়ে বিদ্যুৎ লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নিউ জার্সিতে ইতিমধ্যে ২০ হাজারের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন। উপকূলীয় এলাকায় ২ থেকে ৪ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের কারণে বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
তীব্র শীত এবং ঝড়ের হাত থেকে গৃহহীনদের বাঁচাতে নিউ ইয়র্ক সিটির আউটরিচ কর্মীরা রাতভর কাজ করছেন। তাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র এবং ওয়ার্মিং সেন্টারে নিয়ে আসা হচ্ছে। আবহাওয়া দপ্তরের মতে, দৃশ্যমানতা এক মাইলের চার ভাগের এক ভাগ বা তারও কম হওয়ায় রাস্তায় বের হওয়া এখন সরাসরি জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার শামিল। ডোরড্যাশ-এর মতো অনলাইন ডেলিভারি সেবাগুলোও তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। বোস্টন-প্রভিডেন্স করিডোর সংলগ্ন এলাকায় একে ‘ঐতিহাসিক এবং ধ্বংসাত্মক ঝড়’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সি এবং বোস্টন এলাকায় বসবাসরত কয়েক লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে চরম সংকটের মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে যারা ট্যাক্সি, উবার বা ডেলিভারি পেশার সাথে যুক্ত, তারা কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বাংলাদেশি কমিউনিটি নেতারা প্রবাসীদের ঘরে শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত রাখার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। বৈরী আবহাওয়ার কারণে বহু মসজিদে তারাবীর নামাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

