গত বছর ইয়েমেনের হুথিদের লক্ষ্য করে চালানো তিন মার্কিন সামরিক হামলায় ১৫৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এসব হামলায় অন্তত ২৪৩ জন আহত হয়েছেন। পেন্টাগনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার এক মার্কিন কর্মকর্তা এই পর্যালোচনার বরাত দিয়ে পরিসংখ্যানটি প্রকাশ করেছেন। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে মার্কিন সামরিক বাহিনীর রেকর্ড করা সমস্ত বেসামরিক মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা এপ্রিলে ইয়েমেনে চালানো তিনটি হামলা থেকেই ঘটেছে।
বেসামরিক হতাহতের বিষয়ে পেন্টাগনের বার্ষিক প্রতিবেদনের অংশ হিসেবে এই ডিক্লাসিফায়েড (প্রকাশযোগ্য) মূল্যায়নটি মার্কিন কংগ্রেসে পাঠানো হয়েছিল। এনবিসি নিউজ এর আগে এটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এটি হাতে পেয়েছে।
পেন্টাগনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছেন, ‘প্রতিবেদনটি প্রকাশ্যে আলোচনা করার অনুমতি তাদের নেই, তবে আগামী মাসগুলোতে প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে এটি জমা দেবে।’
এই পরিসংখ্যানটি ২০২৪ সালের তুলনায় অনেক বেশি হতাহতের তথ্য দেয়। সে বছর মার্কিন সামরিক অভিযানে দুইজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন এবং আহত হন আরও দুইজন।
এ বছরের তিনটি হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল বিদ্রোহীনিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানা এবং এর আশেপাশে থাকা হুথি বাহিনী, সেই সাথে রাস ইসা জ্বালানি বন্দর।
রাস ইসায় হামলাটি ছিল সবচেয়ে মারাত্মক। ওই হামলায় ৮০ জন নিহত এবং ১৭১ জন আহত হন। ওই হামলার ফলে আকাশে বিশাল আগুনের কুণ্ডলী দেখা যায় এবং বন্দরে থাকা ট্যাঙ্কার ট্রাকগুলো জ্বলতে দেখা যায়। হুথিরা পরবর্তীতে তাদের আল-মাসিরাহ টেলিভিশন চ্যানেলে এই হামলার পরের ভিডিও প্রচার করে, যেখানে ঘটনাস্থলে মৃতদেহগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান তদারকিকারী ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সেসময় বলেছিল, হামলাটির উদ্দেশ্য ছিল হুথিদের জ্বালানি ও আয়ের একটি উৎস বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া।
২০২৫ সালের এপ্রিলের হামলার পর সেন্টকম বলেছিল, ‘এই হামলার উদ্দেশ্য ইয়েমেনের জনগণের কোনো ক্ষতি করা ছিল না।’
সংস্থাটি জানায়, ‘ইরান-সমর্থিত হুথি সন্ত্রাসীদের জ্বালানির এই উৎসটি ধ্বংস করতে এবং অবৈধ আয় থেকে তাদের বঞ্চিত করতে মার্কিন বাহিনী ব্যবস্থা নিয়েছে। ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে হুথিদের অর্থায়ন করেছে এই জ্বালানি।’
তবে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট ছবি এবং ওপেন-সোর্স রিপোর্টিংয়ের ওপর ভিত্তি করে পেন্টাগনের পর্যালোচনাটি শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে, তিনটি হামলায় বেসামরিক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ছিল।
প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, ‘ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবারকে সমবেদনা ভাতা দেওয়াটা উপযুক্ত ছিল না, যদিও কেন তা দেওয়া হয়নি তার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।’
মার্কিন আইনের অধীনে এই ধরনের অর্থপ্রদান বাধ্যতামূলক নয় এবং এটি কোনো অন্যায় স্বীকার করে নেওয়ার সমতুল্যও নয়, তবে এর আগে মার্কিন হামলায় বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর তা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালে আফগানিস্তানে একটি মার্কিন ড্রোন হামলায় সাত শিশুসহ ১০ জন নিহত হওয়ার পর, পেন্টাগন বলেছিল যে তারা নিহতদের আত্মীয়দের সমবেদনা ভাতা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আর ইয়েমেনে মার্কিন অভিযানের চূড়ান্ত হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) জমা দেওয়া বেসামরিক হতাহতের খবরের পর ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সেন্টকম আরও ১৫টি ঘটনার পর্যালোচনা করেছিল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে মার্কিন সামরিক অভিযানে বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর বিষয়টি যখন নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের সম্মুখীন হচ্ছে, ঠিক তখনই এই তথ্যগুলো সামনে এলো।
এই বছরের শুরুর দিকে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে একটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আঘাত হানে। ওই হামলায় প্রায় ১৬৮ জন নিহত হয় যাদের বেশিরভাগই শিশু। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত পেন্টাগনের একটি কার্যালয়ের আকারও ছোট করে দিয়েছেন।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

