বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আশা করেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠু হবে। সেই সঙ্গে নির্বাচনের ফলাফলে এককভাবে সরকার গঠনে সক্ষম হবে বিএনপি, এমনটাও তিনি আশা করছেন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গতকাল (মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি) রাতে জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা জানান।
সাক্ষাৎকারে বিএনপি চেয়ারম্যান নির্বাচন, ভূ-রাজনীতি, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, তরুণ ভোটারদের গুরুত্ব এবং গুম-খুনের বিচারসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।
আগামীকাল (বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশে হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা আশা করছি যে নির্বাচনটা সুষ্ঠু হবে। মানুষেরও তাই প্রত্যাশা। আমরা আশাবাদী।’
তিনি ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফিরে নির্বাচনমুখী রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়াকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি বলে মন্তব্য করেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘চ্যালেঞ্জটা হয়তো কিছুটা খুব সম্ভবত আমারই ছিল। এত বছর পরে এসেছি, আসার পরে মানুষের চোখেমুখে একটা প্রত্যাশা দেখেছি। এটা হলো রাজনৈতিক দিক, অন্যদিকে আসার পাঁচদিন পরেই আম্মা মারা গেলেন। উনি অসুস্থ ছিলেন অনেক দিন ধরে। স্বাভাবিকভাবে এটাও একটা খুব কষ্টকর বিষয় আমাদের সবার জন্য। আমরা পরিবার যে একসঙ্গে বসে নিজেদের কষ্টটা ভাগ করে নেবো, সেই সুযোগটা বা সময়টা হয়নি। কারণ আমরা একদম নির্বাচনের ডামাডোলের ভেতরে। একদিকে নির্বাচনি ডামাডোল; অন্যদিকে ব্যক্তিগত বিষয়টা, দুটোর সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, এটাই আসলে আমার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি হয়তো এই চ্যালেঞ্জটা মোটামুটিভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি আমি।’
আসন্ন নির্বাচনে তরুণ ও প্রথমবার ভোটারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘দেখুন আপনি যদি আমাদের মেনিফেস্টোটা দেখে থাকেন, যেটা আমরা কয়েক দিন আগে জাতির সামনে উপস্থাপন করেছি, সেখানে কিন্তু আমরা সমাজের তরুণদের জন্য, একইভাবে এখানে বয়স্ক যারা আছেন তাদের জন্য, একই সঙ্গে যারা দেশে চল্লিশ লাখ প্রতিবন্ধী আছেন তাদের জন্য; একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেক যে নারী, তাদের ক্ষমতায়নের জন্য আমরা পরিকল্পনা রেখেছি। কর্মসূচি রেখেছি, বিশেষ করে শুধু তরুণদের জন্য না, সকলের জন্য; কারণ দেশটা গঠন করতে হবে সকলকে নিয়ে।’
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক প্রসঙ্গে করা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমরা যদি দেখি এমন কোনো চুক্তি হচ্ছে, যেটা বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থের পরিপন্থি, বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থি, সেটা যেকোনো দেশের সঙ্গেই হোক না কেন, তাদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই দূরত্ব হবে। কারণ আমি তো প্রতিনিধিত্ব করি আমার দেশের মানুষকে। কাজেই যে কোন দুই দেশের মধ্যে যদি কোন চুক্তি হয়, যেটা আমার দেশের স্বার্থের সঙ্গে যাবে না, সেক্ষেত্রে যে কারো সঙ্গেই আমাদের এরকম দূরত্ব হতে পারে।
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীনের বাড়তি আগ্রহ নিয়ে প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে যদি আমরা চিন্তা করি আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক থাকবে, আমরা একা বসবাস করতে পারব না। গ্লোবাল ভিলেজ বলা হয় এখন পৃথিবীকে। কাজেই আমাদের দেশের মানুষ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য করবে। আমাদের দেশের মানুষ বিভিন্ন দেশে যাবে চাকরিবাকরি বিভিন্ন কারণে। কাজেই আমার দেশের স্বার্থ যেখানে বজায় থাকবে, দেশের মানুষের স্বার্থ যেখানে বজায় থাকবে, আমাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো হবে।’
জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে বিএনপি চেয়ারম্যার বলেন, ‘আমরা কনফিডেন্ট যে, ইনশা আল্লাহ বাংলাদেশের মানুষের রায় আমরা পাবো। আমরা সরকার গঠনে সক্ষম হবো এককভাবে। সেক্ষেত্রে তো কাউকে অপজিশনে থাকতে হবে। কারণ একটা ব্যালেন্সড রাষ্ট্র যদি হতে হয়, ব্যালেন্সড সরকার যদি হতে হয় তাদের সেক্ষেত্রে অপজিশনে থাকতে হবে কাউকে। সবাই সরকারে চলে আসলে কেমন করে দেশ চলবে?’
আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেখুন এটা তো পুরো রাজনীতি। আমরা রাজনীতি করি মানুষের জন্য, মানুষের সমর্থন নিয়ে। কাজেই আমি মনে করি, রাজনীতিতে মানুষ যাকে গ্রহণ করবে তাকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। আর যাকে মানুষ গ্রহণ করবে না, যত শক্তিই থাকুক না কেন, শক্তি প্রয়োগ করে সে ধরে রাখতে পারে না, ৫ আগস্ট যার উদাহরণ।’
দুর্নীতি ও ঋণখেলাপি প্রসঙ্গে করা এক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘দুর্নীতি এবং ঋণগ্রস্ত বা ব্যাংক ডিফল্ট দুটো ভিন্ন জিনিস। আমাদের দলের লক্ষ নেতাকর্মীর নামে বিগত স্বৈরাচার সরকার কেস দিয়েছিল। আমাদের দলের মধ্যে যারা আছেন, যারা আমাদের দলীয় রাজনীতির সঙ্গে আছে, যারা ব্যবসা বাণিজ্য করে তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে। তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। তাদের ব্যবসা বাণিজ্য চলতে দেয়া হয়নি। তাদের বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। তাদের ন্যায্য ব্যাংক লোন যেটা আছে সেটা তাদের দেয়া হয়নি। কাজেই এরকম একটি অবস্থার মধ্যে আমাদের লোকজন, আমাদের ব্যবসায়ীরা, আমাদের নেতাকর্মীরা যারা ব্যবসা বাণিজ্য করতেন তাদের জন্য তো এরকম ডিফল্ট হওয়াটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। দুর্নীতি এবং ডিফল্ট হয়ে যাওয়ার মধ্যে সম্পর্ক তো নেই। দুটো একদম ভিন্ন জিনিস।’
গুম, খুন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকারদের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমাদের পরিকল্পনা আছে। কারণ আমাদের নেতাকর্মীরা যেরকম গুম খুনের শিকার হয়েছে, অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল যারা আমাদের সঙ্গে আন্দোলন সংগ্রামে ছিল তারা গুম খুনের শিকার হয়েছে। হয়তো সংখ্যা কম বেশি হবে। এমনকি অনেক মানুষ আছেন যারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না। কিন্তু তারা অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছে, গুম খুনের শিকার হয়েছে। এটি একটি অন্যায় ব্যাপার। একটি সভ্য দেশে মানুষ গুম হয়ে যাবে, দেশের মানুষ খুন হয়ে যাবে কিন্তু তার কোনো বিচার হবে না এটা তো হতে পারে না। কাজেই দেশের আইন অনুযায়ী অবশ্যই প্রত্যেকটা মানুষ কারো সঙ্গে যদি অন্যায় হয়ে থাকে তার বিচার পাবার অধিকার আছে।’
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

