এআই থেকে স্টারলিংক: ড্রোন যেভাবে বদলে দিচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধ

মঙ্গলবার,

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬,

১২ ফাল্গুন ১৪৩২

মঙ্গলবার,

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬,

১২ ফাল্গুন ১৪৩২

Radio Today News

এআই থেকে স্টারলিংক: ড্রোন যেভাবে বদলে দিচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫:৫২, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

Google News
এআই থেকে স্টারলিংক: ড্রোন যেভাবে বদলে দিচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধ

ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে। বর্তমান রণক্ষেত্রে এখন ড্রোনের একচ্ছত্র আধিপত্য। আধুনিক যুদ্ধকৌশলের এই আমূল পরিবর্তন এখন সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে।

কিয়েভ থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।

চার বছর আগে ট্যাংক আর বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে রাশিয়া পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু করেছিল। বর্তমানে সেই যুদ্ধের কৌশল বদলে দেওয়া প্রযুক্তিগুলোর ওপর একটি বিশেষ প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো:

বেসামরিক কাজে ব্যবহার করা সস্তা ড্রোন থেকে শুরু করে বিস্ফোরকবাহী ছোট বিমান-সবই এখন যুদ্ধের মূল অস্ত্র। 

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে এখন ৮০ শতাংশ ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী ড্রোন।

পূর্ব ইউক্রেনে দায়িত্বরত ‘কোলেসো’ ছদ্মনামের এক পদাতিক সেনা জানান, ড্রোন ছাড়া আধুনিক যুদ্ধ এখন অসম্ভব। এখন রণক্ষেত্রের সম্মুখভাগ প্রায় ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) গভীর এক ‘কিল জোনে’ পরিণত হয়েছে।

সামরিক বিশেষজ্ঞ কাতেরিনা বন্ডার বলেন, ‘এটি দুই পক্ষের মাঝখানের এমন এক এলাকা যেখানে কোনো কিছুর টিকে থাকা কঠিন। কারণ, ড্রোনের মাধ্যমে সেখানে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে।’

ধরা পড়া এড়াতে সেনারা এখন সেখানে ছোট ছোট দলে খুব দ্রুত চলাচল করে। তাদের চোখ থাকে সবসময় আকাশের দিকে। ভারী কামান, ধীরগতির ট্যাংক বা সাঁজোয়া যানগুলো সহজেই ড্রোনের নজরে পড়ে যায়। তাই এগুলো এখন সহজ লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। বিপজ্জনক এলাকায় বাড়তি সেনা না পাঠিয়ে রসদ পাঠানো বা আহত সেনাদের সরিয়ে নিতে ইউক্রেন এখন স্থল-চালিত ড্রোন বা রোবটিক যান ব্যবহার করছে।

ড্রোন ও অপারেটরের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বজায় রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 

বন্ডার বলেন, আসল লড়াইটা এখন যোগাযোগ ব্যবস্থার দৌড়ে। শুরুতে বেশিরভাগ ড্রোন রেডিও সিগন্যালে চলত। কিন্তু ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রযুক্তির মাধ্যমে সেগুলোর সিগন্যাল বিচ্ছিন্ন করা সহজ।

এর সমাধান হিসেবে রাশিয়া এখন অতি-পাতলা ফাইবার অপটিক ক্যাবল বা তার দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ড্রোন ব্যবহার করছে। এই প্রযুক্তিতে জ্যামিং করে ড্রোন আটকানো সম্ভব নয়। এর ফলে সম্মুখভাগের শহর ও মাঠগুলো এখন জালের মতো তারে ছেয়ে গেছে। দৃশ্যটি অনেকটা ভুতুড়ে সায়েন্স ফিকশন সিনেমার মতো।

রেডিও কন্ট্রোলের বিকল্প হিসেবে ইউক্রেনীয়রা ড্রোনের সঙ্গে স্টারলিংক টার্মিনাল জুড়ে দিচ্ছে। এতে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে ড্রোন চালানো সম্ভব হচ্ছে।

ইউক্রেনের লাসার গ্রুপের কমান্ডার এবং স্টারলিংক ব্যবহারের অন্যতম পথিকৃৎ ‘ফিনিক্স’ বলেন, ‘আমাদের অনেক দূর পর্যন্ত ড্রোন উড়াতে হয়, এর জন্য স্থিতিশীল ভিডিও সিগন্যাল এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োজন।’

রুশ বাহিনীও দ্রুত এই প্রযুক্তি অনুকরণ করতে শুরু করে। তবে, গত মাসে ইউক্রেনের অনুরোধে ইলন মাস্ক রাশিয়ার অবৈধ টার্মিনালগুলো বন্ধ করে দেন।

সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপে দুই পক্ষেরই যোগাযোগে কিছুটা বিঘ্ন ঘটে।

ইন্সটিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার জানিয়েছে, এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলেই ফেব্রুয়ারির শুরুতে দক্ষিণ জাপোরিঝজিয়া অঞ্চলে ইউক্রেন দ্রুত অগ্রসর হতে পেরেছে।

ড্রোনের বিস্তার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য করেছে। কম দামী ড্রোন ধ্বংস করতে লাখ লাখ ডলারের দামী মিসাইল ছোড়া এখন অনেক ব্যয়বহুল। এর বদলে ইউক্রেন এখন সস্তা ‘ইন্টারসেপ্টর ড্রোন’ তৈরি করছে। এগুলোর কাজই হলো মাঝআকাশে শত্রু ড্রোন ধ্বংস করা।

ইন্টারসেপ্টর ড্রোন নির্মাতা মার্কো কুশনির বলেন, আমরা এখন ড্রোনের বিরুদ্ধে ড্রোন দিয়ে যুদ্ধের অধ্যায় শুরু করেছি। সম্মুখভাগের রাস্তাগুলোতে এখন ড্রোন হামলা ঠেকাতে বিশেষ জাল বসানো হয়েছে। ট্রাকগুলোতে লাগানো হয়েছে অ্যান্টি-ড্রোন খাঁচা ও জ্যামার। 

শেষ চেষ্টা হিসেবে মেশিনগান দিয়েও ড্রোন নামানোর চেষ্টা করা হয়। পশ্চিমা দেশগুলো এখন কিয়েভের এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে।

ড্রোনের কার্যক্ষমতা বাড়াতে প্রকৌশলীরা এখন এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যুক্ত করার লড়াইয়ে নেমেছেন।

যুদ্ধের ময়দানে ড্রোন যখন লক্ষ্যবস্তুর (যেমন কোনো ট্যাংক বা বাঙ্কার) খুব কাছে যায়, তখন অনেক সময় রেডিও সিগন্যাল কাজ না করা বা ইন্টারনেট না থাকার কারণে অপারেটরের সঙ্গে সেটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ইউক্রেনীয় প্রতিষ্ঠান ‘দ্য ফোর্থ ল’ (টিএফএল) জানিয়েছে, তারা এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যার ফলে ড্রোনটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ঠিক আগের মুহূর্তে অপারেটরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিজেই নিজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঠিকমতো লক্ষ্যভেদ করতে পারে।

টিএফএল-এর মাকসিম সাভানেভস্কি সতর্ক করে বলেন, রাশিয়া ও চীনও এই প্রযুক্তি তৈরি করছে। আমরা যদি পিছিয়ে থাকি, তবে হেরে যাব। তবে মানুষের সাহায্য ছাড়া ড্রোনের একাকী লড়াই করার বিষয়টি এখনও অনেক দূরের পথ।

সামরিক বিশেষজ্ঞ বন্ডার মনে করেন, এআই এখন মানুষকে সাহায্য করছে মাত্র, বিকল্প হয়ে ওঠেনি।

গুগলের সাবেক সিইও এরিক শমিট বর্তমানে ‘সুইফটবিট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান, যা ইউক্রেনীয় বাহিনীকে এআই ড্রোন সরবরাহ করে। 

তিনি বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মানুষকে পুরোপুরি সরিয়ে সব সরঞ্জাম স্বয়ংক্রিয় করে ফেলা সম্ভব হবে। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি আমার সেই ধারণাটি ছিল ভুল।’

তিনি আরও বলেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হয়তো প্রধান ভূমিকা রাখবে, কিন্তু মানুষের গুরুত্ব তার ঠিক পরেই থাকবে।’

এদিকে এক ইউক্রেনীয় সেনা ‘কোলেসো’ বলেন, পদাতিক সৈন্যদের গুরুত্ব সবসময়ই থাকবে। 

তিনি আরও বলেন, ‘যতক্ষণ না আপনি নিজের হাতে পতাকা উড়িয়ে কোনো জায়গা দখল করছেন, ততক্ষণ সেই জায়গাটিকে আপনার বলে গণ্য করা যাবে না।’

রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের