গলার সামনের দিকে, স্বরযন্ত্রের নিচে অবস্থিত থাইরয়েড গ্রন্থি। আকারে ছোট হলেও শরীরের বিপাকক্রিয়া, হৃদস্পন্দন আর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা বিশাল। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থিতেই নীরবে বাসা বাঁধতে পারে ক্যানসার। আশঙ্কার কথা হলো, ভারতে থাইরয়েড ক্যানসারের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে। সমস্যা আরও গভীর হয় তখনই, যখন প্রাথমিক লক্ষণগুলো ব্যথাহীন বা খুবই হালকা হওয়ায় আমরা সেগুলোকে গুরুত্ব দিই না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুরুতেই শনাক্ত করা গেলে থাইরয়েড ক্যানসার চিকিৎসাযোগ্য এবং বেঁচে থাকার হারও বেশ বেশি। তাই শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেয়া জরুরি। থাইরয়েড ক্যানসারের এমনই ৭টি প্রাথমিক লক্ষণ নিয়ে সতর্ক করছেন ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা।
১. ঘাড়ে ব্যথাহীন গাঁট বা ফোলা
থাইরয়েড ক্যানসারের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো ঘাড়ে একটি গাঁট বা ফোলা ভাব। অনেক সময় শেভ করার সময়, গয়না পরতে গিয়ে বা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎই চোখে পড়ে এটি। বেশিরভাগ থাইরয়েড নডিউল ক্ষতিকর না হলেও নতুন, শক্ত বা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকা গাঁট অবশ্যই চিকিৎসকের নজরে আনা উচিত।
২. কণ্ঠস্বর বদলে যাওয়া বা দীর্ঘদিন ভাঙা গলা
কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও যদি গলার স্বর স্বাভাবিক না হয়, তাহলে সেটি অবহেলার নয়। থাইরয়েডের টিউমার কখনো কখনো ভোকাল কর্ড নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুতে চাপ ফেলতে পারে, যার ফলে কণ্ঠস্বর ভেঙে যায় বা কর্কশ শোনায়।
৩. গিলতে অসুবিধা
খাবার গিলতে গিয়ে গলায় কিছু আটকে থাকার অনুভূতি এই সমস্যাটি অনেকেই অ্যাসিডিটি বা সাধারণ গলার সমস্যার ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু থাইরয়েড বড় হয়ে গেলে খাদ্যনালিতে চাপ সৃষ্টি করে এমন অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
৪. শ্বাস নিতে কষ্ট বা ঘাড়ে চাপ লাগা
থাইরয়েড টিউমার যদি শ্বাসনালির ওপর চাপ দেয়, তাহলে শুয়ে থাকলে বা গভীর শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে। এই লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি।
৫. ঘাড় বা গলায় ব্যথা, যা কানে ছড়িয়ে পড়ে
সংক্রমণ বা আঘাত ছাড়াই যদি দীর্ঘদিন ধরে ঘাড় বা গলায় ব্যথা থাকে এবং তা কানে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা প্রয়োজন। অনেক সময় এটি দাঁত বা কানের সমস্যার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়।
৬. ঘাড়ের লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া
ঘাড়ের পাশে শক্ত, ব্যথাহীন লিম্ফ নোড দীর্ঘদিন ফুলে থাকলে সেটি ক্যানসারের ইঙ্গিত হতে পারে। সাধারণ সংক্রমণ ভেবে অনেকেই এই লক্ষণকে অবহেলা করেন, যা পরে বিপদ ডেকে আনতে পারে।
৭. কারণহীন দীর্ঘস্থায়ী কাশি
অ্যালার্জি, ধূমপান বা ঠান্ডা ছাড়াই যদি দীর্ঘদিন শুকনো কাশি থাকে, সেটিও থাইরয়েড ক্যানসারের একটি অপ্রচলিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। থাইরয়েড বড় হয়ে গেলে আশপাশের অংশে জ্বালা সৃষ্টি করে এই কাশি দেখা দিতে পারে।
কেন আগেভাগে ধরা পড়া এত জরুরি
এই লক্ষণগুলোর একটি বা একাধিক থাকলেই যে ক্যানসার এমন নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে উপসর্গগুলো থাকলে পরীক্ষা করানো জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থাইরয়েড ক্যানসারের সবচেয়ে আশার দিক হলো শুরুতেই ধরা পড়লে এর চিকিৎসা বেশ সফল। সাধারণত আল্ট্রাসাউন্ড, রক্ত পরীক্ষা ও ফাইন নিডল বায়োপসির মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা হয়। প্রয়োজনে অস্ত্রোপচার, রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিন থেরাপি বা লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
থাইরয়েড ক্যানসার শুরুতে নীরব থাকলেও শরীর কিন্তু ছোট ছোট সংকেত পাঠায়। ঘাড়ের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, কণ্ঠস্বরের সমস্যা, গিলতে কষ্ট বা অকারণ কাশি এসব লক্ষণকে অবহেলা না করে সময়মতো পরীক্ষা করালেই বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব। সন্দেহ হলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

