বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার মতো সহজ একটি কাজও তখন বেশ চ্যালেঞ্জিং মনে হতে পারে। তবে গবেষণা বলছে, এই ছোট্ট ব্যায়ামটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করা গেলে তা শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষা, স্মৃতিশক্তি উন্নয়ন এবং এমনকি অকাল মৃত্যুঝুঁকি কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শৈশবকালে এক পায়ে দাঁড়ানো আমাদের কাছে স্বাভাবিক হলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে আসে। সাধারণত নয় থেকে দশ বছর বয়সের মধ্যেই মানুষ এক পায়ে দাঁড়ানোর দক্ষতা অর্জন করে। ত্রিশের শেষ দিকে এই দক্ষতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং এরপর থেকেই ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে শুরু করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫০ বছরের বেশি বয়সে কেউ যদি কয়েক সেকেন্ড এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন, তবে সেটি তার সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও বার্ধক্য মোকাবিলার সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
আমেরিকান একাডেমি অব ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশনের পুনর্বাসন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ট্র্যাসি এসপিরিটু ম্যাকাই বলেন, এক পায়ে দাঁড়াতে অসুবিধা হওয়া মানেই ভারসাম্য প্রশিক্ষণ শুরু করার উপযুক্ত সময় এসে গেছে। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের মাংসপেশি ক্ষয় বা ‘সারকোপেনিয়া’ নামক একটি স্বাভাবিক কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া শুরু হয়।
গবেষণা অনুযায়ী, ৩০ বছরের পর থেকে প্রতি দশ বছরে মানুষের মাংসপেশির ভর প্রায় আট শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। আশির কোঠায় পৌঁছানো প্রায় অর্ধেক মানুষের মধ্যেই ক্লিনিক্যাল সারকোপেনিয়া দেখা যায়। এই মাংসপেশি ক্ষয়ের সঙ্গে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের অবনতি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাসসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি জড়িত। যেহেতু সারকোপেনিয়া শরীরের বিভিন্ন মাংসপেশিতে প্রভাব ফেলে, তাই এক পায়ে দাঁড়ানোর মতো ভারসাম্য পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি সহজেই অনুমান করা সম্ভব।
মায়ো ক্লিনিকের মোশন অ্যানালাইসিস ল্যাবরেটরির পরিচালক কেন্টন কাউফম্যান জানান, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। বিশেষ করে ৫০ বা ৬০ বছরের পর এই অবনতি আরও দ্রুত হয়। তবে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে এই অবনতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
এক পায়ে দাঁড়ানোর গুরুত্ব শুধু পেশিশক্তির সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সরাসরি মস্তিষ্কের কার্যকারিতার সঙ্গেও যুক্ত। এই ভঙ্গিটি ধরে রাখতে মস্তিষ্ককে চোখ, কানের ভেস্টিবুলার ব্যবস্থা এবং স্নায়ুর সোমাটোসেন্সরি ব্যবস্থার তথ্য একসঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে গেলে ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর সুস্থতার একটি সূচক। প্রতিক্রিয়া জানানোর গতি, দৈনন্দিন কাজ করার দক্ষতা এবং ইন্দ্রিয় থেকে পাওয়া তথ্য দ্রুত সমন্বয় করার ক্ষমতার সঙ্গেও এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বয়সজনিত মস্তিষ্ক সংকোচন যদি আগেভাগে শুরু হয়, তবে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি এবং অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) জানায়, ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের আঘাতপ্রাপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ হলো অনিচ্ছাকৃতভাবে পড়ে যাওয়া, যার বড় কারণ ভারসাম্যহীনতা। গবেষকদের মতে, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার অনুশীলন এই ঝুঁকি কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে।
২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যবয়সে যারা এক পায়ে অন্তত ১০ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, তাদের পরবর্তী কয়েক বছরে যে কোনো কারণে মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রায় ২ হাজার ৭৬০ জন নারী ও পুরুষের ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় এক পায়ে দাঁড়ানোর পরীক্ষাটিকেই রোগঝুঁকি নির্ধারণে সবচেয়ে কার্যকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমার রোগীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। যারা এক পায়ে ভারসাম্য ধরে রাখতে সক্ষম, তাদের স্মৃতিভ্রম তুলনামূলক ধীর গতিতে অগ্রসর হয়। বিপরীতে, যারা পাঁচ সেকেন্ডও এক পায়ে দাঁড়াতে পারেন না, তাদের জ্ঞানীয় অবক্ষয় দ্রুত হয় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
তবে আশার কথা হলো, নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে এই সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। বিজ্ঞানীরা একে ‘সিঙ্গেল লেগ ট্রেনিং’ নামে অভিহিত করছেন। এই অনুশীলন শুধু কোমর, নিতম্ব ও পায়ের মাংসপেশি শক্তিশালী করে না, বরং মস্তিষ্কের গঠনগত উন্নয়নেও ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স সক্রিয় হওয়ায় স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়ে।
বিশেষজ্ঞরা ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের সপ্তাহে অন্তত তিন দিন এক পায়ে দাঁড়ানোর অনুশীলনের পরামর্শ দিলেও, প্রতিদিনের রুটিনে এটি যুক্ত করলে সর্বোচ্চ উপকার পাওয়া যায় বলে মত দেন তারা। দাঁত ব্রাশ করা, থালা বাসন ধোয়ার মতো দৈনন্দিন কাজের সময় এক পায়ে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকার অভ্যাস সহজেই গড়ে তোলা সম্ভব।
গবেষকদের মতে, যোগব্যায়াম ও তাই চি’র মতো শরীরচর্চা, যেখানে প্রায়শই এক পায়ে ভারসাম্য ধরে রাখতে হয়, পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সহায়ক। এমনকি নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে নব্বইয়ের কোঠায়ও ভালো ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

