কংগ্রেসের উভয়কক্ষে রিপাবলিকান পার্টি নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন ‘লেম ডাক’ প্রেসিডেন্টে পরিণত হয়েছেন। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে তিনি কি আবারও অভিশংসিত হবেন? বিদ্যমান ব্যবস্থায় তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা কতটা কঠিন?
রাজনীতিতে ‘লেম ডাক’ বলতে কোনো নেতার কর্তৃত্ব বা প্রভাব দুর্বল হয়ে যাওয়াকে বোঝায়। ট্রাম্পের এমন দশা অনেকটা ক্ষমতার শেষ অধ্যায় শুরুর মতো। সিএনএন বলছে, প্রেসিডেন্সির শেষ সময়গুলো ট্রাম্পের জন্য হতাশাজনক হয়ে উঠবে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তদন্ত শুরু করবে। এসব তদন্তে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও জড়িয়ে পড়তে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রে কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণ বা অপরাধের অভিযোগ আনার সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হলো অভিশংসন। কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ অভিযোগটি পাস করলে কর্মকর্তা অভিশংসিত হন। এরপর উচ্চকক্ষ সিনেটে বিচার হয়।
পরিষদের ওয়েবসাইটে সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের (ধারা ৪) বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সব সরকারি কর্মকর্তাকে রাষ্ট্রদ্রোহ, ঘুষ গ্রহণ কিংবা অন্য কোনো গুরুতর অপরাধ ও অসদাচরণের দায়ে অভিশংসন ও দোষী সাব্যস্ত হলে পদ থেকে অপসারণ করা হবে।’
আগের তদন্ত ও অভিশংসন
নিজের প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের দ্বারা দুইবার পরিষদে অভিশংসিত হয়েছিলেন। প্রথম ঘটনাটি ছিল ওই সময়কার মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক মাস পর- ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর। সে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।
অভিশংসন প্রস্তাবে দলটি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও কংগ্রেসের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ এনেছিল। বলা হয়েছিল, তিনি ইউক্রেনের জন্য সহায়তা আটকে রেখে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির কাছে থেকে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সুবিধা চেয়েছিলেন।
জেলেনস্কিকে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি যেন প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনের বিরুদ্ধে অনিয়মের তদন্ত শুরু করেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে নিম্নকক্ষে তোলা অভিশংসন প্রস্তাব ২৩০ ভোটে পাস হয়। কিন্তু সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল রিপাবলিকান পার্টি। ফলে প্রস্তাবটি সেখানে খারিজ হয়ে যায়।
নিজের মেয়াদের শেষ দিকে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি আবারও পরিষদে ট্রাম্পকে অভিশংসিত করে ডেমোক্র্যাটরা। ১০ জন রিপাবলিকান সদস্যও এর পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। ওই প্রস্তাবে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটলে দাঙ্গায় উসকানির অভিযোগ আনা হয়েছিল। সেবারও রিপাবলিকানরা সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকায় প্রস্তাবটি খারিজ হয়।
তৃতীয় দফায় অভিশংসন?
ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের উদ্যোগ নেবেন কি না তা একটি মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। তবে এ প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া নিয়ে তাঁর নিজেরও আশঙ্কা আছে।
নির্বাচনের আগে ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্যের এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘ডেমোক্র্যাটরা নিয়ন্ত্রণ পেলে আমাকে আবারও অভিশংসন করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় তাদের হারাতে হারাতে আমি এখন বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছি।’
ডেমোক্র্যাট নেতাদের বক্তব্যেও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নতুন তদন্ত শুরু ও সম্ভাব্য অভিশংসন প্রক্রিয়ার আওতায় আনার ইঙ্গিত আছে।
দেশটির গণমাধ্যম পিবিএস বলছে, আগামী জানুয়ারি থেকে পরিষদে তদারকি কমিটির নেতৃত্ব দিতে পারেন ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়া। সম্প্রতি তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন ও আটক নীতির ওপর তদন্তের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর অন্য অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে আছে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড, জেফরি এপস্টেইনের তদন্ত পরিচালনায় প্রশাসনের ভূমিকা এবং করপোরেট দুর্নীতির অভিযোগ।
অপরদিকে পরিষদে নিউইয়র্কের ১৪তম কংগ্রেসনাল জেলার প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজসহ কয়েকজন অভিশংসনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে অনুমোদনহীন যুদ্ধ শুরু করা এবং অভিশংসনের যোগ্য আরও কিছু অপরাধে জড়িয়েছেন।
জানুয়ারিতে পরিষদের সম্ভাব্য স্পিকার হতে যাচ্ছেন হাকেম জেফরিস। এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, অভিশংসনের বিষয়ে ডেমোক্র্যাটরা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। আবার সম্ভাবনা নাকচও করেননি।
এনবিসি তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, কিছু ডেমোক্র্যাট সদস্য তৃতীয়বারের মতো ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও রাজনৈতিকভাবে এমন পদক্ষেপ ঠিক হবে কি না, তা নিয়ে দলটির ভেতরে মতভেদ আছে।
অভিশংসনের বিষয়ে যারা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন তাদের যুক্তি হলো, পরিষদে অভিশংসন করা হলেও সিনেটে ট্রাম্পকে পদ থেকে সরানোর পক্ষে ভোট পড়ার সম্ভাবনা কম। বৃহস্পতিবার বিবিসি লিখেছে, অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর জন্য কোন অভিযোগটিকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হবে; সেটি নিয়েও ডেমোক্র্যাটদের একমত হওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তা আছে।
সিনেটে ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করা কেন কঠিন?
পরিষদে অভিশংসন প্রস্তাব পাসের পর সেটি বিচারের জন্য সিনেটে পাঠানো হয়। সেখানে দোষী সাব্যস্ত হলে অভিযুক্তকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে একটি বর্ণনা আছে মার্কিন কংগ্রেসের ওয়েবসাইটে। পরিষদের যেসব সদস্য সিনেটে অভিশংসনের পক্ষে অভিযোগ উপস্থাপন করেন, তাদেরকে ‘হাউস ম্যানেজার’ বলা হয়। তারা সিনেট অধিবেশনে অভিশংসনের অভিযোগগুলো পড়ে শোনান। এরপর বিচার পরিচালনাকারী কর্মকর্তা ও সিনেটররা নিরপেক্ষভাবে বিচার করার শপথ নেন।
সিনেটে বিচার চলাকালে হাউস ম্যানেজার ও অভিযুক্তের আইনজীবীরা সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা করে বিতর্কের সুযোগ পান। পরে অভিশংসনের প্রতিটি অভিযোগের বিপরীতে সিনেটররা ‘দোষী’ অথবা ‘নির্দোষ’ বলে ভোট দেন। কোনো অভিযোগে অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করতে উপস্থিত সিনেটরদের দুই-তৃতীয়াংশের (৬৭) সমর্থন প্রয়োজন।
মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি সিনেটে ৫৪টি আসন পেয়েছে। বিপরীতে রিপাবলিকানরা পেয়েছে ৪৪টি। দুটি আসনের ফলাফল ঘোষণা বাকি। সেগুলো ডেমোক্র্যাটরা পেলেও ৬৭টি হবে না। ফলে এককভাবে ডেমোক্র্যাট সিনেটরদের পক্ষে ট্রাম্পকে অভিশংসন করা অসম্ভব।
অপরদিকে ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করার ভোটে রিপাবলিকান সিনেটরদের সমর্থন দেওয়ার রাজনৈতিক সম্ভবনা কম। সেক্ষেত্রে পরিষদে অভিশংসিত হয়েও ট্রাম্প দায়িত্বে থাকতে পারবেন।
আগে যারা অভিশংসিত হয়েছিলেন
মার্কিন ইতিহাসে কোনো প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনা নেই। তবে পরিষদে ট্রাম্পের আগে আরও দুজন প্রেসিডেন্ট অভিশংসিত হয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ওয়েবসাইটের (ইউএসএ ডট জিওভি) তথ্য অনুযায়ী, ১৮৬৮ সালে অভিশংসিত হন অ্যান্ড্রু জনসন। গৃহযুদ্ধের পর সাবেক কনফেডারেট অঙ্গরাজ্যগুলো কীভাবে পুনর্গঠন করা হবে, তা নিয়ে জনসন ও কংগ্রেসের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। জনসনের মতে, দক্ষিণাঞ্চল পুনর্গঠনের দায়িত্ব নির্বাহী বিভাগের। এ কারণে তিনি কংগ্রেসের নেওয়া সব উদ্যোগে ভেটো দেন।
১৮৬৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ক্ষুব্ধ প্রতিনিধি পরিষদ এক প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেয়। পরে সিনেটে অনুষ্ঠিত বিচারে মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে পদ থেকে অপসারিত হওয়া থেকে রক্ষা পান জনসন।
হোয়াইট হাউসের এক ইন্টার্নের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগে ১৯৯৮ সালে বিল ক্লিনটনও পরিষদে অভিশংসিত হয়েছিলেন। কিন্তু সিনেটে তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। তখন ৫৫টি আসন নিয়ে উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ছিল রিপাবলিকান পার্টি।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

