দেশভেদে চুল ধোওয়ার পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে। রয়েছে কিছু বিশ্বাস ও মিথ। ইতালিয়ান পদ্ধতিতে চুলের গোড়া শক্ত করার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। চীনা সংস্কৃতিতে চুলের সঙ্গে সৌভাগ্যেরও একটি সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণেই চীনা নববর্ষের সময় চুল না ধোয়ার একটি প্রচলিত রীতি আছে। বিশ্বাস করা হয়, এ সময়ে চুল ধুলে সৌভাগ্যও ধুয়ে চলে যেতে পারে। আর বছরের অন্যান্য সময়ে তারা চুলের ব্যাপারে অধিক যত্নশীল।
চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে। তা হলো, ‘আমাদের শরীর, চুল থেকে শুরু করে ত্বকের প্রতিটি অংশ, আমরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে পেয়েছি। তাই এগুলোর ক্ষতি করা উচিত নয়।’ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দর্শন চীনা সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলেছে।
চুলের প্রতি এই সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কারণেই চীনা নারীরা যত্নের সঙ্গে হেয়ার কেয়ার করেন। চাইনিজ হেড স্পা যত্নের অন্যতম একটি অংশ। চীনের বিভিন্ন বিউটি স্যালনে প্রচলিত এই পদ্ধতিতে মাথার ত্বকে আকুপ্রেশার ম্যাসাজ, ভেষজ উপাদান, বাষ্প কিংবা ঝরনার মতো পানির প্রবাহ ব্যবহার করা হয়। এতে শুধু চুল পরিষ্কার হয় না। সাথে সাথে মাথার ত্বকের রক্তসঞ্চালন বাড়ে, চুল ও স্ক্যাল্প আর্দ্র থাকে এবং মানসিকভাবে আরাম মেলে। চাইলে ঘরে বসেও এ পদ্ধতিতে চুলের যত্ন নেওয়া যায়।
জেনে নিন চীনা পদ্ধতিতে চুল ধোওয়ার ৬ ধাপ
চুল শুকনো অবস্থায় আঁচড়ে নিন
চুল ধোয়ার আগে কী করছেন, সেটিও চুল ধোয়ার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। চীনা পদ্ধতিতে প্রথমে নরম ব্রাশ দিয়ে আলতো করে মাথার ত্বক আঁচড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে জমে থাকা ধুলা, মৃত কোষ, ঘাম ও বিভিন্ন হেয়ার-প্রোডাক্টের অবশিষ্টাংশ কিছুটা দূর হয়। শুকনো চুল আঁচড়ে জটও ছাড়ানো যায়। ফলে ভেজা অবস্থায় চুল আঁচড়ানোর তুলনায় চুল ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে। তবে মাথার ত্বকে অতিরিক্ত চাপ দিয়ে ব্রাশ করা যাবে না। খুব জোরে ব্রাশ করলে স্ক্যাল্পে অস্বস্তি বা ক্ষতি হতে পারে।
কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন
চুল ভেজানোর সময় খুব গরম বা ঠান্ডা পানি ব্যবহার না করে কুসুম গরম পানি বেছে নিন। খুব গরম পানি মাথার ত্বক শুষ্ক ও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। অন্যদিকে, কুসুম গরম পানি অতিরিক্ত তেল ও ময়লা পরিষ্কার করতে সাহায্য করে এবং শ্যাম্পু করার জন্য স্ক্যাল্পকে প্রস্তুত করে।
দুইবার শ্যাম্পু করুন
এই পদ্ধতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো দুইবার শ্যাম্পু করা। শ্যাম্পু মূলত চুলের গোড়া ও মাথার ত্বকে ব্যবহার করতে হবে। চুলের ডগায় অতিরিক্ত শ্যাম্পু দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রথমে চুলের গোড়ায় শ্যাম্পু লাগিয়ে আঙুলের ডগা দিয়ে বৃত্তাকারে আলতো করে ম্যাসাজ করুন। এই ম্যাসাজ শুধু পরিষ্কার করার কাজই করে না, এটি বেশ আরামদায়কও। পাশাপাশি মাথার ত্বকে রক্তসঞ্চালন বাড়াতেও সহায়তা করবে। এরপর প্রথমবারের শ্যাম্পু ভালোভাবে ধুয়ে আবার শ্যাম্পু করুন। প্রথমবারের শ্যাম্পু অতিরিক্ত তেল ও হেয়ার-প্রোডাক্টের অবশিষ্টাংশ দূর করবে। দ্বিতীয়বারের শ্যাম্পু তুলনামূলকভাবে গভীরভাবে চুল পরিষ্কার করবে।
গোড়ায় ভেষজ ট্রিটমেন্ট, ডগায় কন্ডিশনার
সাধারণত চুলের কন্ডিশনার মাঝামাঝি অংশ থেকে ডগা পর্যন্ত ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে মাথার ত্বকের জন্য তৈরি বিশেষ টনিক বা ট্রিটমেন্ট থাকলে তা চুলের গোড়ায় ব্যবহার করা যায়। চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় চুলের যত্নে আদার মতো উপাদান ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। বিভিন্ন তেল, টনিক বা কন্ডিশনিং ফর্মুলায় এসব উপাদান ব্যবহার করা হয়। এগুলো চুলের গোড়া শক্ত রাখা, চুলের বৃদ্ধিতে সহায়তা এবং চুল পড়া কমানোর মতো বিভিন্ন উপকারের জন্য জনপ্রিয়। তবে যেকোনো ভেষজ উপাদান মানেই যে চুল পড়া বন্ধ করবে বা চুল দ্রুত বাড়াবে-এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই স্ক্যাল্পে ব্যবহারের আগে পণ্যটির উপাদান ও ব্যবহারের নির্দেশনা দেখে নেওয়া জরুরি।
স্টিম বা ওয়াটারফল ট্রিটমেন্ট
চুলে লাগানো টনিক ও কন্ডিশনারকে কাজ করার সুযোগ দিতে স্টিম ট্রিটমেন্ট নেন চীনারা। চাইনিজ হেড স্পাতে অনেক সময় পানির বাষ্প বা মাথার ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে পানি প্রবাহিত করার মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এতে চুলের নমনীয়তা বাড়ে। তবে স্টিম নেওয়ার সময় অতিরিক্ত গরম করা যাবে না। মাথার ত্বকে অস্বস্তি, জ্বালা বা অতিরিক্ত গরম অনুভূত হলে সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করতে হবে।
শেষে ঠান্ডা পানির ব্যবহার
সবশেষে আরেকবার তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা পানি দিয়ে চুল ধুয়ে নিন। এতে চুলে ব্যবহৃত বিভিন্ন পণ্যের অবশিষ্টাংশ ধুয়ে যাবে। চুল হবে মসৃণ ও উজ্জ্বল।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

