সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসাজনিত অবহেলার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তার চিকিৎসায় গঠিত চিকিৎসকদলের সদস্য ডা. এফ এম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় এ ধরনের অবহেলা, লিভার ফাংশন দ্রুত অবনতি উনাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এটা ‘উইলফুল নেগলিনেন্স’ বা ইচ্ছাকৃত অবহেলা। এটা অমার্জনীয় অপরাধ। এটা উনাকে হত্যা করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ কি না তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে নাগরিক শোকসভায় তিনি এ কথা বলেন।
এফ এম সিদ্দিকী বলেন, খালেদা জিয়ার ডায়াবেটিস ও আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেডিক্যাল বোর্ডের কাছে আছে। এই বিষয়ে আইনগতভাবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে খালেদা জিয়ার চিকিৎসাজনিত অবহেলার তিনটি বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। ১. সরকার কর্তৃক গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য কারা ছিলেন এবং কোন দক্ষতার ভিত্তিতে তারা ম্যাডামের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায় তাদের ওপর বর্তায় কি না। ২. ভর্তিকালীন সময় কোন কোন চিকিৎসক উনার চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং চিকিৎসায় অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায় কি না। ৩. মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা চলাকালে ম্যাডাম আইনজীবীর মাধ্যমে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন, তখন কি কারণে সেটি হয়নি বা কারা বাধা দিয়েছিল।’
এই চিকিৎসক আরও বলেন, উল্লেখ করা দরকার, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ম্যাডামের চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিএসএমএমইউ’র সমস্ত ডকুমেন্ট আইনগতভাবে জব্দ করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে ম্যাডামের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা করি। আমরা জানি, জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড।’
ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ‘বিগত ২৭.৪.২০২১ তারিখ কোভিড-১৯-সংক্রান্ত জটিলতানিয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হবার পর আমরা, বর্তমান মেডিকেল বোর্ড, উনার (বেগম খালেদা জিয়া) চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করি। আমাদের তত্ত্বাবধানে ভর্তির সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আমরা অত্যন্ত বিস্ময় ও উদ্বেগের সাথে দেখতে পাই যে, ম্যাডাম লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত এবং মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসার ছাড়পত্রে উনাকে মেথোরেক্সেট নামের একটি ট্যাবলেট আর্থাইটিসের জন্য নিয়মিত খাবার নির্দেশ দেওয়া আছে এবং উনাকে ভর্তি থাকা অবস্থায় খাওয়ানো হয়েছে। আমরা তাৎক্ষণিক এই ওষুধটি খাওয়ানো বন্ধ করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ম্যাডাম রিউমাটয়েড আর্থাইটিস রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং রিউমাটলজিস্টদের পরামর্শে এই ওষুধটি উনি খাচ্ছিলেন। এর পাশাপাশি উনার এমএএফএলডি ফ্যাটি লিভার ডিজিজ ছিল। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ম্যাডামের লিভারের অসুখ নির্ণয় করা খুবই সহজ একটি কাজ ছিল, এজন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। মেথোট্রেক্সেট খাওয়ালে নিয়মিত রক্তে লিভার ফাংশনের কয়েকটা উপাদান পরীক্ষা করে দেখতে হয় এবং অস্বাভাবিক হলে ওষুধ বন্ধ করে ন্যূনতম পেটের একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম করে লিভারের অবস্থা দেখতে হয়।’
এ চিকিৎসক বলেন, ‘অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, ম্যাডামের লিভার ফাংশন টেস্ট খারাপ দেখার পরও সরকার নির্ধারিত চিকিৎসকরা একটা আল্ট্রাসনোগ্রাম পর্যন্ত করেননি এবং এমটিএক্সও বন্ধ করেননি। তৎকালীন চিকিৎসকদের ওপর আস্থার অভাবে ম্যাডাম ওখানে আলট্রাসনোগ্রাফী করতে রাজি হননি, কিন্তু অবস্থার গুরুত্ব বিবেচনা করে ওনার আস্থাভাজন চিকিৎসক দিয়ে বেড সাইডে পয়েন্ট অব কেয়ার আল্ট্রাসাউন্ড (পিওসিইউএস) সহজেই করা যেতো। নিদেনপক্ষে এমটিএক্স বন্ধ করে দেওয়া ছিল অবশ্য কর্তব্য।’
খালেদা জিয়ার চিকিৎসক দলের প্রধান বলেন, ‘অনেকেই প্রশ্ন করেন ম্যাডামকে কী স্লো-পয়োজন করা হয়েছে? আমার উত্তর হচ্ছে-মেথোট্রেক্সেট ওয়াজ দ্য ড্রাগ দ্যাট অ্যাক্সিলারেটেড হার ফ্যাটি লিভার। ইন দ্যাট কনটেক্সট ইট অ্যাক্টেড লাইক স্লো পয়জন অব হার লিভার (মেথোট্রেক্সেট ছিল সেই ওষুধ যা তার ফ্যাটি লিভার রোগকে লিভারের সিরোসিসে ত্বরান্বিত করে। সেই প্রেক্ষাপটে এটি তার লিভারের জন্য ধীর বিষের মতো কাজ করেছিল।’
ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ‘আজ দেশের লক্ষ-কোটি মানুষের বুকের ভেতর একটা আফসোস-সারাজীবন গণতন্ত্রের জন্য, মানুষের ভোটাধিকারের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করা মানুষটি যদি আর কিছুদিন বেঁচে থাকতেন! যদি দেখতে পেতেন মানুষ নির্ভয়ে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছে!’
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

