গাইবান্ধায় উঁচু একটি রামমূর্তি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় আসা হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসকে অর্থপাচার মামলায় গ্রেফতার করেছে বাংলাদেশের পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ঢাকার একটি থানায় দায়ের হওয়া অর্থপাচারের মামলায় রোববার রাতে তাকে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
সোমবার দুপুরে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করে মি. তরনীদাসের বিরুদ্ধে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে চার দিনের রিমান্ড দেয় আদালত।
এর আগে, মি. তরনীদাসের নামে ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা করে সিআইডি। সেখানে তার বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার এবং সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
"হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস নামের এই ব্যক্তির একাধিক ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্টের তথ্য অনুসন্ধান করে আমরা প্রায় নয় কোটি ৩৫ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছি, যা তার আয়ের সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে হুন্ডিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচারের প্রমাণও পাওয়া গেছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন সিআইডি'র উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা।
অভিযোগের বিষয়ে মি. তরনীদাস বা তার পরিবারের কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে তাকে নির্দোষ দাবি করেছেন তার আইনজীবী শ্যামল কুমার রায়।
"পুলিশ হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং আইনে একটা মামলা দিয়েছে। কিন্তু আমরা মানিলন্ডারিং আইনের সংজ্ঞার সাথে মামলার এজাহারের কোনো মিল পায়নি," শুনানি শেষে সাংবাদিকদের বলেন মি. রায়।
যদিও মি. তরনীদাস এর আগে ২০২২ সালেও একবার গ্রেফতার হন। তৎকালীর প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল কর্মকর্তার ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে বদলি বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি ও প্রতারণার মাধ্যমে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তখন তাকে গ্রেফতার করেছিল র্যাপিড অ্যাকশান ব্যাটেলিয়ন (র্যাব)।
প্রতারণাকালে মি. তরনীদাস 'তাওহীদ ইসলাম' নাম ধারণ করে নিজেকে মুসলমান হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতেন বলেও জানান র্যাবের কর্মকর্তারা।
ভারতে গমন
হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসের গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে।
বিভিন্ন সময় স্থানীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মি. তরনীদাস জানিয়েছেন, তারা ছয় ভাই-বোন। বাবা গোপীনাথ তরনীদাস ছিলেন ডালি-কুলোর কারিগর। ফলে ছোটবেলা বেশ অভাব-অনাটনের মধ্যে কেটেছে বলে জানান তিনি।
পুলিশের ভাষ্যমতে, মি. তরনীদাস ২০০৬ সালে পলাশবাড়ীর স্থানীয় একটি মাধ্যমিক স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকার একটি কলেজ থেকে ২০০৮ সালে এইচএসসি শেষ করে ভারতে চলে যান।
"২০১০ সালে অবৈধভাবে ভারতে গরম করে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে দেশে ফেরেন মর্মে জানা যায়," তাকে গ্রেফতারের পর এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে সিআইডি।
যদিও তিনি ভারতে গিয়ে ঠিক কী ধরনের 'শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ' গ্রহণ করেছিলেন, সিআইডি'র বিবৃতিতে সেটি পরিষ্কার করে বলা হয়নি।
তবে মি. তরনীদাসকে গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে, ভারতে অবস্থানকালে তিনি কারিগরি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন।
"আমরা শুনছি যে, হরিদাস ভারতে এসি, টিভি- এগুলোর মেকানিকের কাজ করতো," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন রামচন্দ্রপুর গ্রামের একজন বাসিন্দা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বাসিন্দা আরও জানান যে, বেশ কয়েক বছর আগে দেশে ফিরে এসে মি. তরনীদাস এসি মেকানিকের কাজ শুরু করেন।
"দেশে ফিরে হরিদাস ঢাকার উত্তরায় একটা জায়গায় এসি'র কাজ করতো। এর মধ্যে একদিন শুনি যে, তাকে নাকি র্যাবে ধরছে," বলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বাসিন্দা।
প্রতারণা মামলায় গ্রেফতার
২০২২ সালের নভেম্বর মাসে মি. তরনীদাস সহ দু'জনকে গ্রেফতার করেছিল র্যাব। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তৎকালীর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রটোকল কর্মকর্তার ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে বদলি বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি ও প্রতারণার মাধ্যমে কোটি টাকা আত্মসাৎ।
মি. তরনীদাস ওই প্রতারণা চক্রের 'মূল হোতা' বলে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার তৎকালীন পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
সেখানে তার ভারতে বেশ কয়েক বছর অবস্থান করার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। তবে র্যাব দাবি করেছিল যে, তিনি অবৈধ উপায়ে ভারতে গিয়েছিলেন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়।
"ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় অবৈধ উপায়ে ভারতে যান তিনি। সেখানে এক আত্মীয়ের বাসায় ছিলেন। আত্মীয়ের মাধ্যমে সেখানকার পঞ্চায়েতপ্রধানের কাছ থেকে কৌশলে এতিম সার্টিফিকেট গ্রহণ করেন। এরপর স্থানীয় একটি স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন," বলেছিলেন মি. মঈন।
র্যাবের ভাষ্যমতে, ইলেকট্রনিকস বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে ঢাকার উত্তরায় কাজ শুরু করেন মি. তরনীদাস।
সেখানে পুরাতন এসি কিনে মেরামত করে সেটি বিক্রি করতেন বলে জানানো হয়।
পরে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ঢাকার বনানী এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানান কর্মকর্তারা।
মুসলিম পরিচয় ঘিরে প্রশ্ন
গ্রেপ্তারের পর করা সংবাদ সম্মলনে র্যাব জানিয়েছিল, ২০১৮ সালে উত্তরায় এসির মেরামতের দোকানে কাজ করার সময় এক সবজি বিক্রেতার সঙ্গে বাসা ভাড়া করে থাকতেন মি. তরনীদাস।
সেসময় ওই সবজি বিক্রেতার মেয়েকে বিয়ে করার জন্য একপর্যায়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন বলেও দাবি করা হয়।
"সবজি বিক্রেতার মেয়েকে বিয়ে করার জন্য ২০১৯ সালে তিনি ধর্মান্তরিত হন। তখন হরিদাস চন্দ্র তার নাম বদলে রাখেন তাওহীদ ইসলাম," জানিয়েছিল র্যাব।
গত ১২ই জুলাই দ্বিতীয় দফায় গ্রেফতার হওয়ার পর সিআইডি'র পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়েছে যে, হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস ২০১৯ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নাম পরিবর্তন করেন।
তবে মি. তরনীদাসের গ্রামের বাসিন্দারা অবশ্য ভিন্ন কথা বলছেন।
"আমরাও এই কথাটা শুনছিলাম। এটা নিয়ে হরিদাসকে প্রশ্নও করছি। কিন্তু সে অস্বীকার করছে," বলেন তার গ্রামের একজন বাসিন্দা।
ফের আলোচনায়
সম্প্রতি মি. তরনীদাস নতুন করে আলোচনায় আসেন গাইবান্ধায় বিশাল আকারের একটি রামমূর্তি নির্মাণকে ঘিরে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা বলছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসের পুনরায় রামচন্দ্রপুর গ্রামে ফিরে যান।
এরপর সেখানে দুই একর জায়গাজুড়ে থাকা প্রাচীন একটি মন্দির সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ শুরু করেন। সেখানে বড় একটি শিবমূর্তি এবং কৃষ্ণমূর্তি নির্মাণ করেন তিনি।
২০২৫ সালের ২৬শে অক্টোবর প্রায় ৫১ ফুট উচ্চতার ওই কৃষ্ণমূর্তিটি উদ্বোধন করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমার।
এরপর প্রায় ৮১ ফুট উচ্চতার একটি রামমূর্তি নির্মাণের কাজ শুরু করেন মি. তরনীদাস। এটি 'এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাম বিগ্রহ' হতে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
পরে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ইমাম ওলামা পরিষদ আন্দোলন শুরু করলে প্রকল্প স্থগিত করে মন্দির কমিটি।
মন্দির সংস্কার ও আধুনিকায়নের গত দেড় বছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে বলে একাধিক সাক্ষাৎকারে জানান মি. তরনীদাস।
বিপুল পরিমাণ এই অর্থের উৎস কী, সেটি নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্নও উঠতে দেখা গেছে।
জবাবে মি. তরনীদাস দাবি করেন যে, পুরো অর্থটাই তিনি 'ভক্তদের অনুদান' থেকে পেয়েছেন।
সিআইডির পক্ষ থেকে যে মামলা হয়েছে, সেটির এজাহারে বলা হয়েছে, হরিদাস এবং তার অজ্ঞাতনামা আরও দুই থেকে তিন সহযোগী ২০২০ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০শে জুন পর্যন্ত একটি সংঘবদ্ধ হুন্ডি চক্র পরিচালনা করতেন। তারা দেশি-বিদেশি মুদ্রার অবৈধ লেনদেন ও স্থানান্তরের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে সিআইডি হরিদাসের নামে থাকা পাঁচটি ব্যাংক হিসাব এবং চারটি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে বিভিন্ন সময়ে 'সন্দেহজনক উৎস' থেকে প্রায় নয় কোটি ৩৫ লাখ টাকা জমার তথ্য পেয়েছে।
পরে সিআইডি'র দেওয়া বিবৃতি এটাও দাবি করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে একাধিক ব্যক্তি হরিদাসের ব্যাংক ও মোবাইল অ্যাকাউন্টে মোটা অঙ্কের অর্থ জমা দিয়েছেন।
"তার বৈধ কোন আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও তার বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস হিসাবে নয় দশমিক ৩৫ কোটি টাকা জমা হয়েছে এবং তিনি প্রায় সমপরিমাণ টাকা উত্তোলন করেছেন, যা সন্দেহজনক," সিআইডির ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

