রোববার,

২২ মে ২০২২,

৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

রোববার,

২২ মে ২০২২,

৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

Radio Today News

লঙ্কায় রাবন বধ ও বঙ্গীয় লুটেরাদের ভবিষ্যত 

মেসবাহ শিমুল, সাংবাদিক 

প্রকাশিত: ১৫:৫১, ১৩ মে ২০২২

আপডেট: ১৫:৫৩, ১৩ মে ২০২২

লঙ্কায় রাবন বধ ও বঙ্গীয় লুটেরাদের ভবিষ্যত 

প্রতিকী ছবি

লেখাটি যখন লিখছি তখনও শ্রীলঙ্কায় মিশন রাবনবধ চলছে। দেশটির লক্ষ লক্ষ বিক্ষুব্ধ জনতা ক্ষমতাসীনদের খুঁজে খুঁজে পেটাচ্ছে। বাড়ি-ঘরে আগুন দিচ্ছে। লেকের পানিতে নামিয়ে কুলে বসে পাথর ছুঁড়ছে। তাদের ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালাচ্ছে। কারফিউ ভেঙে নারী-পুরুষ তথা আবালবৃদ্ধবনিতার এই ক্রোধান্বিত প্রতিবাদ-প্রতিহিংসা এখন বিশ্বমিডিয়ার খোরাক। আপাতত ইউক্রেন থেকে মুখ ফিরিয়ে পুরো বিশ্ব হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রয়েছে রাবনের দেশ শ্রীলঙ্কার দিকে। কী ঘটে চলেছে! কিসে শান্ত হবে এইসব বিক্ষুব্ধ জনতা?

প্রবল বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী মাহেন্দা রাজাপাকসে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। দেশটির অনেক এমপি-মন্ত্রীকে গণধোলাই দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে অবরুদ্ধ এক এমপি নিজের গুলিতে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। এতোদিন সরকারের আশপাশে থেকে যারা লুটপাটে অংশ নিয়েছে তাদের ইচ্ছেমত ধোলাই করছে মানুষ। লেকের পানিতে ছুড়ে ফেলে পেটাচ্ছে। ইট-পাথর ছুঁড়ে মারছে গায়ে। সে এক বিভৎস চিত্র। এই চিত্র একটি দেশের জন্য ভয়ানক। তবে পৃথিবীর অনেক দেশের জন্যই শিক্ষা। কি করে দুর্দান্ডপ্রতাপশালীরা মুহূর্তেই ধরাশায়ী হয়ে যায়। কি করে জুলুমবাজরা নিমিষেই মজলুমদের কোপানলে পড়ে প্রাণ হারায়। অথচ মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও তারা ভাবতে পারেনি। গণেশ উল্টানোর এ খেলায় তারা যে কতটা অসহায় হবেন তা তাদের দেখতে দেয়নি কথিত উন্নয়ন নামের কালো পর্দা। ক্ষমতার দম্ভ আর মানুষের টাকায় উন্নয়নের কালো চশমায় তারা ছিলো অন্ধ। যে কারনে বাস্তবতা তারা বুঝতে পারেনি। টাকার গরমে নিজের গদি গরম থাকায় রাজপথের আঁচ তারা টের পায়নি। যার খেসারত তাদের দিতে হচ্ছে অলিতে-গলিতে, ডোবাতে-নালাতে,গাড়িতে-বাড়িতে বসে। কোথাও রেহাই পাচ্ছেনা এক সময়ের এই রাবনেরা। শ্রীলঙ্কার আজকের এই অবস্থার সূত্রপাত কি নিয়ে সচেতন পাঠকেরা নিশ্চয়ই সে বিষয়ে কমবেশি অবগত। তাই সেদিকে গিয়ে আলোচনার কলেবর বাড়াচ্ছি না। 

আমাদের দেশে সয়াবিন তেল নিয়ে তেলেসমাতি চলছে। সাধারণ জনগণ যখন বিক্ষুব্ধ তখন ট্রেনের টিটিই বরখাস্তের বিষয়টি সামনে চলে আসে। এতে মোড় ঘুরে যায়। এ ঘটনায় রেলমন্ত্রী নিশি রাইতের এমপি নুরুল ইসলাম সুজনের নয়া পতœীর ক্ষমতার দাপটের বিষয়টি সামনে চলে আসে। শুরু হয় তার ব্যক্তিগত জীবনে আলোকপাত। তিনি মন্ত্রী সাহেবের ৬ নম্বর স্ত্রী। এর আগে ৫ জন স্বামীর ঘর করেছেন অল্পে গল্পের নায়িকা বনে যাওয়া শাম্মী আক্তার মনি নামের ওই মন্ত্রীপতœী। মূলত ক্ষমতা প্রয়োগের এই দেশে শাম্মী আক্তার মনির পলিসি একদম পারফেক্ট। তিনি বুঝতে পেরেছেন একজন বুড়ো মন্ত্রীর পত্মী হতে পারলে ঘর এবং বাইরে সমান তালে ক্ষমতা ফলাতে পারবেন তিনি। পেরেছেনও তাই। বিয়ের নয় মাসের মাথায় তার নির্দেশ শুনতে বাধ্য হয়েছেন কর্মকর্তারা। তিনি তেমন অবস্থার সৃষ্টি করতে পেরেছেন। একেই বলে ক্ষমতা। 

আমাদের আশপাশের দেশগুলোর মধ্যে দ্বীপ দেশ শ্রীলঙ্কায় শিক্ষিতের হার বেশি। মাথাপিছু আয় ও অবকাঠামো উন্নয়নেও অনেক এগিয়ে। সবমিলে দেশটিতে প্রচুর উন্নয়ন কাজ হয়েছে। আর এইসব উন্নয়নকান্ডের আড়ালে দেশটিতে দুর্নীতিও হয়েছে ব্যাপকভাবে। মাহেন্দা রাজাপাকসে পরিবারের এমন কেউ নেই যারা এই মেগা দুর্নীতির বাইরে ছিলেন। সেইসঙ্গে তার পার্টি ইউনাইটেড পিপলস ফ্রিডম এলায়েন্সের নেত-কর্মীদের প্রত্যেকেই ছিলেন এই দুর্নীতির অংশীদার। ফলে জনতার রোষানল থেকে রেহাই পাচ্ছে না কেউই। না সরকারের এমপি-মন্ত্রী না দলীয় চ্যালাচামুন্ডারা। 

শ্রীলঙ্কার মতো আমাদের দেশের অবস্থা। এ দেশে এমপি-মন্ত্রীরাই কেবল দুর্নীতি করেন না। তাদের স্ত্রী, ভাই, শ্যালক কিংবা দুলাভাই যে যেভাবে পারছে বর্তমান উন্নয়নকান্ডের সুফল নিচ্ছে। চর দখলের মতো করে টেন্ডার দখল কিংবা ছ্যাপ দিয়ে রাস্তা বানানোর মতো ঘটনা ঘটছে আমাদের দেশেই। এইসব কথিত উন্নয়নের ফিরিস্তি নানাভাবে প্রচারের মাধ্যমে সরকার অতীতের নাগরিক অধিকার ভোট হরণ, গুম-খুনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ কিংবা সমুদ্রচুরির মতো ঘটনাগুলোকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। আর এ নিয়ে সমালোচনা কারীদের দমন করা হচ্ছে চেতনার ভাঙ্গা রেকর্ড বাজিয়ে।

গ্রামের বাজারে একদিন সকালে নাস্তা করছিলাম। কিছুক্ষণ পর পাশের গ্রামের এক বড়ভাইও আসলেন। পাশাপাশি সকালের নাস্তা করছি। একথা সে কথার পরে তিনি বললেন, ‘ভাডি যাই কও, উন্নয়ন কিন্তু মন্ত্রীসাব খারাপ করছে না’। আমি বললাম, ঠিক। তবে এটাও ঠিক যে স্বৈরাচাররা জনরোষকে দমাতে এই উন্নয়ন মন্ত্রই ব্যবহার করে। রাস্তাঘাট-ব্রিজ-কালভার্ট না করলে আপনিতো আপনার ভোটাধিকার নিয়ে কথা বলবেন। তাই সরকার এইগুলো করে আর জনগণের টাকায় জনগণকেই বুঝ দেয়। মাঝখান দিয়ে ফুলেফেপে বড় হয় এমপি-মন্ত্রীদের আশপাশের লোকেরা। ভাই বললেন, ‘কথা মন্দ বলনি’। 

শ্রীলঙ্কার সরকারও দেশটিতে ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সেই উন্নয়নকান্ডের মাঝখানে উন্নত হয়েছে নিজেরা। যে কারনে দেশটির অর্থনীতি যখন ধপাশ করে পড়ে গেছে তখন আর তাকে জাগানোর কৌশল খুঁজে পায়নি। যে কারনে এতোদিন যে জনগণকে উন্নয়নের গান শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিলো তারা এখন জেগে উঠেছে। এবং সেই জেগে উঠার হুংকার এতোটাই তীব্র হয়েছে যে উন্নয়নের ধারক-বাহকদের মসনদ ধ্বসে পড়েছে। তারা এখন সেই মসনদ থেকে নেমে উদভ্রান্তের মতো দৌড়ে পালাচ্ছেন যে যেদিকে পারছেন সেদিকে। আর তাতেই ঘটছে ভয়ঙ্কর সব ঘটনা। জেগে ওঠা লোকগুলোর সামনে পড়ে বেদম প্রহারের শিকার হচ্ছেন তারা। সেই প্রহারে গায়ের জামা-প্যান্ট খুলে যাচ্ছে। জাইঙ্গা ছিড়ে যাচ্ছে। কারো কারো পুচ্ছদ্দেশ থেকে উন্নয়নের দুর্গন্ধযুক্ত ধোঁয়া বের হচ্ছে। 

শ্রীলঙ্কার এই হালচিত্র ফেসবুকে বেশ আলোড়ন তুলেছে। বিশেষ করে আমাদের দেশে লাখলাখ ফেসবুকার এইসব ভিডিও-ছবি পোস্ট করে এটা থেকে দেশের ক্ষমতাসীনদের শিক্ষা নেবার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করছেন। আকারে-ইঙ্গিতে তারা এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশের সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানাচ্ছেন। কিন্তু কেন? তাহলে কি এদেশের মানুষের মধ্যেও একই রকম ক্ষোভ বিরাজ করছে? এদেশের কোটি কোটি জনতা কি তাহলে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ডকে লোক দেখানো আর লুটপাটের মহা আয়োজন হিসেবে মনে করে? হয়তো সেটাই। তা না হলে তাদের এমন প্রতিক্রিয়ার কারন কি? 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি এক বক্তব্যে এমন আশঙ্কার কথা বলেছেন। তার আশঙ্কা আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসতে না পারলে পরদিনই তার দলের কয়েক লাখ লোককে হত্যা করবে বিরোধীরা। আরেক বক্তব্যে বলেছেন, ‘দেশের মানুষকে এতোকিছু দিলাম দেখি এবার মানুষ আমাকে কি দেয়’। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন দেশের এতো এতো উন্নয়নের পর দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে জনগণ তাদের ভোট দিবে। যদিও বিগত দুটি নির্বাচনেই দেশে সেই অর্থে কোনো ভোট হয়নি। জনগণকে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে সরকার। যার প্রতিফলন দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য সংক্রান্ত নিউজের পাঠক প্রতিক্রিয়ায়। শত শত মন্তব্য এসেছে যেখানে জনগণের ভোটাধিকার হরণের বিষয়টি ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন তারা। সেইসঙ্গে আগামীতে যদি দেশে সত্যিকারের নির্বাচন হয় তাহলে জনগণ অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীকে এর প্রতিদান দেবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও সেই প্রতিদান যে নেতিবাচক হবে সেটিও স্পস্ট করেছেন এসব ক্ষুব্ধ ফেসবুকীয় জনগণ। 

শ্রীলঙ্কার প্রতাপশালী রাবনরা মার খাচ্ছে। বেঘোরে প্রাণ যাচ্ছে এক সময়ের উন্নয়ন প্রবক্তাদের। সে কারনে আমাদের দেশের লুটেরাদের ভবিষ্যত নিয়েও তৈরি হচ্ছে শঙ্কা। তবে প্রত্যাশা করি এই শঙ্কা যেন কেবলই শঙ্কা থাকে। কেননা এসব লুটেরা আমাদেরই লোক-আশপাশের, চারপাশের। পরিচিত-প্রসিদ্ধ কেউ ল্যাংটা হয়ে রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি করুক সেই দৃশ্য নিশ্চয়ই কারো ভালো লাগবে না।  

লেখক: সাংবাদিক ও কথাশিল্পী। 
 

রেডিওটুডে নিউজ/এমএস

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের