কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা এবং আধুনিক প্রযুক্তির যুগোপযোগী ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও টেকসই করে তোলার প্রত্যয়ে ঢাকায় সফলভাবে অনুষ্ঠিত হলো ‘ডেটাডেভেলপ প্রাইজ ২০২৬ বিডি কেস প্রতিযোগিতা’। একাডেমি অব গার্মেন্টস টেকনোলজি বাংলাদেশ এর উদ্যোগে সম্প্রতি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অডিটোরিয়ামে এই চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
দিনব্যাপী এ আয়োজনে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী, শিক্ষক, মেন্টর, পোশাক খাতের পেশাজীবী এবং করপোরেট প্রতিনিধি মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক মানুষের সমাগম ঘটে।
বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক ও শিল্পখাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ডেটা ও প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়াতে এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত ছিল বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমএ-এর ৩৫০টি শীর্ষস্থানীয় সদস্য সংস্থা। কয়েকটি ধাপ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশের এই শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ৭০ জন অভিজ্ঞ পেশাজীবীকে বাছাই করা হয়। পরবর্তীতে তারা ১২টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে যৌথভাবে বহুমুখী টিম গঠন করে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে একাডেমি অব গার্মেন্টস টেকনোলজি বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার এবং মাস্টার ট্রেইনার হেনরি শু আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার বিষয়ে তুলে ধরেন নিজের দৃষ্টিভঙ্গি।
তিনি বলেন, একা আনন্দ উপভোগ করার চেয়ে সবার সঙ্গে ভাগ করে নেয়া অনেক বেশি উপভোগ্য। হংকংয়ের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করছি।
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও সুদৃঢ় করার ওপর জোর দিয়ে হেনরি শু জানান, তৈরি পোশাক খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কারখানার ঝুঁকি এবং কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত বিষয়াবলি। এই প্ল্যাটফর্মটি শিল্প কারখানা ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর মাঝে একটি মজবুত সেতু হিসেবে কাজ করবে।
এরপর বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে নতুনভাবে রূপকল্পনা ও একটি স্বল্প বর্জ্যপূর্ণ, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ সম্প্রদায় গড়ে তোলা শীর্ষক দুটি বিশেষ প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
এতে টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব টেকসই প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং অর্থায়ন কাঠামোর উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
তারা অপচয় ও দূষণ কমাতে প্রযুক্তির ব্যবহার, একাডেমিয়া ইন্ডাস্ট্রি যৌথ অংশগ্রহণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণে সচেতনতা সৃষ্টির ওপর জোর দেন। পাশাপশি এআই ও অটোমেশন কর্মসংস্থান না কমিয়ে বরং মানুষের দক্ষতা বাড়াবে উল্লেখ করে প্রযুক্তি ও মানুষের যৌথ প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেন। এ ছাড়া এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানানো হয়। সর্বশেষে বক্তারা একমত হন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উন্নত প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের শীর্ষ অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।
অনুষ্ঠানের মাঝ পর্বে শিক্ষার্থীদের ৫টি পৃথক দল তাদের টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের উদ্ভাবনী কেস প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করে বিচারকদের সামনে। যেখানে প্যানেল বিচারকদের বিবেচনায় বিজয়ী হওয়ার গৌরব অর্জন করে টিম লেজারার্স। এছাড়া অনুষ্ঠানে বিজয়ী দল, মেন্টর ও সাব-মেন্টর এবং বিচারকদের বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়।
এই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন দল লেজারার্স গার্মেন্ট সম্পূর্ণ স্পন্সরশিপে চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হংকংয়ের হংকং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি পার্কে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক ‘ডেটা ডেভেলপ প্রাইজ হংকং ২০২৬ কেস কম্পিটিশন’-এ সরাসরি অংশগ্রহণের গৌরব অর্জন করে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশি হিসেবে আমরা সবাই এই বিষয়ে গর্ববোধ করি যে, চীনের পরেই বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। আমাদের দেশে বিশ্বমানের শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে। যখন তরুণ শিক্ষার্থী এবং তরুণ মস্তিষ্ককে তৈরি পোশাক খাতের গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয় ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ দেয়া হয়, তখন তা চমৎকার একটি উদ্যোগ।
বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বর্তমান অর্থসংকট কিংবা গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি একটি সাময়িক বাধা মাত্র। ম্যানচেস্টার ও চীনের পর বিশ্ব টেক্সটাইল শিল্পের মূল কেন্দ্র এখন বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্থানান্তরিত হচ্ছে। তাই এই খাতের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল।
প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে রেড ক্রিসেন্ট এবং অরবিসের তহবিলে বিশেষ অনুদান প্রদান করে লিজ ফ্যাশন ও লিডা টেক্সটাইল।
আয়োজকরা বলছেন, এই উদ্যোগের ফলে একাডেমিয়া এবং শিল্প খাতের দূরত্ব ঘুচে যাবে এবং তরুণ প্রতিভারা এআই ও ডেটা প্রযুক্তির সাহায্যে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
রেডিওটুডে নিউজ/আনাম

