রোববার,

২২ মে ২০২২,

৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

রোববার,

২২ মে ২০২২,

৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

Radio Today News

‘যেই ক্যাম্পাস পুলিশের, সেই ক্যাম্পাস আমার না’  

মেসবাহ শিমুল, সাংবাদিক 

প্রকাশিত: ১২:০৮, ২১ জানুয়ারি ২০২২

‘যেই ক্যাম্পাস পুলিশের, সেই ক্যাম্পাস আমার না’  

ছবি সংগৃহীত

আজকের লেখার বিষয় দেশের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে। নব্বইয়ের দিকে দেশের প্রযুক্তি ভিত্তিক শিক্ষার সম্প্রসারণে সূচনা হয়েছিলো এই বিশ্ববিদ্যালয়টির। দীর্ঘ তিন দশকে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস হিসেবে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সফলতা রয়েছে তার। আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পড়েছি। যৌবনের সোনালী সময়গুলো কেটেছে টিলাঘেরা এই অনিন্দ্য সুন্দর বিদ্যাপীঠে। ক্যাম্পাসে প্রবেশের কয়েকদিনের মাথায় একটি ভিসি বিরোধী আন্দোলন পেয়েছিলাম। সেই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোই আমার জীবনের বাঁক পরিবর্তন করে দেয়। হাতে নেই কলম আর ছোটো নোটবুক। হয়ে উঠি সংবাদকর্মী। এই সংবাদের পেছনে এখনো লেগে আছি। লেগে থাকবো, লেগে থাকতে চাই। 

আমাদের সময়ে ক্যাম্পাসে রিপোর্টিং করে একটা অন্যরকম ভালোলাগা খুঁজে পেতাম। সারাদিন ক্লাস-টার্মটেস্ট-পরীক্ষা শেষ করে বিকেলে সিলেট শহরে গিয়ে অফিসে বসতাম। নিউজপ্রিন্টের কাগজে রিপোর্ট লিখে জমা দিতাম ডেস্কে। তারপর রাতে কুমারগাঁওয়ের সিএনজিতে করে ভার্সিটি গেটে নেমে হেটে হেটে ফিরতাম শাহপরাণ হলে। মাঝখানে আমাদের চিরচেনা কিলোপথ পাড়ি দিতাম কখনো একা কখনো অন্য কোনো রিপোর্টারের সঙ্গে। পরের দিন পত্রিকার পাতায় ছাপা অক্ষরে নিজের নাম কিংবা পদবী সংযুক্ত প্রতিবেদন দেখে ভুলে যেতাম আগের রাতের কষ্ট-পরিশ্রম। ক্যাম্পাসের বহু কিছুর সঙ্গে আমাদের পরিচয় ছিলো। ভিসি ভবন থেকে বিভাগের অফিস সব যায়গায় আমাদের একটা পরিচিতি ছিলো। এইসব করেই কাটিয়েছি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। 

বলছি সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। ৩২০ একরের এই সুন্দর ক্যাম্পাসটি এখন রক্তাক্ত, উত্তাল আর উদ্বেগে ঠাঁসা। সেখানে ভিসি বিরোধী আন্দোলন চলছে। ছাত্রীদের একটি হলের প্রাধাক্ষের অপসারণের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পুলিশ নির্বিচারে হামলা চালিয়েছে। লাঠিচার্জ করেছে। টিয়ারশেল আর সাউন্ড গ্রেনেড মেরে শিক্ষার্থীদের রক্তাক্ত করা হয়েছে। তবে তাতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থামেনি। বরং তীব্র হয়েছে। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। তারা ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করেছে। হলগুলোতে তালা মেরে দিয়েছে। ক্যাম্পাসে পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব-সোয়াত মোতায়েন করা হয়েছে। চারিদিকে একটা ভীতীকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে দমাতে চাইছে। কিন্তু আন্দোলন চলছে। শিক্ষার্থীদের দাবি এখন একটাই ভিসি ফরিদ উদ্দিনের পদত্যাগ। তাদের স্লোগান ‘এককথা এক দাবি, ভিসি তুই কবে যাবি’। ‘এক দুই তিন চার, ভিসি তুই গদি ছাড়’। মাঘের এই কনকনে শীতেও বিপ্লবীদের এমন অগ্নিঝরা স্লোগানে মুখরিত আমার প্রিয় ক্যাম্পাস।  

বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার প্রতিবেদন বলছে, ওই হলটিতে খাবারের মান খারাপ। অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যেগুলোর জন্য শিক্ষার্থীরা নূন্যতম ফি প্রদান করে সেগুলোও পর্যাপ্ত নয়। এইসব বিষয়ে দাবি দাওয়া জানালে সেখানকার প্রাধ্যাক্ষ তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। তিনি অনেকটা দায়িত্ব-কর্তব্যহীন হল অভিভাবক। এসব বিষয়ে বিভিন্নভাবে অভিযোগ জানানোর পরও কোনো ফল হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে তারা একদিন মধ্য রাতে ভিসির কাছে তার অপসারণের দাবি জানায়। সে সময় ভিসি তাদের আশ্বাস দিয়ে হলে পাঠিয়ে পরদিন সকালে তাদের সঙ্গে আলোচনার সময় নির্ধারণ করেন। কিন্তু ওই বৈঠকে ভিসি প্রাধ্যাক্ষের পক্ষ নিয়ে ছাত্রীদের দাবিকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেন। তবে ছাত্রীরা তাদের দাবিতে অনড় থাকলে তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিভাগের ছাত্ররা এসে একাত্মতা জানায়। হালে পানি পায় আন্দোলন। তারপর প্রশাসনের ইন্ধনে ওইদিন সন্ধ্যায় ছাত্রলীগের ছেলেরা তাদের ওপর হামলা চালালে সে আন্দোলন রূপ নেয় ভিসি বিরোধী আন্দোলনে। সেই থেকে একই দাবিতে আন্দোলন চলছে। ইতোমধ্যে রবিবার তাদের ওপর ন্যাক্কারজনক পুলিশী হামলা হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ এবং সামাজিক মাধ্যমে ভেসে বেড়ানে ছবি-ভিডিও দেখে সেদিনের সেই হামলার দৃশ্য কল্পনায় আনার চেষ্টা করেছি। রাতের আঁধারের ওই হামলা একাত্তরের বর্বর হানাদার বাহিনীর হামলার দৃশ্যকে যেন সামনে নিয়ে আসে। এই লেখা যখন শেষ করছি তখনো আন্দোলন চলছে। আন্দোলনের ফলাফল কি হবে তা জানি না। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন সফলও হতে পারে। আবার ব্যর্থ্যও। ফলাফল যাই হোক যে ঘটনা ঘটে গেছে, যেসব শিক্ষার্থী আহত হয়েছে, দিনের পর দিন খেয়ে না খেয়ে যেসব শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যয্য দাবি আদায়ে স্লোগান দিয়েছে তাদের প্রতি সমর্থন ও সহমর্মিতা থাকবে। 

দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরণের আন্দোলন হয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন মৌলিক দাবি-দাওয়া নিয়েই এসব আন্দোলনের সূত্রপাত হয়ে থাকে। পরে অবশ্য সে সব আন্দোলনের কোনো কোনোটি ভিন্ন দিকে চলে যায়। সময় এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার আলোকে সেসব দাবির সঙ্গে যুক্ত হয় আরো অনেক কিছু। আবার এমনও হয় যে শুরুতে যে দাবি নিয়ে আন্দোলন গড়ে উঠে। শেষ অবধি সেটি ঢেকে যায়। মূল দাবি হয়ে উঠে অন্য কোনো ইস্যু। যেমনটি শাবিপ্রবিতে হচ্ছে। 

আমাদের শিক্ষাঙ্গণগুলোতে এখন আর জাতীয় অর্থাৎ জনসম্পৃক্ত কোনো ইস্যুতে আন্দোলন হয় না। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় পড়তে গিয়ে আমরা ক্ষেত্র বিশেষে সাধারণ মানুষেরই ক্ষতি সাধন করি। মাঝে-মধ্যে হলের ডালে আরশোলা, ওয়াইফাই স্পিড দিয়া মুভি দেখা যায় না কিংবা সন্ধ্যার মধ্যে হলে ঢুকতে হবে কেন? রাত বারোটায় হলে ফিরলে কার বাপের কি-এই ধরণের ইস্যু নিয়ে টুকটাক আন্দোলন-সংগ্রাম হতে দেখা যায়। এর সবগুলোই যে আবার পরিপূর্ণ আন্দোলন হিসেবে গড়ে উঠে সে সুযোগও সব সময় হয়ে উঠে না। কেননা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় এখন ছাত্রনৈতিক (ছাত্র সংগঠন যখন রাজনীতির ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়) সংগঠনের কব্জায়। তাই যে কোনো ধরণের আন্দোলন হলে সেটিকে তারা প্রতিপক্ষ হিসেবে ধরে নেয়। তারা মনে করে এটি তাদের ফাদার সংগঠনকে বিব্রত করবে। সরকার ফেলে দিবে। তাই তারা যে কোনো ধরণের আন্দোলনতো বটেই এমনকী কখনো কখনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও হামলা চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে কাওয়ালী অনুষ্ঠান এবং শাবির আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাই এর সাাম্প্রতিক প্রমান। 

এই সংগঠনটির একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পেছনে তাদের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সেই সমৃদ্ধ অতীত তাদের বর্তমানের যাবতীয় অপকর্মের দায় নেবে। যত পাপ করুর তার সব ধুঁয়ে দেবে। তার মানে এই নয় যে, অতীতের সুকীর্তিগুলো তাদের বর্তমানের সব কুকীর্তিকে জাস্টিফাই করবে। বরং মূল্যায়ন হয় সব সময় বর্তমান দিয়ে। আমি এখন কি করছি মানুষ কিংবা আইন সেটার ভিত্তিতেই আমার মূল্যায়ন করবে। অতীত ভালো ছিলো ভবিষ্যতে ভালো হয়ে যাবো এ ধরণের যুক্তিতর্ক কিংবা প্রতিশ্রুতি এখানে অচল। তাই এখন যারা বুয়েটের হলে শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে মারে, প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে মারে বিশ্বজিৎকে কিংবা এ ধরণের আন্দোলনে হামলা চালায় তারা আর যাই হোক ছাত্র সংগঠন হতে পারে না। এটি কোনো ছাত্র সংগঠনের বৈশিষ্ট্য নয়। 

বিগত দেড় দশকে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সরকারীভাবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। গণতন্ত্র হরণ কিংবা প্রজা নিধন সব কাজেই ব্যবহার হচ্ছে এই সরকারি বাহিনীগুলো। যে জনগণের নিরাপত্তার জন্য তাদের জন্ম এবং লালন তাদের দমন করতেই যেন তাদের অষ্টপ্রহর ব্যস্ত থাকতে হয়। সরকারের এহেন অনৈতিক অনেক কাজে তাদের বিবেক বর্জিত অংশগ্রহণ তাদের কেবল বিতর্কিতই করেনি বরং তাদের জনগণ থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। ক্ষেত্র বিশেষে বানিয়েছে শত্রুও। 

ভিসি অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন আহমেদও একটি রাষ্ট্রের প্রধান। পূণ্যভূমি সিলেটের ৩২০ একরের একটি এক ভূখন্ডে তার শাসন চলছে বেশ ক’বছর ধরে। তাই প্রশাসক হিসেবে তিনি সেখানে এখন অনেকটাই স্বৈরাচারের ভূমিকায়। তাইতো তুচ্ছ একটা ঘটনায় তিনি তার অনুগত বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছেন। অনুগত বাহিনী কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাত থেকে গোলাপ নিয়েছে ঠিকই কিন্তু তার সুবাশ তাদের হৃদয়কে স্পর্শ করেনি। শিক্ষকরূপী স্বৈরাচারের তারা এতোটাই অনুগত হয়ে গেছে যে, যে হাতে সন্ধ্যার আগেই উঠেছিলো প্রেমময় গোলাপ সেই হাতেই তারা টিপেছে ট্রিগার। যে শিক্ষর্থীরা তাদের গোলাপ দিয়ে ভালোবাসার স্পর্শ জাগাতে চেয়েছিলো, হায়েনা হয়ে তাদের উপরই চালিয়েছে গুলি। এই হলো আমাদের পুলিশ। এই হলো রাষ্ট্রের দারোয়ান। তাইতো শিক্ষার্থীরা নতুন স্লোগান তুলেছে, ‘যেই ক্যাম্পাস পুলিশের, সেই ক্যাম্পাস আমার না’। এই স্লোগান শুধু ক্যাম্পাসে নয়, ধ্বনিত হোক সারাদেশে। কেননা পুলিশ জনগণের সেবক, শাসক নয়।

 

রেডিওটুডে নিউজ/এমএস

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের