সোমবার,

২৪ জানুয়ারি ২০২২,

১০ মাঘ ১৪২৮

সোমবার,

২৪ জানুয়ারি ২০২২,

১০ মাঘ ১৪২৮

Radio Today News

বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক চরিত্র ও দুষ্টুচক্রের পাইপলাইন

অনি আতিকুর রহমান

প্রকাশিত: ০০:১৭, ১৫ জানুয়ারি ২০২২

বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক চরিত্র ও দুষ্টুচক্রের পাইপলাইন

প্রতিকী ছবি

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমেই তার একাডেমিক চরিত্র হারিয়ে রাজনৈতিক চরিত্র ধারণ করছে। ফলে এগুলো পরিণত হচ্ছে একেকটি দলীয় রাজনৈরতিক প্রতিষ্ঠানে। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের স্লোগান ধ্বনিত হয়। তাদের তেলে তৈলাক্ত হয়ে যায় ক্যাম্পাস। শিক্ষক থেকে শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা থেকে কর্মচারী; প্রায় সবাই সেই তেল চেটে আপন স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেন। আর এই অপকর্মে নেতৃত্ব দেয় কিছু অর্থ ও ক্ষমতালোভী জ্ঞানপাপী শিক্ষক, কিছু লাজলজ্জাহীন বিভ্রান্ত রাজনীতিক আর বিপদগামী কিছু অর্বাচীন শিক্ষার্থী (ছাত্র রাজনীতিক ও অন্যান্য)। অথচ, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু তার একাডেমিক চরিত্রেই (প্রয়োজনীয় জ্ঞানসৃষ্টি ও বিতরণ) সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে উজ্জ্বল।

সম্প্রতি ইউজিসি কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক রিপোর্টে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার যে দুরবস্থা উঠে এসেছে তা দেখার পর কয়েকটি ‘আত্মহত্যা’ দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ভাবছিলাম কিছু উপাচার্য অন্তত ব্যর্থতার দায় নিয়ে আত্মহত্যা করবেন; আর কেউ কেউ হয়ত পদত্যাগ করবেন। কিন্তু কি নির্লজ্জ পরিস্থিতি! কেউই তা করলেন না। হতাশ হলাম!

বছর কয়েক আগে একটা নিউজ পড়েছিলাম, জাপানের একজন অধ্যাপক তাঁর পিএইচডি ফেলোর গবেষণার বিরুদ্ধে সামান্য কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগ শুনে সুইসাইড করেছিলেন। আহা! শিক্ষকের কি উচ্চ ব্যক্তিত্ব, কত আত্মসম্মান!

কিন্তু বাংলাদেশের কেন এই অবস্থা! আমি অবশ্য এর একটি কারণ খুঁজে বের করেছি। তা হলো- এখানে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াতেই রাজ্যের গলদ। আর এটাই মূল সমস্যা। এ প্রক্রিয়ায় ‘যোগ্যতা’কে সবচেয়ে বড় ‘অযোগ্যতা’ বিবেচনা করা হয়। ফলে যা ঘটার তাই ঘটে। বর্তমানে তো চলছে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের মৌসুম। এখানে মেধা অপ্রধান যোগ্যতা। শুধু রাজনীতি নয়; মোটা অংকের টাকা ছাড়া নিয়োগ পাওয়া তো প্রায় অসম্ভব। নিয়োগপ্রাপ্তরা নিরাপত্তার স্বার্থে একথা মুখে না বললেও তাদের গ্রামের বাড়িতে  খোঁজ নিলেই জানা যাবে- এরা কোন কায়দায়, কত বান্ডিল খরচ করে এই এক একটা চেয়ার কিনেছেন।

এখন কথা হলো- শিক্ষকতার মত একটা মহান পেশায় যাদের এন্ট্রিই হচ্ছে বিতর্কিত ও অসৎ ছাঁচে পড়ে; তারা কিভাবে তাদের সততা ধরে রাখবেন?  শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে ছাত্রের সামনে কিভাবে নীতির কথা বলবেন? গবেষণার ল্যাবেই বা কীভাবে তিনি স্থির থাকবেন? তিনি তো তালে থাকবেন, কখন পরবর্তী নিয়োগ সার্কুলার হবে; তার জন্য ক্যান্ডিডেট ম্যানেজ করতে। তিনি তো সুযোগ খুঁজবেন তার ইনভেস্ট করা ‘পয়সা’ কিভাবে এবং কত দ্রুত ‘রিটার্ন’ করানো যায়। আর এই ধান্দায় পড়লে তো তার আর নিজের পড়াশোনা কিংবা ছাত্র পড়ানোর ফুরসত নাই। ফলে এরাই জড়িয়ে পড়ে ভর্তি বানিজ্যে, নিয়োগ বানিজ্যে; এরাই সুযোগ পেলে তছরুপ করে বিভিন্ন ফান্ডের টাকা; করে চেক ও ভাউচার জালিয়াতি। এরাই নিজের ছাত্রদের না পড়িয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে সান্ধ্যকোর্স কিংবা প্রাইভেট ইউভার্সিটির ‘খেপ ক্লাস’ নিয়ে। মানে, সুযোগ পেলে এরা নিজের বিশ্ববিদ্যালয়টাকেই নিলামে তুলে! কেননা, এদের নীতি- নৈতিকতার ‘মাজা’ সেই গোঁড়াতেই ভেঙে দেয়া হয়। আর একাজ সফলভাবে করেছেন শিক্ষক নামের একদল আধা রাজনীতিক।

আরেকটা সমস্যা আছে। তা হলো- এক শ্রেণির গডফাদার তাঁদের নিয়োগের সময়কার ও নিয়োগ পরবর্তী অপকর্মের প্রমাণ সংরক্ষণ করে রাখেন। এবং নিয়মকরে তা মনে করিয়ে দেন। তাদের বোঝান যে, তোমার আমলনামা আমার হাতে। তাই এদিক-ওদিক করবা তো সাইজ হয়ে যাবা। ফলে, নিয়োগপ্রাপ্তির পর যদিওবা কেউ সায়লেন্ট হয়ে যেতে চায় কিংবা একাডেমিক কাজে নিজেকে ফুলটাইমার ভাবতে যায়;  ওমনি তার কানের কাছে বাজখাঁই ‘ডকুমেন্টস! ডকুমেন্টস! ডকুমেন্টস!’ এতে মন চাইলেও বাস্তবে তা পারার আর সুযোগ নেই। তিনি সিস্টেমে পড়ে জিম্মি। তাই, ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় তাকে দলীয় স্লোগানে মুখর হতে হয়। অপরাধে জড়াতে হয়। আর আজকের পুঁচকে অপরাধী; কালকের গডফাদার। এভাবেই নির্মাণ হয় ‘দুষ্টুচক্রের পাইপলাইন’। যার নিয়ন্ত্রণ মূলত রাজনীতি দ্বারা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গবেষণামুখি হলে এটা  কোনোভাবেই হতো না।

একশ্রেণির শিক্ষকরা কখনো চায় না- এই ধরনেরলেজুড়বৃত্তির রাজনীতি থেকে শিক্ষাঙ্গন মুক্ত হোক। কারণ, রাজনীতি বাদ দিলে এদের নিজেদের কানাকড়ি মূল্য নেই। রাজনীতির মাঠে এরা যতটা এগিয়েছে; নামের শুরুতে অধ্যাপক, ডক্টর ইত্যাদি শোভাবর্ধক লকব থাকলেও একাডেমিক্যালি এরা ততটাই পিছিয়ে। আবার এদের দাপটে ভদ্রগোছের সত্যিকারের গবেষণামুখী শিক্ষকদেরও নিভু নিভু অবস্থা। তারা গবেষণায় আদৌ বাজেট বরাদ্দ পাবেন কি না তাও এদেরই মর্জির ব্যাপার অনেকটা। 
ক্যাম্পাসগুলোতে লাইমলাইটের আলো সব তাদের দিকে; যারা দুষ্টুচক্রের সর্দার। ফলে এই ‘অপরাজনীতি’ সরাসরি চর্চা একদিকে যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যক শিক্ষককে কিম্ভূতকিমাকার (না শিক্ষক না রাজনীতিক) পরিচয়ে পরিচিত করছে; অন্যদিকে এদের অশিক্ষকসুলভ কাজকর্ম সংক্রমিত করছে ভালো শিক্ষকদেরকেও। কেননা ক্যাম্পাসের ক্ষমতা তাঁদেরই হাতে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আদতে যাদের (গবেষকশ্রেণি) কদর হওয়ার কথা ছিলো তাঁরা  কোনঠাসা; অন্যদিকে অন্তঃসারশূন্য আধা রাজনীতিক মাস্টাররা পাচ্ছেন সম্পূর্ণ  ফ্লোর। দুঃখের বিষয় হলো, ক্যাম্পাসে যারা রিপোর্টিং করে তারাও ব্যস্ত এদেরই নিয়ে। ফলে, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় এখন রাজনৈতিক চরিত্রের প্রতিষ্ঠান; নট একাডেমিক। না হলে জ্ঞানভিত্তিক এক একটা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য থেকে এতটা বিচ্যুতি ঘটে? 

পন্ডিত জওহর লাল নেহেরু বলেছিলেন, দেশ ভালো হয় যদি তার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালো হয়। মনে রাখতে হবে, শিক্ষকরা ফেল করা মানে জাতি ফেল মারা, দেশ ফেল মারা।
 

রেডিওটুডে নিউজ/এমএস

সর্বশেষ

সর্বাধিক সবার কাছের